বিশ্বের সর্বোচ্চ মোটরেবল রোডে দেশের পতাকা

কামরুন সানজিদা
Untitled-1

পৃথিবীর সর্বোচ্চ মোটরেবল রোডে খারদুংলা পাস। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার ফুট উপরের এ পাস, সাইক্লিস্টদের কাছে এক আরাধ্য স্থান। ভারতের জম্মু কাশ্মীরের প্রদেশে এ রোডে সাইকেল চালিয়ে ওঠা যেনতেন ব্যাপার নয়। এক হাজার ১১৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এই পাসে দেশের পতাকা উড়িয়েছেন সাকিব মাহমুদ।
ভারতের সিমলা থেকে জম্মু কাশ্মীরের খারদুংলা রোডে সাইক্লিং সবচেয়ে বিপদজনক ও দুর্গম। সাথে তীব্র ঠান্ডা ও বৃষ্টিপাত। প্রায় সারা বছরই বন্ধ থাকে খারদুংলার পথ। কেবল মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাস খুলে দেয়া হয় পর্যটকদের জন্য।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এই ছাত্র গত বছরই বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে ভারতের কলকাতা পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে নাম কুড়িয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী ভারতীয়দের প্রতি, বিজয় দিবসে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য এই রাইড দিয়েছিলেন তিনি।
আগে থেকে পরিকল্পনা ছিলো, এবার বিশ্বের সর্বোচ্চ গাড়ি চলাচলের স্থান ‘খারদুংলা পাস’ এ সাইকেল নিয়ে উঠবেন। তাই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে ১২ জুন যখন তার ভিসা হাতে পেলেন, তড়িঘড়ি করে খরচ জোগাড়ের চেষ্টায় নেমে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পন্সরশিপ নিয়ে যেতে চাইলেও তখন রমজানের ছুটির কারণে প্রশাসনিকভাবে আর তা হয়ে ওঠেনি। পরে ভিজ্যুয়াল নিটওয়্যারস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান ২০০ ডলার আর্থিক সাহায্য করে। কিন্তু পুরো রাইডে খরচ হবে বাংলাদেশী টাকায় ৫০ হাজারেরও। শেষমুহুর্তে কোনোমতে ধার দেনা করে সাত দিনের মধ্যে তৈরি হয়ে রওনা দেন ভারতের উদ্দেশ্যে।
১৯ জুন চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিয়ে কলকাতা থেকে দিল্লী পৌছান। ২২ জুন সিমলা থেকে শুরু করেন মূল রাইড। সঙ্গে ছিলেন ভারতীয় সাইক্লিস্ট চন্দন বিশ্বাস। এই সাইক্লিস্ট ট্রান্স হিমালয়ান রোডে রাইড দিয়ে খারদুংলা যাওয়ার কথা ছিলো। এই পথ ছিলো আরো দুর্গম ও ভয়ঙ্কর সুন্দর। রাস্তার উপর থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে যাত্রা করতে হয়।
কিন্তু বিধি বাম। সিমলা থেকে হিমাচল প্রদেশের কিন্নর জেলা থেকে যখন কাজাংকিবের যাবেন, তখনই আটকে দেয়া হয় সাকিবকে। এই পথে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের পূর্ব অনুমতি ছাড়া প্রবেশের সুযোগ নেই। অগত্যা ফিরে আসতে হয় সিমলা। কিন্তু হতাশ হলেও হাল ছাড়েননি তিনি। তিনশ কিলোমিটার পথ ফিরে এসে আবারো সিমলা থেকে রওনা দেন তিনি।
প্রথম পাস ছিলো সিমলা থেকে মানালির মাঝামাঝি জলরি পাস। টানা ২৬ কিলোমিটার ক্রমশ উপরে সাইকেল চালিয়ে পৌছান ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায়। এরপর মানালি থেকে আরো ৫২ কিলোমিটার উপরে রোটাং পাস। এটিও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩ হাজার ৫৮ ফুট উপরে। রোটাং থেকে ১০০ কিলোমিটার পরেই ছিলো বারালাচালা পাস। হিমাচল প্রদেশে অবস্থিত এই পাসের উচ্চতা সাড়ে ১৩ হাজার ফুট।
