নীলিমায় স্বপ্নীল

রণেন দাশ মিশুক

প্রচণ্ড গরমে অস্থির নগরী। বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও নেই। এটা অবশ্য বৃষ্টির সময় নয়। কালবৈশাখীর মাঝে মাঝে দেখা পাওয়া যায় বৈকি। মাঝে মাঝে বৃষ্টি আসে মুষলধারে। তবে বন্যার প্রাদুর্ভাব নেয় না। দেখায় ধ্বংসের প্রবণতা। জৈষ্ট্যের তীব্র দাবদাহে এক ফোঁটা জলের জন্য চাতক আহ্বান করতে ভুলে যায়। শিশুরা অতীতে বৃষ্টির জন্য গান ধরতো। কিন্তু এই গরমে এখন অভিভাবকরা শিশুদের গান গেয়ে বৃষ্টি নামানোর কথা বলেন না। বলেন গরমে লোডশেডিংয়ের সময় ব্যাটারি চালিত টেবিল ফ্যানগুলোর নিচে বসে থাকতে, নয়তো বাসায় আইপিএস লাগিয়ে দেন। ঠিক এরকম সময়ে দুপুর বেলাগুলো যখন বেজায় হাঁসফাঁস করে একটু ঘুমিয়ে নিতে, তখন স্বপ্নীল তীব্র রোদের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে বাসের জন্য। জায়গাটা আন্দরকিল্লার কাছেই, বকশীরবিটের সামনে। কিন্তু হেঁটে আর সামনে যেতে ইচ্ছে করছে না। একবারে মার্কেটে গিয়েই আগ্রাবাদের গাড়ি ধরবে। আজ ঠিক ৪টার সময়ই ওর সাথে মিটিংটা ফিক্সড করা আছে। মনে মনে বেশ গুছিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। মাস্টার্স পাশ করে বের হয়েছে বেশ কয়েক বছর। কিন্তু একটা চাকরি আর জুটছে না। এদিকে সরকারি চাকরির বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে প্রায়। নিয়মিতই পরীক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু হয় লিখিত পরীক্ষায় আটকে যায়, নয়তো লিখিত পরীক্ষায় পাস করে মৌখিক পরীক্ষায় পাস করতে পারে না। টিউশনি অবশ্য সে কয়েকটা করে। বেশ ভালোই পায়। কিন্তু তাই বলে সারাটা জীবন তো আর টিউশনি করে চলা যায় না। টিউশন তো আর কোন পেশা নয়। ওর বাবা-মায়ের ভীষণ শখ- ওর একটা ভালো চাকরি হোক। সারাটা বছর সে শুধু পড়াশোনাই করেছে। কিন্তু চাকরি কেন হচ্ছে না সেটা সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। এমনটা নয় যে, তার মৌখিক পরীক্ষা ভালো হয় না, পরীক্ষা সে ভালোই দেয়। কিন্ত কেন জানি শেষ মুহূর্তে সব শেষ হয়ে যায়। আত্মীয় মহল থেকে পরিচিত লোক পর্যন্ত সবাই এতদিন বেশ ভালো ছাত্র হিসেবে ওর প্রশংসা করে এসেছে। কিন্তু এখন ভিন্ন সুর। প্রায়শ ওকে শুনতে হয়, ‘ছেলেতো বেশ ভালোই জানতাম। সারাটা বছর তো খালি পাশই করে গেলো। এখন তো মনে হচ্ছে এত পাশ না করে অন্য কোন হাতের কাজ শিখলেই ভালো হতো। পাশের বাড়ির অমুকের ছেলে তো বেশ চাকরি করে। অনেক টাকা পায় ইত্যাদি ইত্যাদি।” ও শুধু শুনে যায় আর হাসে। ভাবে, হাতি গর্তে পড়লে চামচিকাও লাথি মারে। কিন্তু এসব কথায় তার কিছু আসে না গেলেও তার পরিবারের আসে যায়। বাবা মা সারা বছর ধরে দেখেছে পড়তে। এখন ওকে বেকার দেখে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। মাঝে মাঝে বলে ফেলেন- ‘কিরে কিছু হলো? আর কতদিন এভাবে দেখবি? এবার তো কিছু একটা কর।” কিন্তু ও যে ধরনের ছাত্র, তাতে সামান্য কিছু করে চলাটা ওর গায়ে লাগে। চাকরি বাজারের গল্প এতদিন শুনে এসেছে। এখন তো নিজেই পরিস্থিতির শিকার। কী করবে সে? আজ যেখানে যাচ্ছে সেখানে একটা ফার্মে চাকরির কথা বলার জন্যই যাচ্ছে। ভদ্রলোক তার আত্মীয়। তিনি বলেছেন সিভি নিয়ে যেতে। তাই সিভি আর সার্টিফিকেটগুলো নিয়ে যাচ্ছে। যদি কিছু হয়!
