বিজয়ের ৪৬ বছর

উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ

মোতাহার হোসেন

দেশ স্বাধীন হলো আজ থেকে ৪৬ বছর আগে। ৪৬ বছর আগের বাংলাদেশ আর ৪৬ বছর পরের বাংলাদেশ এক নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের সুদীর্ঘ ৪৬ বছরের পথপরিক্রমায় অর্থনৈতিক, সামাজিক খাতসহ সামগ্রিকভাবেই দেশ এগিয়েছে অনেকদূর। বঙ্গবন্ধুর আজীবনের স্বপ্ন ‘জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি’ অর্জনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত আমরা। বঙ্গবন্ধু দেশকে ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন করেছেন আর তাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতি অর্থনৈতিক মুক্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বে বাংলাদেশ এখন উদীয়মান অর্থনীতির, সমৃদ্ধির দেশ। ২০১২ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে দেশ। একই সাথে এ সময়ের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত হবে দেশ।
এই ৪৬ বছরে বড় অর্জন হচ্ছে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে স্বাধীনতার ৪৬ বছরে দেশে আবাদি জমি কমেছে ব্যাপক হারে। তারপরও কৃষিতে সরকারের নব নব সংযোজন, প্রযুক্তির প্রয়োগ, অঞ্চল, মাটি, আবহাওয়া উপযোগী ধান, গমসহ অন্যান্য বীজ উদ্ভাবন বিশেষ করে ৪৮ রকমের হাইব্রিড জাতের উন্নত ও অধিক ফলনশীল ধান বীজ উদ্ভাবন করায় হাজার বছরের খাদ্য ঘাটতির দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। শিক্ষার হার বেড়েছে, মানুষের গড় আয়, গড় আয়ু, রিজার্ভ, রেমিটেন্স বেড়েছে ঈর্ষণীয় হারে। যা এখন পুরোপুরি দৃশ্যমান। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার ১০ মেগা প্রকল্পের শতভাগ বাস্তবায়ন হলে বিশ্বে বাংলাদেশ হবে উন্নয়নের রোল মডেল।
এখানে একটি অপ্রিয় সত্য কথা হচ্ছে: স্বাধীনতাবিরোধী, দেশবিরোধী এবং নৈরাশ্যবাদী বিশেষ করে আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির শত্রুপক্ষ বরাবরই বলে‘ দেশ স্বাধীন হলেও তেমন লাভ হয়নি। দেশে উন্নয়ন হয়নি, অভাব যায়ন্তিইত্যাদি ইত্যাদি। তারা দেশের উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা, দেশ অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ সামগ্রিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি, উন্নয়ন চোখে দেখে না। অথচ নির্দ্বিধায় তাদের অনেকেই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করে, বক্রপথে অর্থ বিত্ত ভৈববের মালিক হয়েছে। এরাই বিশ্বাসঘাতক, এদের কার্যকলাপ দেশ, স্বাধীনতা.মানবতা, মানবাধিকারের পরিপন্থি। গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং সুশাসনের পরিপন্থি। এরাই জাতির পিতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নেতৃত্বকে পছন্দ করে না। বরং পেছন থেকে ষড়যন্ত্র করে। অতীতে বিশেষ করে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রায় ৪৬ বছর ধরে অনবরত মিথ্যাচার করেছে এই চক্র।
বিজয় অর্জনের এ ৪৬ বছরে এসেও মনে হচ্ছে এখন অব্দি স্বাধীনতা, মহান মুক্তিযুদ্ধ, মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনের পথে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করছে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সময়কার শত্রুপক্ষ। কাজেই ১৯৭১ সালে আমাদের লড়াই ছিল মুক্তির লড়াই। যে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চে গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর অমর কবিতাখানি, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- এর মধ্য দিয়ে তা এখনো একেবারেই শেষ বা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি।