হিমাচলের পর জম্মু কাশ্মীরের পাস যেখানে শুরু, সেখান থেকেই ছিলো কষ্টকর অভিজ্ঞতা। সেদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শুরু করেন ২১টি পাস এর রাস্তা গাটার লুপ। ক্রমশ উপরে উঠতে থাকা ২১টি পাস যখন শেষ করে নাকিলাটপে পৌছান, ঘড়িতে তখন ১১টা বাজে। পথে থামার মত কোনো জায়গা ছিলো না। পানিও শেষ। ডিহাইড্রেশন আর অক্সিজেনের অভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। একই পথে ভারতীয় একটি টিম যাওয়ার সময় রাস্তার উপর পড়ে থাকা সাকিবকে দেখতে পান। তারা তার সাইকেলটি সহ নিচে হইস্কিনালা নামক একটি স্থানে পৌছে দেন। তবে সেসময় জ্ঞান থাকলেও অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। হইস্কিনালা’য় পৌছানোর এক ঘন্টা পর স্বাভাবিক হয়ে আসেন তিনি। তবে সেখানে থাকার ব্যবস্থা না থাকায় খেয়ে দেয়ে আবার রওনা হন।
বিকাল ৪টায় পৌছান লাচোংলা। এখান থেকে পাং এর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ১৬ হাজার ২৮ ফুট উপরে এ স্থানে তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থা আছে। তবে শান্তিতে ঘুমানোর ব্যবস্থা থাকলেও এদিন আর ঘুমাতে পারেননি সাকিব। প্রচন্ড মাথাব্যথা আর বেখেয়াল বশত কেটে যাওয়া হাতের ব্যথায় সারারাত অসুস্থ ছিলেন তিনি।
ভোরে পাং থেকে রওনা দিয়ে সাড়ে ৫ ঘন্টা সাইক্লিং করে পৌছান ডেপরিং। সাইক্লিস্টরা সাধারণত এই জায়গায়তেই রাতে থেকে যান। কিন্তু বছরের এ সময়টায় হিমাচলে রাত হয় ৭টা বা ৮টায়। তাই দিনের আলোকে কাজে লাগাতে আরো ৪ ঘন্টা সাইক্লিং করে পৌছান টাগলাংলা। ১৭ হাজার ৫৮২ ফুট উচ্চতার এ স্থান বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাস।
তখনো ঘড়িতে মাত্র ৩টা বাজে। এখান থেকে ৩৫ কিলোমিটার নিচে রুমসে নামক স্থানে একজন স্থানীয় ভারতীয়ের বাসায় রাত কাটান সাকিব। তবে এইদিন সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।
রুমসে থেকে জম্মু কাশ্মীর প্রদেশের লেহ লাদাখের দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার। অন্যান্য অভিযাত্রীরা রুমসে থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের কারুতে রাতে থেকে যান। কিন্তু লেহ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দূরত্ব একদিনেই অতিক্রম করা উচিত সংকল্প করেন সাকিব। পরদিন রুমসে থেকে সকাল ৭টায় রওনা দিয়ে ৫টার মধ্যে পৌছে যান। কিন্তু সেদিনই খারদুংলার পথে রওনা দেয়া সম্ভব নয়। খারদুংলা যেতে লেহ এর বাইরের মানুষদের অনুমতি প্রয়োজন হয়। পরদিন ট্রাভেল এজেন্সীর মাধ্যমে সকাল ১০টায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ে ছয়শ রুপি দিয়ে আবেদন করেন সাকিব মাহমুদ। ১১টায় অনুমতি পেয়ে যান। তবে অনুমতি পেলেও দিনের এই সময়ে কড়া রোদে না বেরিয়ে পরদিন রওনা হবেন বলে ঠিক করেন তিনি। তাই সেদিনও লেহ তে থেকে যান সাকিব।
পরদিন ভোর ৬টা নাগাদ রওনা দেন সাত দিন সফরের জন্য। লেহ থেকে বেরোনোর ১৪ কিলোমিটার পর চেকপোস্টে পুলিশের কাছে অনুমতিপত্র দেখাতে হয় তাকে। প্রথম ২০ কিলোমিটারই পাকা রাস্তা পান তিনি। পরের ২০ কিলোমিটারে তখন রাস্তার কাজ চলছিলো। পুরো রাস্তায় মাটি আর পাথর। তাই সাইকেল চালিয়ে উপরে উঠতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় তাকে।
