চড়-ই রক্ষা, চড়-ই পাখির প্রতি ভালোবাসা

মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী

প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসে আজ উন্মত্ত পৃথিবী। এ কঠিন বাস্তবতায় ষড়ঋতু ও বৃক্ষলতাবিহীন এ নগরীতে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে চড়-ই পাখি। শক্তিমানরা টিকে থাকে, দুর্বলরা বিলুপ্ত হয়, ডারউইনের এ যুক্তি মানতে পারছি না। কারণ শক্তিমান পাখি চিল, শকুন, বাজপাখি হারিয়ে গেছে কিন’ ক্ষুদ্র পাখি চড়-ই এখনো টিকে আছে। নগরায়ণের নখরে ক্ষতবিক্ষত হয়েও চড়-ই পাখির চঞ্চলতা এ নগরীর প্রাণবৈচিত্র্যের অনন্য শোভা। মানুষের সঙ্গ তাদের মন ছুঁয়ে যায়। খাবার পেলে কাছে এসে যায়, আবার অনাদর আর অবহেলায় অভিমানে দূরে সরে যায়। নগরায়ণের পরিধি যত বিস্তৃত হচ্ছে, জীববৈচিত্র্যের জগৎ তত সংকুচিত হচ্ছে। এ ক্রান্তিলগ্নে ফ্ল্যাট সংস্কৃতির সম্মোহনে প্রকৃতি ও পাখির সঙ্গে বন্ধনহীন মুঠোফোনের পর্দায় বন্দী আমাদের জীবন। যে জীবনে আছে শুধু স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, অর্ন্তমূখিতা। প্রাণহীন পুতুল, মনোগ্রামের ছবি, খেলনা পাখি এ যুগের শিশুদের সঙ্গী। অথচ চোখ ফেরালেই আমাদের চারপার্শ্বে শুধু চড়-ই আর চড়-ই। দলবেঁধে আসা, চষ্ণু দিয়ে খুঁটে খুঁটে খাওয়া, ঠোঁট ডুবিয়ে পানি খাওয়া, উড়ে যাওয়া, মিটমিট করে তাকিয়ে থাকা, বালি বা মাটিতে গর্ত করে শয়ন, রোদে অবগাহন। হঠাৎ উড়াল, হঠাৎ আড়াল, এত মায়াবী, এত আদুরে পাখি, মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকি। চড়-ই’ এর এ দুরন্তপনা আমাদের চিরচেনা।
পাখি এ বিশাল নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের প্রতিপালক স্রষ্টার অপূর্ব সৃষ্টির অনুষঙ্গ। এরা নিজস্ব ভাষায় ও স্বকীয়তায় মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্র গুণগান করে। মহান ঐশীগ্রন’ কুরআনের বর্ণনামতে, পাখিদের ডানার সম্প্রসারণ, সংকোচন এবং বায়ুমণ্ডলে সি’তি মহান আল্লাহ্র মহাজাগতিক ব্যবস’াপনার এক অনন্য অভিব্যক্তি। ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের আকারে পাখির দলবদ্ধ যাত্রা মানুষের একতাবদ্ধ থাকার জন্য এক অতুলনীয় শিক্ষা। মানুষের মতই পাখিদের প্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না এবং জীবন পরিক্রমা আছে। আছে ভাষা, কান পেতে শোনে মানুষের কথা। বোঝে তাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বা বিরূপতা। আমাদের কত প্রাচুর্য আর সুস্বাদু খাবার। অথচ শ্রমনিষ্ঠ এ পাখি সারাদিন নগরজুড়ে খুঁজে বেড়ায় আহার।
পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অনিবার্য শর্ত খাদ্য, যা’ মানুষ, পশু, পাখি-সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মানুষের একটু খাবার, একটু আদরে এদের অনাবিল প্রশান্তি। ঘরের বারান্দায়, জানালায় ছোট পাত্রে সামান্য চাল, ভাত, পানি রাখলে চড়-ইদের ভীষণ তুষ্টি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ভবনের ছাদে তাদের জন্য খাবার আর পানির ব্যবস’া রেখেছিলাম দীর্ঘদিন, স’ানটিতে সকাল-সন্ধ্যা প্রবল আকুতি নিয়ে খাবারের অপেক্ষায় তারা ব্যাকুল হয়ে থাকতো, রুটিন মেনে খাবার খেতে আসতো। আমার বাসার বারান্দায় একদল চড়-ই জটলা বেঁধে নিয়মিত আসে খাবার খেতে। গুটিসুটি মেরে খাবারের অপেক্ষায় বসে থাকে। নিয়মিত খাবার পেলে এরা কাছে আসবেই, এটা পরীক্ষিত।