আজকের প্রজন্ম হয়ত অনেকেই বুঝতে পারবেন না কত ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। সে কারণে কিঞ্চিৎ এই দিকটি সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিশ্বের নবীনতম দেশ ছিল; বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশও বটে। ২৫ মার্চ কালরাত্রির পর ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে বিশ্বব্যাংকের একটি বিশেষজ্ঞ দল কয়েকটি শহর পরিদর্শন শেষে মন্তব্য করেছিল- ‘এগুলো দেখতে পারমাণবিক হামলার পরের একটি সকালের মতোই।’ প্রায় ৬০ লাখ বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছিল। ১৪ লাখ কৃষক পরিবার চাষবাসের হাল হাতিয়ার ও পশু হারিয়েছিল। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ধ্বংস। রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত, সেতু বিধ্বস্ত এবং অভ্যন্তরীণ জলপথ অবরুদ্ধ হয়েছিল। ত্রিশ লাখ শহীদ, দুলাখ মা বোনের ইজ্জত আর বিপুল সম্পদ ক্ষতির বিনিময়ে অর্জিত হলো বাঙালির বিজয়, বাঙালির স্বাধীনতা।
পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত দেশটির ধ্বংসযজ্ঞ শুধুই বেড়েছে। কেননা পাকিস্তান বাংলাদেশের পোড়ামাটি চেয়েছিল। বাস্তবে পাক বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা তাই করেছিল।
সময়টা একেবারে কম নয়, এরি মধ্যে অতিক্রম করেছি ৪৬ বছর। আমরা বিজয়ের ৪৬ বছর পার করে ফেললাম। এই ৪৬ বছরের মধ্যে ২৮ বছর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সরকার ক্ষমতায় ছিল। জাতি রাষ্ট্র গঠনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে সুস্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক মদদ ছিল।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দিয়েছিল। অথচ স্বাধীনতার ৪৬ বছরে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখন তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, সম্পদে ভরপুর এবং সম্পদে উপচেপড়া ঝুড়িতে পরিণত হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে স্বাধীনতা অর্জন এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ, সাহসী, সৎ, যোগ্য নেতৃত্বের ফলে। আশির দশকে বাংলাদেশের গার্মেন্টস্‌ শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের সূচনা হয়। কালক্রমে এই শিল্প এখন বিশ্বে অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক শিল্পে পরিণত হয়েছে। প্রবাসী আয় আজ বার্ষিক ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আজ আমরা শত্রুর মুখে চুনকালি দিয়ে বিশ্ব অগ্রগতির মহাসড়কে। শেখ হাসিনা সরকারের সাফল্য দেখে বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা গোল্ডম্যান স্যাকস বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি আশু সম্ভাবনার সর্বোচ্চ ১১টির মধ্যে রয়েছে। জেপি মরগ্যান বলছে, বাংলাদেশ অগ্রসর দেশগুলোর মধ্যে ‘ফ্রন্টিয়ার ফাইভ’। সিটি গ্রুপ যা বলছে তা আরও উৎসাহব্যঞ্জক- ‘বাংলাদেশ এখন থ্রিজি অর্থাৎ ‘থ্রি গ্লোবাল গ্রোথ জেনারেটর গ্রুপ’। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে ‘লিঙ্গভিত্তিক আয় সমতায়’ দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ। সাউথ ইস্ট এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ শীর্ষে। দেশের শ্রমজীবী মানুষের অবদানেই এই অর্জন। নতুন প্রজন্ম এই দেশকে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে বক্তৃতায় বলেছেন, ‘বাংলাদেশ এখন চীনের সঙ্গে নেক টু নেক’ পাল্লা দিচ্ছে। ১০ বছর আগে এটি ছিল অচিন্ত্যনীয়। কাজেই স্বাধীনতার ৪৬ বছরে এখন যে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন, যে সাফল্য তার ধারাবাহিকতায় প্রয়োজন আগামিতে বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতা। তাহলে নিশ্চিত হবে স্বাধীনতা সুবর্ণজয়ন্তীতে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি পূর্ণতা পাবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট