ফেরা

বাসুদেব খাস্তগীর
Untitled-1

শান্তিপুর গ্রাম বড়ো শান্তিময় ছিলো। কিন্তু হঠাৎ কী থেকে যেনো কী হয়ে গেলো। সালটা ঊনিশ শ একাত্তর। চারিদিকে যুদ্ধের দামামা। গোলাগুলির শব্দ। বারুদ গন্ধে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশ। একদল মুক্তিযোদ্ধা। দেশকে স্বাধীন করার লড়াইয়ে প্রাণপণ ব্যস্ত। আরেক দল রাজাকার, যারা পাকিস্তানি সৈন্যদের সহযোগিতা করে অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষায় তৎপর। তারা দেশ স্বাধীন ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাজের সরাসরি বিরোধিতা করছে। এই শান্তিপুর গ্রামের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র রাফি। রাফির বাবার পাশের গ্রামের বাজারে একটি ওষুধের দোকান আছে। রাফির সাথে স্কুলে যায় পাশের বাড়ির একই ক্লাসে পড়া বন্ধু সৃজন। পুরো নাম সৃজন রায়। বাবা রেলওয়েতে চাকরি করেন। একাত্তরের মে মাস। রাফি এবং সৃজন দুইজনেই স্কুলে গেছে। চারিদিকে উত্তেজনা। স্কুলে উপস্থিতি কম। স্যার বলেছে স্কুলে আশপাশের অবস্থা বুঝে আসতে।
সৃজন সেদিন রাফিকে বলে, রাফি আমরা বোধহয় আর দেশে থাকছি না।
কেন ?
আমার বাবাতো কালকে সে রকম কথাই বললো।
রাফি বলে, তাহলে আমরা কী থাকবো?
তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো।
দুইজনের এমন কথোপকথনে এক ধরনের বিরহের আবহ সৃষ্টি হয়। অনেক কথা বলতে বলতে তারা বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। রাফি রাতে শোনে দেশের যুদ্ধ নিয়ে বাবা তার মায়ের সাথে কী সব কথা বলছে। শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে রাফি। প্রতিদিনের মত সকাল হয়েছে, রাফি স্কুলে যাবার জন্য প্রস্তুত। এদিকে বাবা প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হন। হাঁটতে হাঁটতে সৃজনদের বাড়ি পার হয়ে কতদূর গিয়ে আবার বাড়িতে আসেন। সেদিন হাঁটতে গিয়ে সকালে শোনেন সৃজনরা গত রাতেই সপরিবারে ভারত চলে গেছে। বাড়িতে এসেই রাফির বাবা বলেন,
রাফি স্কুলে যাবার দরকার নেই, সৃজনরা কাল রাতেই বাড়ি ছেড়ে ভারত চলে গেছে।
মনের মাঝে হঠাৎ যেনো কেমন করে উঠলো। রাফি ভাবে-সৃজন যে স্কুলে কথাটি বলেছিলো, তাহলে তা সত্যি। কিন্তু এভাবে যে দ্রুত চলে যাবে রাফি তা ভাবেইনি। রাফি দ্রুত বাবাকে প্রশ্ন করে, তাহলে বাবা আমরাও চলে যাবো?
না, বাবা আমরা যাবো না।
ওরা কেন চলে গেলো?
সে সব তুমি বুঝবে না বাবা।
রাফি ঘরের বারান্দায় বসে সৃজনদের বাড়ি দেখে, আর মনটা যেনো কেমন করে হাহাকার করে ওঠে। রাতে ঘুমুতে যায় রাফি। মধ্যরাতে হঠাৎ চিৎকার। আগুন আগুন। সবাই ঘুম থেকে উঠে দেখে সৃজনদের বাড়িতে কারা যেনো আগুন দিয়েছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে বাড়ি। রাফির প্রশ্ন-
বাবা ওদের বাড়িতে আগুন দিলো কেন? ওদের কী অপরাধ ছিলো বাবা?
বাবা কোন উত্তর দেয় না। মা বলে, তুমি ওসব বুঝবে না বাবা ‘বাবাও বলে তুমি এসব নিয়ে চিন্তা করো না’।- ‘ওরা যদি আমাদের ঘরেও আগুন দেয় ?
