নদীভাঙন নীরব ঘাতক

আবিদ হাসান

বাংলাদেশ অজস্র নদ-নদীর দেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বর্ষ গ্রন্থে ৩১০টি নদীর উল্লেখ আছে। এ দেশে নদীভাঙন একটা নৈমিত্তিক ব্যাপার। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ভাঙনের মাত্রা বেড়ে যায়। এবারও তাই হয়েছে। নদী তার তীরের ঘরবাড়ি ভেঙেচুরে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। অনেকেই হারিয়েছেন বা হারাচ্ছেন পৈত্রিক ভিটা। যাদের গেছে, তারাই বোঝেন। নদীভাঙন নীরব ঘাতক।
আমাদের দেশের নদীগুলো প্রায় আঁকাবাঁকা। এদের একটি হচ্ছে- সাঙ্গু নদী। নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। সে জন্য ভাঙনের প্রবণতাও বেশি।
মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার মদক এলাকার পাহাড়ে এ নদীর জন্ম। বান্দরবান জেলা ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এ অঞ্চলের জীবন-জীবিকার সাথে সাঙ্গু নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এই নদী দিয়ে যে জলধারা বয়ে যায়, যাওয়ার পথে সে শুধু মাঠ ফসলে ভরিয়ে দিয়ে যায় না, অনেক সময় আশপাশের মাঠ ভেঙেচুরেও দেয়। যে জমিটুকু ভাঙে, তার কিছু অংশ নদীর অন্য পাড়ে জড়ো করে, তৈরি করে চর। নদী তার তীরে কামড় বসিয়ে মাটি খুবলে নেবে, এটা নদীর স্বাভাবিক আচরণ। তবে ভুক্তভোগীর জন্য তা পরম বেদনার। কত লোক যে প্রতিবছর নদীতে বসতভিটা ও চাষের জমি হারাচ্ছেন, তার হিসেব আমরা কতটুকু রাখি?
নদীর সাতকানিয়া অংশের বিভিন্ন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। নদীতীরের সড়ক ভেঙে যাওয়ায় যাতায়াতে ভোগান্তিতে পড়েছেন মানুষজন। ওই এলাকা সরেজমিন দেখার আমার কিছু অভিজ্ঞতা আছে। নদীপারের গ্রামগুলো একটানা সফর করি, কথা বলি গ্রামের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে। বেশকিছু পরিবারকে পেয়েছিলাম, যাদের ঘরবাড়ি চলতি বর্ষায় নদীতে তলিয়ে যাবে। সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নের নবীর পাড়া, মকতিয়ার কুম, রুস্তম পাড়া এলাকায় নদীভাঙনে অসংখ্য ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে অনেকেই তাদের আসবাবপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। প্রতি বর্ষামৌসুমে ভাঙন হলেও এবারের মাত্রাটা বেশি। এছাড়া চরতি, আমিলাইশ ইউনিয়নের নদীতীরের ঘরগুলো ভাঙনের মুখে পড়ে একের পর এক তলিয়ে যাচ্ছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেমের (সিজিইআইএস) একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৯৭৩ থেকে ২০১৩ সাল, অর্থাৎ এই চার দশকে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৩৮ হেক্টর জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। এটা শুধু গঙ্গা, পদ্মা ও যমুনা নদীর ভাঙনের হিসাব। অন্যান্য নদীর ভাঙনের হিসাব যোগ করলে তা হবে আরও ভয়াবহ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নদীভাঙন কি ঠেকানো সম্ভব? নদীর ভাঙন ঠেকাতে কংক্রিটের বা পাথরের তৈরি ব্লক বাঁধের ধারে বা নদীর পানিতে ফেলার চল আছে আমাদের দেশে। তবে এই কাজটি সঠিকভাবে হয় না বলে বিস্তর অভিযোগ আছে। ব্লক যদি বানানো হয় ১০টা, ফেলা হয় পাঁচটা, বিল করা হয় ১০০টির। অভিযোগটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের দিকে। তদবির করে প্রকল্প পাওয়ার বিষয়টি যেন ওপেন সিক্রিট। তাই স্বাভাবিকভাবেই ব্লক তৈরি ও ফেলার ঠিকাদারি বেশ লাভজনক হয়ে উঠেছে অনেকের কাছে। প্রতিবছর এভাবেই পানিতে ঢালা হচ্ছে শত শত কোটি টাকা। সরকার যায়-আসে, কিন্তু এই অনিয়ম দূর হয় না বলেই নদীভাঙা মানুষের দুর্ভোগ কমছে না।
নদীর ভাঙন বন্ধ করা যাবে না। তবে চেষ্টা করলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। এজন্য নতুন কৌশল বের করতে হবে। সেই সঙ্গে দরকার প্রকল্পের কাজে শক্ত তদারকি। আর বাপ-দাদার ভিটা হারানো পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে রাষ্ট্রকে।
মানবেতর জীবনযাপন করছে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য মানুষ। ভাঙনকবলিত এলাকায় সরকারি অনুদানও তেমন পৌঁছে না।
এসব মানুষের দিকে সহযোগিতার হাত না বাড়ালে তাদের প্রকৃতির খেয়ালের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। তাই সরকারের উচিত, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
লেখক : শিক্ষার্থী, চবি