অলসতায়, জড়তায় মানুষের ঘুম না ভাঙলেও সূর্য উঁকি দেবার আগেই চড়-ইরা দশদিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে। ভোর থেকে শুরু হয় কিচির মিচির ডাক। সারাদিনে একটি চড়-ই মাত্র ৫-৭ গ্রাম খাবার খায়। কত খাবার আমাদের নষ্ট হয়, বিদেশী কুকুর পুষে কত অর্থের অপচয় হয়, আবর্জনায় কত খাবার ফেলে দেয়া হয়। অথচ হাঁড়ির কোণায় লেগে থাকা সামান্য ভাতটুকু পাখিদের জন্য বিরাট কিছু। সুবোধ চড়-ই পাখি আমাদের জীবন বিঘ্নিত করে না, কাকের মত ছোঁ মেরে খাবার নিয়ে যায় না। ইঁদুরের মত গর্ত করে খাবার মজুদ করে না।
চড়-ইয়ের বিষ্ঠা গৃহিণীদের কাছে বিরক্তিকর। বারান্দায় বা ছাদে শুকানো জামা কাপড়ে বিষ্ঠা পেলেই রাগান্বিত, বিরক্ত হন তারা। পাখিদের এ স্বভাব প্রকৃতিতাড়িত, তাই পাখিদের প্রতি সংবেদনহীনতা নয়, চাই মনের উদারতা। আমাদের বৈরী আচরণে তারাও বিরক্ত, অতিষ্ঠ।
নগরায়ণের দিগন্ত যতই প্রসারিত হচ্ছে, ততই বিলুপ্ত হচ্ছে চড়-ই পাখিদের জলাধার, খাবার, ঝোপঝাড়। ১৯৮৯ সনে ঢাকার বাৎসরিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৯’ এ তা দাঁড়ায় ২৪-৩০ ডিগ্রি। ২০১৬ সনের ২৪ এপ্রিল তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ ডিগ্রি। এ উষ্ণতা বৃদ্ধি পাখিদের জন্য ঝুঁকি। এমনকি রাতদিন যন্ত্রদানবগুলোর হাইড্রলিক হর্নের অসহনীয় শব্দদূষণে চড়-ই আজ সংকটাপন্ন। শব্দদূষণের মাত্রা এখন ঢাকা মহানগরীতে ১৩১ ডেসিবলে পৌঁছেছে। এছাড়া আতশবাজি, মাইকের গগনবিদারী শব্দ, ভবন নির্মাণযজ্ঞ, বিমানের কানফাটা শব্দ, যানবাহনের তির্যক আলো, ইলেকট্রনিক্স এবং মোবাইল টাওয়ারের তেজষ্ক্রিয়তা, সব মিলে এ নগরী যেন আগ্নেয়গিরির লাভা, পরিণতিতে চড়-ইদের শ্বাসরোধী অবস’া। আমার বাসার কাছেই এক জোড়া কাঠঠোক্রা ছিল। ইট পাথরের আবরণে একবছরে তারাও হারিয়ে গেছে। ৬০% কংক্রিটের এ নগরীতে পাখিকুল আজ ছিন্নমূল। তারাও শীতার্ত, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। নগরায়ণ, ধোঁয়া ও ধূলার আস্তরণ এবং অগণিত এসি’র সিএফসি গ্যাসের আগ্রাসনে চড়-ই পাখি বিলুপ্তির পথে। উঠোন নেই, বাগান নেই, অথচ নগরীর ভবনগুলোর কার্নিশ, ছাদ, বারান্দা ও চিলেকোঠায় নিজেদের আবাস নিশ্চিত করেছে তারা। মাত্র ৫/৬ বছর আয়ুস্কালের এ পাখি মানুষের আড়াল হতে চায় না, শত সংকটেও এ নগরী তাদের প্রাণপ্রিয় চারণভূমি। একসময়কার সবুজ আঙিনা, মাধবীলতার ঝাড়, ফুলের বাগানে সমৃদ্ধ ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের বাড়িগুলো হারিয়ে যাচ্ছে এ নগরী থেকে, স’ান পাচ্ছে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, ভূ-স’াপত্যিক এ বিবর্তনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চড়-ইদের বংশবৃদ্ধি ও টিকে থাকা। তথাপি চড়-ইরা এ ব্যস্ত নগর জীবনের অংশ, আমাদের কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের উপজীব্য। মেঘের গর্জনে, মুষলধারে বৃষ্টিতে, কালবৈশাখীর ঝড়ে এরা দলে দলে আশ্রয় নেয় প্রকৃতির কোল ছেড়ে বাসাবাড়ির বারান্দায়, চিপেচাপায়। এ নগরীর হিমশীতলতা, তপ্ত হাওয়া, মশার যন্ত্রণা, তথাপি জীবন-জীবিকার সন্ধানে পেতে চায় মানুষের উষ্ণতা। যত নিঃসীম আকাশ থাকুক, যত অনন্তে ওড়ার ডানা থাকুক, বারবার ফিরে আসে মানুষের কোলাহলে। অজস্র কীট পতঙ্গ এবং মাছি সাবাড় করে পরিবেশের রক্ষাকবচ হিসেবে অবদান রাখছে চড়-ই।
