পায়রাবন্ধু রাসেল

মিলন বনিক
1445091076_1

রাত ক’টা বাজে কে জানে? প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো শুভর। মনে হচ্ছে, খোলা আকাশ জুড়ে গোলা-বারুদের নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছে দুষ্টু লোকের দল। আকাশের বুকটা ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। সবাই আতঙ্কিত হয়ে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দিলো। কোথায় কী হচ্ছে, কেউ জানে না। ঢাকা শহরের বুক ছিড়ে যেন দৈত্য-দানোর মহোৎসব চলছে।
সকালে উঠেই শুভর মনে হলো আকাশটা অঝোর ধারায় কাঁদছে। রিমঝিম রিমঝিম একটানা বৃষ্টি। আকাশ বাতাস, গাছ-পালা, নদ-নদী, পশু-পাখি সবাই এভাবে কাঁদছে কেন? এমন সকাল কখনও আসেনি। এমন সময়গুলো খুবই কষ্টের। সবকিছুই আছে, অথচ কিছুই যেন নেই। সকালটা এমন হলো কেন? কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
সকালে ধানমন্ডি লেকে অনেক লোকজন হাঁটতে আসে। তারা হাসে, দৌঁড়ায়। ফেরিওয়ালারা আসে। আজ কেউ নেই কেন? কাক-পক্ষীও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এ কেমন বিদঘুটে পরিবেশ। এমন দিন কি কখনও হয়?
প্রতিদিন শুভর কিছু নিয়মিত কাজ থাকে। সকালে উঠেই পোষা পায়রাগুলোর খাঁচার মুখ খুলে দেয়। পায়রাগুলো মুক্তির আনন্দে কিছুক্ষণ আকাশে ওড়ে। কয়েকমুহূর্ত পর আবার ফিরে আসে। শুভর হাতে, মাথায় কাঁধে বসে বাক্‌ বাকুম, বাক্‌ বাকুম ডাকতে থাকে। পায়রাগুলো মাথায়, চুলে খামচি দেয়। শুভ নিজ হাতে ধান, গম, ভুট্টা খেতে দেয়। যতক্ষন না দেবে, ততক্ষন পায়রাগুলো শুভর সাথে লুকোচুরি খেলে। শুভর হাতে খাবার না পেলে পায়রাগুলো রাগ করে। অভিমান করে। কতরকম অঙ্গভঙ্গি করে তা প্রকাশ করে। এসব দেখে শুভ হাসে। ওদের ভাষা বুঝতে শুভর একটুও কষ্ট হয় না।
আজও শুভ ছাতা মাথায় দিয়ে খাঁচার দরজা খুলে দিল। দেখলো, পায়রাগুলো কোনো কথা বলছে না। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আছে। খাঁচা থেকে বের হচ্ছে না। কয়েকবার পাখা ঝাপটিয়ে আবার মাথা গুঁজে বসে আছে। সব পায়রাগুলো কাঁদছে। শুভ বুঝতে পারছে। আজ পায়রাগুলোর কী হলো? এমন আচরণ করছে কেনো?
শুভর বাবা কামাল হোসেন অত্যন্ত ভদ্র বিনয়ী মানুষ। শুভ বাবাকে বলে ছয়টা পায়রা আনিয়েছিল। এখন কুড়িটা পায়রা। বাসা বানিয়ে নিয়েছে সব ক’টার জন্য। ঠিক যেমনটি পায়রাবন্ধু শেখ রাসেলের বাড়িতে দেখেছে তেমনটি। রাসেলের কাছ থেকে পায়রা পোষার দীক্ষা নিয়েছে শুভ।
বন্ধুরা রাসেলকে পায়রাবন্ধু বলেই ডাকে। পায়রাগুলোর প্রতি রাসেলের ভালোবাসা, মমতা দেখে সবাই অবাক হতো। শুভকে পায়রাদের ভাষা বুঝতে শিখিয়েছে পায়রাবন্ধু রাসেল। রাসেলের হাতে খাবার না পেলে সব পায়রা মিলে প্রতিবাদ করতো, আমরা খাবো না। বলতো, আমাদের পায়রাবন্ধু কোথায়?