বাস থেকে নেমেই ঘড়ি দেখে সে। ৪টা বাজার কয়েক মিনিট বাকি। পুরো শহর জুড়ে জ্যাম। আজ যেন আরো বেশি। প্রায় দেড় ঘণ্টা জ্যামে ছিলো। উফ! বেশ তাড়াতাড়িই এগিয়ে যায়। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে থাকে। চাকরি হয়ে গেলে আরো একটা স্বস্তি পাবে। নীলিমার সাথে ওর সম্পর্কের ব্যাপারটাও ঝুলে আছে। নীলিমার বাবা বেশ কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করছেন ওকে বিয়ে দিতে। পড়াশোনার অযুহাতেই নীলিমা এতদিন ঠেকিয়ে রেখেছে। কিন্তু আর কত! এভাবে সে নিজেও বিরক্ত স্বপ্নীলের ওপর। তাই আজকের চাকরিটা একটা ট্রাম্প কার্ড। যেভাবেই হোক বাসায় তো ম্যানেজ করে নিতে পারবে। তাই তার শরীরের চাইতেও মনের ওপর ভরসা করে এগিয়ে যায় স্বপ্নীল। পরের সময়গুলো বেশ সময় নিয়ে শেষ হয়। একটা ঘোরের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসে অফিস থেকে। নাহ, হলো না! ভদ্রলোক সিভি রেখে দিলেন। তার নিজের অফিসে সম্ভাবনা নেই। যদি অন্য কোথাও হয় তাহলে দেখবেন। তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরার তাড়না আছে। পরের দিন আবার ঢাকার পথে জার্নি। ব্যাংকের পরীক্ষা।
দুই মাস বাদে ব্যাংকের ফলাফল আসে। প্রিলিমিনারি আর রিটেন দুটোতেই পাশ। ভাইভার তারিখ এখনো পড়েনি। নীলিমার সাথে আজ দেখা হবে। তাই বেশ সময় নিয়ে বের হয়। সিআরবির চত্বরে নীলিমাকে দেখে বেশ ভালো লাগে ওর। খবরটা জানালো। কিন্তু কেন জানি নীলিমার চোখে কোন হাসি নেই। মুখটাও ঘোমটায় ঢাকা। আস্তে আস্তে সব বলে নীলিমা। একটা ভালো পাত্র এসেছে। ওর বাবা চান এখানেই বিয়ে হোক। তাদেরও বিয়ের পরে পড়াশোনাতে আপত্তি নেই। পাত্র আবার এককাঠি বেশি। পড়াশোনার পরে নীলিমাকে চাকরি করানোর কথাও জানায়। তাদের বড় বৌও চাকরিজীবী। কাজেই এখানে বিয়ে হলে সব সম্ভাবনাই মিলে যাবে। বাধ্য হয়ে স্বপ্নীলের কথা জানায় নীলিমা। তারপরই বাবা তাকে চড় মারেন। গালে দাগ বসে গেছে। তাই ওড়নায় ঢাকা। তারপরও নীলিমার মামা বলেছেন স্বপ্নীল যদি তিনমাসের মধ্যে কিছু একটা করতে পারে তো ঠিক আছে। কিন্তু তিনমাসের বেশি হলে এই পাত্রের সাথেই বিয়ে। তিনমাস পর নীলিমার পরীক্ষা। তাই এই সময়টা পাত্রের পরিবারের কাছ থেকে তারা নিতে পারবেন।
