ধূমপান ও মাদক সেবন কি আলাদা বিষয়

আকাশ ইকবাল

ধূমপান ও মাদক সেবন করা কি দুটো আলাদা আলাদা বিষয়? এই প্রশ্নটি আমি অনেক ধুমপায়ী ও মাদক সেবনকারীকে করেছিলাম। কিন’ তারা সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। তারা উত্তরে বলেছিল, দুটো আলাদা বিষয়! এই প্রশ্নটি কয়েকজন সচেতন নাগরিককেও করেছিলাম। কিন’ তাদের বক্তব্যে এটাই বুঝতে পেরেছি যে, ধূমপান ও মাদক আলাদা। অর্থাৎ ধূমপান ও মাদক সেবন দুটো আলাদা বিষয়। আসলে কি তাই? না। দুটোই এক।
ধূমপান ও মাদক সেবনে রয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক। কারণ, পৃথিবীতে যত মাদকাসক্ত ব্যক্তি আছে, তারা প্রত্যেকেই প্রথম ধূমপান দিয়ে শুরু করেছেন। কেউ আগে মদ-গাজা বা হেরোইন খেয়ে মাদকাসক্ত হননা। মাদক যেমন, মদ-গাজা, ইয়াবা-হেরোইন ইত্যাদি। মাদকের গায়ে লেখা থাকে না ‘মাদক স্বাসে’্যর জন্য ক্ষতিকর’। তবে আমরা সবাই জানি মাদক স্বাসে’্যর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কিন’ সিগারেটের প্যাকেটের গায়েই লেখা থাকে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ ‘ধূমপান স্বাসে’্যর জন্য ক্ষতিকর’। ক্ষতিকর জেনেও পান করে। এটাকে আবার তারা আধুনিকতা বলে মন্তব্য করে ! আবার কেউ কেউ মনের ভেতর জমে থাকা দুশ্চিন্তা দূর করার ওষুধ হিসেবে পান করে!
আমরা জানি রোগ হলে ওষুধ সেবন করতে হয় নিরাময়ের জন্য। রোগ নিরাময়ের জন্য ক্ষতিকর কিছু সেবন করা হয় না। এখন হয়তো অনেকের মনে প্রশ্ন জাগবে, তাহলে ইউরোপ আমেরিকায় ডাক্তাররা গাজাকে স্বাসে’্যর জন্য উপকার বলেছেন কেন? যেখানে গাজাও একটা মাদক। হ্যাঁ, আমি আপনার কথার সাথে একমত। কিন’ আপনি ভুল বুঝে আছেন। আপনি যেখানে পড়েছেন বা যার কাছে শুনেছেন সে কি এটা বলেনি, পরিমাণ মতো খাওয়া স্বাসে’্যর জন্য উপকার? হুম। গাঁজা পরিমাণ মতো খাওয়া স্বাসে’্যর জন্য উপকার। কিন’ ইচ্ছে মতো দুঃখ ভুলার জন্য সেবন করা উপকার নয় বরং ক্ষতি। আমি যখন গাঁজা সেবনকারীদের প্রশ্ন করে ছিলাম, তখন তারা আমাকে পাল্টা এই প্রশ্নটি করেছিল। যদিও প্রমাণ সহকারে তাদের বুঝিয়েছি।
দুই. ধূমপান স্বাসে’্যর জন্য ক্ষতিকর, একথা আজ শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞান নয়, স্বাস’্য বিশেষজ্ঞদেরও হুশিয়ারি সংকেত। ধুমপানের ক্ষতিকর দিক উপলব্ধি করে এক প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী বলেছেন, ‘উৎরহশ ঢ়ড়রংড়হ নঁঃ ষবধাব ংসড়শরহম’ অর্থাৎ ধূমপান বিষপানের চেয়েও মারাত্মক। কারণ বিষপানের সাথে সাথে জীবনের মৃত্যু ঘটে কিন’ ধুমপানের ফলে মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মরে। এর ফলে সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয় ঘটে। ব্যক্তি সমাজ নিশ্চিত অকল্যাণের দিকে ধাবিত হয়। যা এক সময় মাদকাসক্তে পরিণত হয়। ধূমপান স্বাস’্য রক্ষা, শরীর গঠন ও নানা প্রকার রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অপকার ছাড়া কোন উপকার করে না, এই কথার প্রমাণ আমরা প্রতিনিয়তই দেখি। আমার এক বন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলাম, দোস্ত তুই কেন ধূমপান করিস? উত্তরে সে আমাকে বলেছিল, ধূমপানের ফলে শরীর শিথিল ও মনোরম হয়, নিজেকে চিন্তামুক্ত রাখি, একঘেয়েমি কাটাতে ধূমপান সাহায্য করে। আর তুই তো জানিস সিগারেট স্মার্ট ছেলেরা খায়।
আমার বন্ধুর উত্তরে বুঝতে বাকি রইল না যে, সে ধুমপানের মধ্যে ইতিবাচক দিক রয়েছে বলে বুঝাচ্ছে। কিন’ আমি আজ পর্যন্ত ধূমপানেকোন ইতিবাচক দিক খুঁজেই পেলাম না। আমার এক বড় ভাই, খুবই সচেতন মানুষ। কয়েকদিন তাদের সংগঠনের উদ্যোগে মাদক বিরোধী আলোচনা সভা ও মাদক বিরোধী একটি ইউনিয়ন কমিটি করেছেন। তাঁর কাছেও আমার প্রশ্ন ছিল, আপনারা কয়েক দিন আগে মাদক বিরোধী কমিটি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন। মরণঘাতী মাদকের বিভিন্ন ক্ষতিকারক দিক গুলো সবার সামনে তুলে ধরেছেন। কিন’ আপনি নিজেই মাদক ছাড়তে পারেননি। অর্থাৎ সিগারেট খাওয়া বন্ধ করেননি।