পায়রাবন্ধু রাসেল শুধু শুভর প্রিয় বন্ধুই নয়, পুরো স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষকদেরও প্রিয়। যেমন লেখাপড়ায় ভালো, তেমন খেলাধুলায়। বন্ধুদের নিয়ে দেশের কাজ কিংবা গরিব দুখিদের সাহায্য করার কাজে রাসেল সবার আগে। রাসেলের অগ্রণী ভূমিকা সব বন্ধুদের প্রেরণার উৎস। সবাই তার কথায় ঝাঁপিয়ে পরতো। এসমস্ত গুণের জন্য সবাই তাকে খুব ভালোবাসতো।
পায়রাবন্ধুর বাড়িটা ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে। পায়রাগুলোর কিছু হলেই পায়রাবন্ধুর বাড়িতে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে শুভর। এখন ইচ্ছে করলেও যেতে পারছে না। চারিদিকে গুমোট ভাব। কোনো জনমানব নেই। সব নীরব, নিস্তব্দ। পায়রা, পাখি, প্রকৃতি, নদ-নদী, এমনকি সব মানুষগুলোও ভয়ে চুপসে আছে।
ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িতে থাকেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বত্রিশ নম্বর বাড়িটাই ছিলো এ-দেশের বরেণ্য চিন্তাবিদ, রাজনীতিবিদ আর বুদ্ধিজীবীদের প্রাণকেন্দ্র। সারা বাংলাদেশের কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ হয় এ-বাড়ি থেকে। সাতকোটি মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা, আবেগ, উচ্ছ্বাস, অভাব অভিযোগ সবকিছুর মুলে ঐ বাড়ি। তাই, কী দিন, কী রাত? সারাক্ষন দেশের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষদের ভিড় লেগে থাকে ঐ বাড়িতে। ঐ বাড়ি থেকে মানুুষ আগামির দিক নির্দেশনা পেতো। কর্মপন্থা ঠিক করতো। দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রনায়কদের আনাগোনা ছিলো ঐ বাড়িতে।
শুভ অবাক হয়ে দেখতো, এমন একজন মহান রাষ্ট্রপিতার বাড়িতে কুলি, মজুর, কৃষক, শ্রমিক, তাঁতী, কামার, কুমোর সব শ্রেণির লোকেরা অবাধে যাতায়াত করছে। এমনকি ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও যেতো। এই বাড়িরই ছোট ছেলে পায়রাবন্ধু শেখ রাসেল। পায়রাবন্ধুর বাবা হলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই ইচ্ছে করলেও যখন তখন যেতে ইচ্ছে করতো না। রাসেল স্কুলে এলে প্রাণখুলে সব কথা বলা হতো।
বঙ্গবন্ধুর সাথেও পাখিদের সখ্যতা দেখে অবাক হতো রাসেলের সব বন্ধুরা। এটা কী করে করে সম্ভব? সারা দেশের মানুষ যেমন বঙ্গবন্ধুর কথা মন দিয়ে শোনে, মানে, তেমনি দেশের সব পাখিগুলোও যেন উনার কথা শোনে। খাবার নিয়ে গেলে উনি বলতো, আহা! অত চেঁচামেচি করিস নাতো। এবার চুপ কর্‌। অমনি সব পাখিগুলো চুপ করে যেতো। পায়রাগুলো সব চুপচাপ বসে থাকতো রাসেল ও বাবার কাঁধে, মাথায়। রাসেল জিজ্ঞাসা করতো,
বাবা, পাখিগুলো কিভাবে তোমার কথা বোঝে?