সাড়ে ৪ ঘন্টা সাইক্লিং করে পৌছে যান সেই তীর্থ স্থান খারদুংলায়। ১৮ জুলাই বিশ্বের সর্বোচ্চ এই মোটরেবল পাসে উঠে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বেশকিছু ছবি তোলেন। সেদিন তার পরনেও ছিলো লাল-সবুজ টি-শার্ট। তবে সেখানে না থেকে সাকিব ঠিক করেন, পাকিস্তান সীমান্ত যখন আর মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরত্ব, তাহলে সেখান পর্যন্ত সাইক্লিং করে যাবেন। পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকা টুকটুক এর উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। সেখান থেকে ১০ কিলোমিটার নিচে নামার পর বুঝতে পারেন, আর্থিক সামর্থ্যে আর কুলাবে না। স্থানীয়রা জানান, এই এলাকায় একশ-দুইশ’র মধ্যে কোনো হোটেলে রুম পাওয়া যাবে না। হাতে হাজার রুপি নিয়ে এগোতে হবে। তাই আর্থিক সমস্যার কারণে সেখানেই যাত্রা শেষ করতে হয় সাকিব মাহমুদকে। দীর্ঘ ১৮ দিন পর শেষ হয় তার খারদুংলা পাস সাইক্লিং। লেহ তে ফিরে তিন দিন বাস যাত্রার পর দিল্লীতে পৌছান তিনি।
এর আগে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে নিয়াজ মোরশেদ খারদুংলা পাস যান। খারদুংলা যেতে তিনি পাড়ি দেন ৫১৫ কিলোমিটার পথ। কিন্তু বিভিন্ন পথ ঘুড়ে সাকিব এই পাস পৌছান ১,১১৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে। অর্থাৎ, প্রায় দ্বিগুণ পথ অতিক্রম করেন তিনি। পরে আবার সেখান থেকে এগোনোর পর লেহ’তে ফিরে আসা পর্যন্ত সর্বমোট ১,১৫৭ কিলোমিটার সাইক্লিং করেছেন তিনি।
স্বপ্নের এই পাস এ পৌছানো অতটা সহজ ছিলো না সাকিবের জন্য। মাঝে বৃষ্টির জন্য সপ্তাহখানেক থেমে থাকতে হয়েছিলো। শরীর খারাপ থাকায় মানালি ছিলেন ৫দিন। পুরোনো সাইকেলটাও প্রায় সময় শ্লথ করেছে সাকিবের যাত্রা।
সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে জিংজিং বারে। রোটাং থেকে বারালাচালার মাঝামাঝি এই জিংজিং বার। ১৩তম দিনে এই স্থানে পৌছেছিলেন তিনি। এই অভিজ্ঞতার অংশটুকু সাকিবের নিজের মুখেই শোনা যাক-
‘আমি জানতাম, জিংজিং বারে থাকার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এর জিরো কিলোমিটারে পৌছে দেখি, বহুদূর পর্যন্ত কিছু নেই। ঘড়িতে তখন সাড়ে ৫টা বাজে। সেদিন আবহাওয়াও খুব খারাপ ছিলো। বৃষ্টি পড়ছিলো। সাথে আবার বরফগলা পানি। এসবে আমিও ভিজছি। শরীরের তাপমাত্রা কমতে থাকে। সেখানে কিছু না পেয়ে আশাহত হয়ে পড়ি। তার মধ্যে ঝর্ণা থেকে রাস্তায় বরফগলা পানি পড়ে দুই তিন ঘন্টা রাস্তা বন্ধ ছিলো। ভারতের বর্ডার রোড অর্গানাইজেশন তাদের স্কেভেটরে করে আমার সাইকেলসহ আমাকে সেখানটা পাড় করে দেয়। সেখান থেকে আরো ৬ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে অবশেষে থাকার জায়গা খুঁজে পায়। সেদিন খুবই কষ্ট হয়েছিলো।’
পথে থাকা-খাওয়ারও যে ভালো বন্দবস্ত ছিলো, তা নয়। সিমলা থেকে মানালি পর্যন্ত চন্দন বিশ্বাসের তাঁবুতেই রাত কাটান সাকিব। তার থেকে পৃথক হওয়ার পর হোটেলেই ছিলেন তিনি। কিন্তু মানালি থেকে লেহ লাদাখ পর্যন্ত কোনো হোটেল ছিলো না। রাস্তার পাশে খাবারের দোকানে (ভারতে ধাবা বলা হয়) রাত কাটিয়েছেন। যেখানে খাওয়া, সেখানেই শোয়া।
তবে ফেরার পথে আবারো বিপদে পড়েন সাকিব। দিল্লী থেকে যখন কলকাতা পৌছান, তখন হাতে মাত্র দুইশ টাকা। দেশে ফেরার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ তখন হাতে নেই। দেশে ফোন করে কাছের কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা ধার চান। এই সময়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু জ্যৈষ্ঠ শিক্ষার্থী তাকে সাহায্য করেন। সেখান থেকে ফিরে আসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী এই শিক্ষার্থী।