তার বক্তব্যে এটা বুঝতে পেরেছি, তিনিও সিগারেটকে মাদক বলে মনে করেন না। তিনিও আমার বন্ধুর মতো সিগারেটের ইতিবাচক দিকের কথা বলেছেন। যদিও নেতিবাচক দিকের কথাও স্বীকার করেছেন। ওনার মতো এমন হাজারো সচেতন মানুষ আছেন যারা নিজেরাই ধূমপান করে নিজেদের শরীরের ক্ষতি করে ও ধূমপান করার মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করে মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলে। কিন’ তারা নিজেরাই চিন্তা করে না মাদক যতটা ক্ষতিকর ততটাই ক্ষতিকর ধূমপানও। শুধু মাদক যুব সমাজকে নষ্ট করে না। ধূমপানও যুব সমাজকে নষ্ট করে। ধূমপান যুব সমাজকে মাদক সেবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সিগারেট ও মাদক দুটো আলাদা কোন বিষয় নয়। ধূমপান ও মাদক, এই বিষয়ে ইন্টারনেটে তেমন কিছু খুঁজে না পেলেও আমি দুএকজন চিকিৎসকের সাথে কথা বলেছি। তারা মনে করেন, ধূমপান ও মাদক দুটো এক।
ধূমপান ও মাদক দুটো যে আলাদা বিষয় না তা এগুলোর ক্ষতিকর দিকগুলো আলোচনা করলেই সু-স্পষ্ট হয়ে যাবে।
তিন. ধূমপান ও মাদক সেবনে প্রধান তিনটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে, ১) শারীরিক ২) আর্থিক) ও ৩) পরিবেশগত। সিগারেটের ধোঁয়া যেহেতু কোন তরল পানীয় নয় সেহেতু কালো ধোঁয়াগুলো শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যেখানে সর্বগ্রাসী থাবা দিয়ে আক্রমণ করে না। কয়েক বছর আগে নেদারল্যান্ডে সাত হাজার ব্যক্তির কিডনির ওপর ধূমপানের প্রভাব বিষয়ে গবেষণা হয়।
এতে প্রতীয়মান হয় ধূমপায়ীদের শরীরে ক্রিয়েটিনিনের পরিমাণ অনেক বেশি। ধূমপায়ীদের প্রস্রাবে অ্যালবুমিনও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রায় পাওয়া গেছে। এ দু’টি কিডনি ধ্বংসের প্রাথমিক লক্ষণ। মাদকের কারণেও খুব দ্রুত কিডনি নষ্ট হয়ে যায়।
চার. মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের জন্য সিগারেটকে সব নেশার ‘মা’ বলা হয়। উইকিপিডিয়াতে সুস্পষ্ট ভাবেই লিখা আছে, শুধু ধূমপান বা তামাক সেবনে প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রায় চার মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়। তাছাড়া ধূমপানেশিশুদের মারাত্মক ক্ষতি হয়। ধুমপানের কারণে শিশুর নিউমোনিয়া, ব্রংকিওলাইটিস, ব্রংকাইটিস, হাঁপানি ইত্যাদি রোগ হতে পারে। একটি জরিপে দেখা গেছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবছর তিন লাখ শিশু পারিপার্শ্বিক ধূমপানেনিউমোনিয়া ও ব্রংকাইটিসে ভোগে। আর যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর পারিপার্শ্বিক ধুমপানের কারণে ১৭ হাজার শিশু বিভিন্ন রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়।
আমাদের দেশের ধুমপায়ীরা হয়তো জানে না, তাদের কারণে হাজার তাদের সন্তানরাও বিভিন্ন রোগে ভুগছে। কিন’ দুঃখের বিষয় আজ অনেক সচেতন মানুষও ধূমপানকে আধুনিকতার বহ্নিপ্রকাশ বলে মনে করেন। যেখানে ধূমপান গাজার থেকেও ক্ষতিকর। সেই বস’টিকে সবাই পকেটে নিয়েই হাটে। অন্যান্য মাদক দ্রব্য কষ্ট করে ছেড়ে দেওয়া যায়, কিন’ ধূমপান বা সিগারেট খাওয়া এমন একটি নেশা যা ছাড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আমি দেখেছি, যে মানুষটির এই পৃথিবীতে এক হাত থাকার জায়গা নেই, যে মানুষটি সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে খায়, যে মানুষটি এক বেলা না খেয়ে কাটায় সেই মানুষটিও একদিন ধূমপান না করে থাকতে পারে না।
এবার ঠান্ডা মাথায় একবার চিন্তা করুন, ধূমপান আর মাদক দুটো আলাদা বিষয় নয়। বলা যায়, গাজার মতো একটা কঠিন মাদকের চেয়েও ধূমপান ক্ষতিকর। মাদক ক্ষতিকর তাই আইনিভাবে নিষিদ্ধ, ধূমপানও ক্ষতিকর হলেও আইনিভাবে নিষিদ্ধ নয় কেন? কারণ সিগারেট কোম্পানীগুলো সরকারের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন করা। মাদকের মতোও যদি তামাক চাষ বা সিগারেট আইনি ভাবে নিষিদ্ধ করা হয় তাহলে ধূমপান করা মাদকের মতো অনেকটা কমে যেত।