বাবা হেসে জবাব দিতেন,
‘ভালোবাসা’। ভালোবাসা থাকলে সবাই সবার কথা বোঝে। মানুষ, পশু-পাখি সবাই ভালোবাসার কাঙাল। ভালোবাসতে জানতে হবে। তবেই সবার কথা বুঝতে পারবি।
রাসেল বাবার হাত ধরে পায়রার খাবার নিয়ে যেতো। তখন কতরকমের পাখিরা এসে ভিড় করতো। চারিদিকে হৈচৈ পড়ে যেতো। ময়না, টিয়া, কাক, কাকাতুয়া, হলদে পাখি, আরো কতরকমের পাখি। সারা বাড়ি কিচিরমিচির শব্দে ভরিয়ে তুলতো। পাখিগুলো বাড়ির কার্নিশে, দেওয়ালে, বাড়ির পেছনে জাম, জারুল আর আর পেয়ারা গাছে বসতো।
ঘুম ভেঙ্গে ছোট্ট রাসেলের মুখ না দেখলে পাখিগুলোর দিনটা ভালো যেতোনা। তাই স্যাঁত সকালে ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে এসে হাজির হতো সব পাখিগুলো। এই পাখিগুলোও হয়ে উঠে রাসেলের প্রিয় বন্ধু। রাসেলের আব্বু সবসময় খাবার দিতে পারতো না। কীভাবে পারবে? সারাক্ষণতো দেশের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়।
সকালে পায়রাগুলোর কাছে গিয়েই শুভর পায়রাবন্ধুর কথা মনে হলো। সেদিনের কথাটা মনে পরলো, যেদিন রাসেল স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের দুঃখ করে বলেছিলো-
জানো, আমারও খুব ইচ্ছে করে তোমাদের মতো সারাক্ষণ আব্বুর সাথে থাকি। কিন্তু পারি না।
বন্ধুরা অবাক হয়। পায়রাবন্ধু বলে কী? আব্বুর সাথে থাকতে পারবে না কেনো? শুভ জিজ্ঞাসা করে-
কেন আব্বুর সাথে থাকতে পারো না? আমরা তো আব্বুর সাথে কত দুষ্টামি করি। পাঞ্জা খেলি, আড়ি খেলি। তোমার আব্বুতো দেশের পিতা। তাঁর অনেক কাজ। কত ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই হয়তো সময় হয় না।
খুব কষ্ট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রাসেল বলল,
আব্বুকে অনেকদিন পর পর দেখি। তাই খুব কষ্ট হয়। জীবনের বেশিরভাগ সময়তো জেলে আর দেশের কাজে কাটিয়েছেন। তাইতো আমার একমাত্র বন্ধু আমার হাসু’বু, রমা’ফু আর পায়রাগুলো।
শুভ একটু ভেবে বললো,
শুধু তাই নয়। এই যে আমাদের রাজপুত্র বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তাও আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির জন্য রাসেলের মহান আত্মত্যাগ।
আবির রাসেলের কষ্টটা বুঝতে পেরে বললো-
সত্যিই তো। তিঁনি আমাদের দেশের জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছেন। তাঁর মতো মহান মানুষ হয় না। এজন্যইতো তিঁনি আমাদের দেশের রাজা। আর আমাদের পায়রাবন্ধু সেই মহান রাজার রাজপুত্র।
বন্ধুদের সবাই সমস্বরে বললো,
ধন্য আমাদের রাজপুত্র। জয় হোক মহারাজার।
হঠাৎ মেঘের প্রচণ্ড গর্জন শোনা গেলো। ভয়ে চমকে ওঠলো শুভ। সেই সাথে মুষলধারে বৃষ্টি। শুভ দৌঁড়ে ঘরে ঢুকল। কামাল হোসেন তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে তোয়ালে দিয়ে মা মাথা মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন,
আর বাইরে যেও না শুভ।
কেন, আব্বু?
আমাদের খুব বিপদ।
কিন্তু, পায়রা গুলো কিছু খায়নি।
ওরা খাবে না।
জানো, আজ একটা পায়রাও বাসা থেকে বের হচ্ছে না। একটা পাখিও আসলো না। সব পায়রাগুলো গোমরা মুখো হয়ে বসে আছে। এমন হচ্ছে কেন আব্বু?
কামাল হোসেন শুভকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখ মুছে বললেন,
তোর পায়রাবন্ধু আর আসবে না, পায়রাগুলোও আর হাসবে না।
শুভ যখন বুঝতে পারলো, মনে হলো পৃথিবীটা ঘুরছে। খেয়াল হলো, পায়রার খোপগুলো বন্ধ করা হয়নি। গিয়ে দেখলো, একটা পায়রাও নেই। পায়রাবন্ধুর সাথে সব পায়রাগুলোও হারিয়ে গেলো। আর কখনও ফিরে আসেনি।