ইদানিং অনেকে চড়-ই ধরে খাওয়া শুরু করেছে বলে জেনেছি, এ নিষ্ঠুরতা ক্ষমার অযোগ্য অমানবিকতা। নির্বিচারে চড়-ই পাখি হত্যার পরিণামে ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগের শাস্তি ভোগ করেছিল, তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ চীন। চড়-ই ফসলের ক্ষতি করে, এ ভ্রান্ত ধারণায় ৫০’ এর দশকে মাওসেতুং’ এর নির্দেশে লক্ষ লক্ষ চড়-ই নিধন করা হয়, পুরস্কৃত হয় নিধনকারীরা। কিন’ ঠিক ৪/৫ বছরের মাথায় চড়-ই এর অভাবে শস্যক্ষেত্রে পোকামাকড়ের বিধ্বংসী আক্রমণে খাদ্য সংকটের কবলে পড়ে চীন। দুর্ভিক্ষে মারা যায় প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ। এরপর আবার শুরু হয় চড়-ই রক্ষার আন্দোলন। সুতরাং জীবন পুড়ে ছাই হয়ে যাবে পাখির অনিষ্টতার অভিশাপে, এমন অজস্র নজির আছে পৃথিবীর বুকে।
চড়-ই পাখিদের বাঁচতে দিন। তাদের খাবার দিন। বারান্দায় বিষ্ঠা ছড়ালেও গৃহিণীরা তাদের আপন করে নিন। স্নেহের তরুণ প্রজন্ম, তোমাদের চার পার্শ্বে ঘিরে আছে প্রযুক্তি, তাই ক্রমশ সরে যাচ্ছে পাখি ও প্রকৃতি। পড়া আর বিনোদনের ফাঁকে প্রতিদিন দু’বেলা ছাদে বা বারান্দায় চড়-ইদের জন্য সামান্য খাবার ছিটিয়ে দাও। দেখবে, তাদের কত আনন্দ, আহ্লাদ। প্রিয় গৃহিণীরা, সাংসারিক ব্যস্ততার মাঝেও মিটিয়ে দিন চড়-ইদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার যন্ত্রণা। ক্ষুধার জ্বালা প্রকাশে অক্ষম যারা, তাদের জন্য উজাড় করে দিন প্রগাঢ় ভালোবাসা, এখানেই মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির সার্থকতা। এ মহৎ কাজে সন্তানদের অনুপ্রাণিত করুন। ড্রইংরুমের দেয়ালে ছবির পাখি কিংবা খাঁচায় পোষা পাখির চেয়ে চাই বাস্তব পাখির সঙ্গে সখ্যতা। মহান স্রষ্টার প্রতিটি সৃষ্টির মর্যাদা আছে। বিশাল এ প্রকৃতির রাজ্যে জীবনটা পারস্পরিক, সামষ্টিক। কোন জীবনই ক্ষুদ্র নয়, কোন প্রাণীই সামান্য নয়, শুধু জৈব প্রবৃত্তি পূরণের জন্য মানুষের জীবন নয়। পশুপাখি, গাছপালা ও মানুষ মহান আল্লাহর ঐশী নিয়মে এক অখণ্ড সূত্রে আবদ্ধ। আমাদের প্রতিটি ঘরবাড়ি যেন হয় চড়-ই পাখির জন্য পরম মমতায় ভরা ভুবন, নির্ভয় আবাসন। জালের মত জড়িয়ে আছে আমাদের জীবনে ফেসবুক, টিভি, ক্রিকেট। তাই হারিয়ে যাচ্ছে সব অনুভূতি, আবেগ।
আসুন, কম্পিউটার গেমস আর টেলিভিশন নির্ভর যান্ত্রিক বিনোদনের আসক্তি কমিয়ে একই সমতলে গড়ে তুলি চড়-ই পাখির সঙ্গে মিতালী। মানুষ ও পাখির সখ্যতায় পূর্ণ হয়ে উঠুক নগরীর প্রতিটি বাড়ি। ‘নিশ্চিত করি তাদের জন্য নিরুপদ্রব আবাসন, বিচরণ ও জীবনধারণ।’ এ নগরীতে তারা চায় নিরাপদ অভিবাসন।
পাখি ও প্রকৃতি বিলুপ্তির এ যুগসন্ধিক্ষণে সচেতন নাগরিকদের কাছে বিনীত অনুরোধ, “শত ব্যস্ততার মাঝে যেন আমরা উন্মেষ ঘটাই চড়-ই পাখিদের প্রতি মমত্ববোধ। আমাদের সামান্য ত্যাগ আর কষ্ট, সৃষ্টি করতে পারে কংক্রিটের এ জঙ্গলে চড়-ই পাখিদের জন্য একখণ্ড প্রকৃতির অংশ।”