আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস

নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান

সুপ্রভাত বহির্বিশ্ব ডেস্ক

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত অভিবাসীদের নানা অবদানের স্বীকৃতি ও উদযাপনের জন্য প্রতিবছরের মতো সোমবার পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন দিবস। দিবসটিতে অভিবাসীদের কাজের মূল্যায়নের পাশাপাশি তাদের জীবনের গল্প তুলে ধরে বিশ্বব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। আর এছাড়া আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলা অভিবাসন ঠেকাতে সুবিধার সুষম বণ্টনের পাশাপাশি মানবাধিকার নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। খবর বাংলাট্রিবিউন।
জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাব মতে, বর্তমানে বিশ্বে মোট অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ২৫ কোটি ৮০ লাখ। ২০১৫ সালে তা ছিল ২৪ কোটি ৪০ লাখ যা ২০০০ সালের চেয়ে ৪১ শতাংশ বেশি। আর বিশ্বে শরণার্থীর সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি। অভিবাসীর সংখ্যা এখন যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি। ১৯৯০ ও ২০০০ সালে অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৪০ লাখ ও ১৭ কোটি ৫০ লাখ।
সাধারণত দুটি কারণে মানুষ অভিবাসনে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তা হলো, সরিয়ে দেওয়া ও টেনে নেওয়া। বিভিন্ন কারণে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে বাধ্য হলে তা সরিয়ে দেওয়ার কারণের মধ্যে পড়ে। সেবার অপ্রতুলতা, নিরাপত্তাহীনতা, অপরাধপ্রবণতা, ফসলহানি, খরা, বন্যা, দারিদ্র্য, যুদ্ধ ইত্যাদি কারণে মানুষ এক স্থান থেকে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়। আর টেনে নেওয়া প্রক্রিয়ায় মানুষকে বিভিন্ন সুবিধার লোভ দেখিয়ে নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। বিশাল কর্মসংস্থান, অতিরিক্ত সম্পদ, উন্নতর সেবা, মনোরম আবহাওয়া, নিরাপত্তা, অপরাধের স্বল্পতা, স্বল্প ঝুঁকি ইত্যাদি কারণে মানুষ বিশ্বের নির্দিষ্ট অঞ্চলে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ অভিবাসী ইউরোপ ও এশিয়ায় বাস করে। আর অর্ধেক অভিবাসীর জন্ম এশিয়ায়। অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে তৃতীয় সর্বোচ্চ অভিবাসী বাস করে। সেখানকার অভিবাসীদের মধ্যে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান ও ওসেনিয়া অঞ্চলের অভিবাসীরাই বেশি। ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এশিয়ায় প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ অভিবাসী বেড়েছে যা অন্য যেকোন অঞ্চলের চেয়ে বেশি। বিশ্বের অনেক অঞ্চলে প্রাথমিকভাবে একই ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চলের দেশে অভিবাসন ঘটে। আফ্রিকায় বাস করা অভিবাসীদের প্রায় ৮৭ শতাংশই ওই অঞ্চলের মানুষ। এশিয়ার ৮২ শতাংশ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানের ৬৬ শতাংশ ও ইউরোপের ৫৩ শতাংশ অভিবাসী একই অঞ্চলের। তবে উত্তর আমেরিকার ৯৮ ভাগ ও ওশেনিয়ার ৮৭ ভাগ অভিবাসী অন্য অঞ্চল থেকে এসেছে।
ভারত থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ অভিবাসী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে। তাদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ। এক কোটি ২০ লাখ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মেঙিকো। এরপরই রয়েছে রাশিয়া, চীন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইউক্রেন। এসব দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ অভিবাসী হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাস করছে। তালিকার শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে ১১টি এশিয়া, ৬টি ইউরোপ এবং আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানের একটি করে দেশ রয়েছে।
এ বছর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। এরমধ্যে জেনেভায় বিশ্ব অভিবাসন চলচ্চিত্র উৎসবের পুরস্কার বিতরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের ইউনিসেফ হাউজে অভিবাসন ইস্যুতে বিতর্ক অনুষ্ঠান ছাড়াও বিশেষ চিত্র প্রদর্শনী চলবে। প্রদর্শনীটির মাধ্যমে শরণার্থীদের সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন অভিবাসীর ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত প্রামান্য চিত্র ও তাদের সাক্ষাৎকার সেখানে প্রচার করা হবে।
বিশ্বকে এগিয়ে নিতে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আইওমের মহাপরিচালক উইলিয়াম ল্যাসি সুয়িং । এবছর দিবসটির কর্মসূচির বিষয় তুলে ধরার সময় এ আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বাণীতে বলেন, ‘আমাদের সমাজে অভিবাসন সব সময়ই ছিল। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ নতুন সুযোগ আর উন্নতর জীবনের জন্য বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেরিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা, অস্থিরতা, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও উন্নততর জীবনের আকাঙ্ক্ষা সেই সময় থেকেই মানুষের মধ্যে আছে।’
অভিবাসীদের অধিকারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কার্যকর আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে অভিবাসীদের মধ্যে সুবিধার ব্যপক বণ্টন ও সর্বত্র যথাযথভাবে মানবাধিকার সংরক্ষণের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারি।’
জাতিসংঘ মহাসচিব বিশ্ব নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে বলেন, ‘২০১৮ সালে ক্রমান্বয়ে ও নিয়মিত অভিবাসনের মধ্য দিয়ে এর বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবিলার ঘোষণা দিয়েছিলন বিশ্ব নেতারা। সবার উচিত ওই ঘোষণা বাস্তবায়ন করা।’