না আমাদের দেবে না বাবা।
বড়ো বিষণ্ন চিত্তে দিন কাটে রাফির। রাফির বাবা দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরে প্রায় রাত হয়।
ইদানীং দেশের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফেরেন। রাফি প্রতিদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে বাবার জন্য। সেদিন রাফি বাবার অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু বাবা আসছে না। প্রচণ্ড উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে রাফির।সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত এলো, কিন্তু রাফির বাবা এলো না। রাফির মা চিন্তায় চিন্তায় এক রকম অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রতিবেশিরা অনেকেই পরামর্শ দিলেন স্থানীয় মেম্বার অথবা চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ করতে। ওদের সাথে নাকি রাজাকারদের যোগাযোগ আছে। একদিন সকালে মেম্বারের বাড়িতে গেলো রাফি, বাবার খোঁজ জানতে চাইলো। মেম্বার বলে,
তোর এত্তো সাহস এতটুকুন ছেলে এখানে এসেছিস? আচ্ছা তোর বাবা রাজাকার না মুক্তিযোদ্ধা?
আমি ওসব জানি নে।
যদি জানিস তাহলে একটা সূত্র ধরে খোঁজ করতাম আর কি। আচ্ছা তোদের পাশের বাড়িতে যে সেদিন আগুন দিলো তোর বাবা সে সম্পর্কে কিছু বলেছে?
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, বলেছে তুই ওসব বুঝবি নে। হতাশ হয়ে ফিরে আসে রাফি। এইভাবে সে চেয়ারম্যানের বাড়িসহ নানা জায়গায় তন্ন তন্ন করে খোঁজে বাবাকে। সবার প্রশ্ন ‘তোর বাবা রাজাকার নাকি মুক্তিযোদ্ধা’। সে প্রশ্নের উত্তর তো তার জানা নেই। কিন্তু রাফি মনে মনে বলছে,
সেই দিনের সেই আগুনের লেলিহান শিখায় যারা সৃজনের ঘরবাড়ি পোড়ালো তারা যদি সত্যি আমার বাবাকে ধরে নিয়ে যায়, তাদের যদি পেতাম আগুনে নিক্ষেপ করে বুকের জ্বালাকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করতে পারতাম। সেদিন গভীর রাত। দরজায় টোকা।
বাবা রাফি, আমি তোমার বাবা। আমি ফিরেছি, দরজা খোলো। সঙ্গে আছে আরো চারজন’। দরজা খুলে দেয় রাফি। সবার হাতে ভয়ংকর সব অস্ত্র। দৌড়ে আসে রাফির মা। রাফির বাবা বলে ‘চুপ’। রাফির মা বলে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, তুমি না বলে… ।
চুপ করো। আমরা সৃজনের ঘর পোড়ানো মানুষ নামের অমানুষদের বিরুদ্ধে লড়ছি, লড়াই করছি স্বাধীনতার জন্য। সেদিন বাজার থেকে ফেরার আগে এক বিশ্বস্তসূত্রে খবর পাই, রাস্তায় আক্রমণ করা হবে, তাই অস্ত্র নিয়ে আমরা ক’জন ওদের সেদিন বিতাড়িত করেছি। আর কোন উপায় ছিলো না।
এরপর আরো কয়েকটি সফল অপারেশন করেছি। ফেরার কোন উপায় ছিলো না রে। রাফির বুকের আগুন যেনো দপ করে নিভে গেলো।
বাবার জন্য গর্বে বুক ভরে গেলো। রাফি বলে, ‘বাবা সেজন্যই তোমার খোঁজে গেলে ওরা সবসময় আমাকে জিজ্ঞেস করতো, ‘তোমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা না রাজাকার’? আমি উত্তর দিতে পারিনি। বাবা বলে,
তবে এখন কোথাও তোমাকে সে প্রশ্নের উত্তর দেবার দরকার নেই বাবা। রাফি বলে,
বাবা সৃজনরা কি…।
হ্যাঁ বাবা একদিন ফিরবেই। সেজন্যই তো লড়াই করছি।