স্বপ্নীলের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে। এর মধ্যেই প্রায় আড়াই মাস শেষ। মরিয়া হয়ে চাকরি খুঁজছে। বাবা অসুস্থ। তারপরও অফিস করছেন একমাত্র তার চাকরি নেই বলে। কি করবে সে? এমন কোন চেনাশোনা মানুষ নেই যার কাছে হাত পাতেনি। যে-ই বলেছে সিভি দিতে, তাকেই দিয়েছে। ফটোকপি, ই-মেইল কি করেনি? কিন্তু সব টাকা গচ্চা। এখন এই চিন্তায় পড়তেও পারছে না। কাল একটা স্কুলে ভাইভা। কি হবে? ব্যাংকের ভাইভা দিয়েছে তাও প্রায় অনেক দিন লাগবে। বাবার ওষুধের খরচ, সংসারের খরচ আর কুলানো যাচ্ছে না। সামনে ডিসেম্বর। টিউশনিগুলো চলে যাবে। মাথায় কি যে যন্ত্রণা! মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কর্ণফুলীর তৃতীয় সেতু থেকে ঝাঁপ দেয়! শুধু সাহস হয় না আর পরিবারের কথাটাই মনে আসে। ও-ই একমাত্র ছেলে। এখন ওর ওপর সবার আশা ভরসা। নীলিমার সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ। এক একটা রাত কাটে দুঃস্বপ্ন নিয়ে। সকালে উঠে ঘামতে থাকে সে। নীরবে নিভৃতে কাঁদে। চার দেয়ালের মাঝে। বাবা মায়ের সাথে কথা হয় না অনেকদিন। এক টেবিলে আজকাল সে খেতেও বসে না। কারণ বাবা-মায়ের মুখোমুখি হওয়াটা ওর জন্য অস্বস্তিকর। জীবনের এতগুলো সার্টিফিকেটকে আজকাল কাগজের বোঝা বলেই মনে হয়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সব পুড়িয়ে ফেলতে। কিন্তু পারে না। একটা তো কিছু করতে হবেই। কয়েকদিন কাজ করেছে বিভিন্ন ইভেন্টের সাথে আর বিভিন্ন চেইনশপগুলোতে। আড়ং, আগোরা থেকে শুরু করে মীনা বাজার পর্যন্ত সব জায়গাতে কাজ করেছে। কিন্তু মানসিক টেনশনে থাকতে হতো। প্রায়শ ওর পরিচিত লোকজন তাকে দেখে অবাক হতো। ওর টিউশনের অভিভাবকদের সাথেও দেখা হয়েছে। তারা কোন কথা বলেনি, এটা ঠিক। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ও কুঁকড়ে গেছে। টিউশনিগুলোই এখনও সম্বল। এক একটা রাত কাটে নির্ঘুম, ভয়ে আর আতঙ্কে। পরিচিতদের কাছ থেকে আড়াল করে চলছে অনেকদিন। বন্ধু বান্ধব থেকে শুরু করে সবাইকে এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রায়শ পুরানো ভাইভাগুলোর রেজাল্ট দেয়। কিন্তু ওর রোল নাম্বার আর আসে না। কয়েকদিনের মধ্যেই শুনছে আরো কয়েকটা ফলাফল হবে। কিন্তু সেই সময়টাই শেষ হয় না। মাঝে মাঝে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ধূমপান করার একটা তীব্র ইচ্ছে হয়। আবার পরক্ষণেই ঘৃণায় কুঁচকে যায়। এটা ও কী ভাবছে? সেই স্কুলজীবন থেকেই ও মাদকবিরোধী আন্দোলনের সাথে জড়িত। আর এখন কিনা নিজেই মাদকের কবলে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে! তারপরই ফিরে আসে।
প্রায় ৫ মাসের মাথায় ব্যাংকের চাকরিটা হয়ে গেছে। ওর বন্ধু জানালো খবরটা। ওর রোল নাম্বার রেজাল্টশিটে জ্বলজ্বল করছে। সামনের মাসের ১ তারিখেই জয়েনিং। আনন্দে কি করবে বুঝতে পারছে না। বেতনটা খুব বেশি না হলেও এই বাজারে অনেক। সরকারি চাকরি বলে কথা! বেশ হিসেব করে চলা স্বপ্নীল আনন্দে আজ ইচ্ছেমতো বাজারও করে ফেলল। বাসার জন্য সন্দেশ নিলো এক কেজি। রিকসা করেই বাসায় ফিরলো। হঠাৎ অপরিচিত নাম্বার থেকে অতি পরিচিত মানুষের ফোন কল। নীলিমা! স্বপ্নীলের ঘোর লাগে চোখে। নীলিমা বাড়ি থেকে বের হয়ে একটা হোস্টেলে উঠেছে। একটা ছোট চাকরিও করে। আজ ভাইভার ফলাফলটা ও পেয়েছে। ফোন করেছে হোস্টেলের একটা বড় আপুর নাম্বার থেকে। স্বপ্নীল ছিঁচকাঁদুনে নয়। কাঁদে না, কিন্তু চোখ থেকে জল নামেই। প্রথমে ফোঁটা, তারপর ছোট ধারায় এরপর অঝোরে। ওপাশে কাঁদছে নীলিমা। স্বপ্নীলের মনে তখন অঞ্জন দত্তের ুবেলা বোস”। চারতলার বাসায় ওঠার সিঁড়িগুলো ভাঙছে স্বপ্নীল। শুধু কি বাসার সিঁড়িগুলো? এগুলো তার জীবনের সিঁড়ির ধাপও। হাঁফিয়ে উঠছে সে। অন্যদিন খুব তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যাওয়া ধাপগুলো আজ পেরোতে এত সময় লাগছে কেন? মনে হচ্ছে কত বছর পেরিয়ে যাচ্ছে!
রাতারাতিই পাল্টে গেছে জীবন। স্বপ্নীল এখন সরকারি কর্মকর্তা। সামনের মাসেই নীলিমার সাথে বিয়ে। সব মিটমাট হয়ে গেছে। এখন এত ভালো পাত্র নীলিমার বাবা আর হাতছাড়া করতে চান না। পাল্টে গেছে সব আত্মীয় স্বজনের সুরও। স্বপ্নীল এখনও সেই নীলিমায় বিভোর, আড্ডায় আবারো সবচেয়ে চঞ্চল ছেলেটা, পাড়ার সবচেয়ে আইডল ছেলে, জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মত মানুষ, সারা রাত গল্পের বইয়ে বুঁদ হয়ে থাকলেও বাবা মার আপত্তি থাকে না। বাবার চেহারাটাও পাল্টে গেছে। একটা স্বস্তি এসেছে পরিবারের সবার কাছে। কিন্তু মাঝের দুর্বিষহ সময়গুলো মাঝে মাঝে মনে হলে বুকের মাঝে একটা চিনচিন করে ব্যথা জাগে। এ কথাটা বলার পরই নীলিমা বলে- ‘থাক না’। নীলিমায় একাকার হয়ে যাওয়া স্বপ্নীলেরও তাই মনে হয়- ‘থাক না’।