উপহার

রিয়াজ মোরশেদ সায়েম »

ফারাবী হেঁটে চলছে। পেছনে ফিরছে না। তীব্র অপমান সে গায়ে মেখে হেঁটে চলছে। পরাজিত কোন সৈনিকের মতো। অনেক কিছুই তার কল্পনায় চলে আসছে চোখের সামনে। কিন্তু কিছুই সে দাঁড় করাতে পারছে না। মাথায় শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে কেন সে এতোটা অপমানিত হলো আজ। কি তার অপরাধ? প্রথম দেখায় যাকে কোনকিছু না ভেবে ভালোবেসেছিলো সে আজ তার চরম শত্রু! তিনটি বছরের প্রেমের সম্পর্ককে সে ছুঁড়ে দিয়েছে সবার সামনে।

অথচ আজ তার জন্মদিন! আজ এতোটা না হলেও পারতো।

বিশ জানুয়ারি। ফারাবী ঘুম থেকে উঠলো বরাবরের মতোই। মোবাইলের স্ক্রিনে অনেকগুলো মেসেজ আর কল! স্ক্রিনে তাকাতেই চোখ কপালে উঠে গেল ফারাবীর। আজ তার শেষ! রক্ষা নেই কোনমতেই! কল ব্যাক করলো ফারাবী।

সরি, সিলভিয়া। আসলে রাতে কথা বেশি হয়ে গিয়েছিলো তো, তাই ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছে। মোবাইলের সাউ- মিউট করা ছিলো। সরি!

আমার সাথে কথা বললে তো তোমার কথা বেশি হয়ে যায়! যাক, আজকে মাফ করে দিলাম তোমার জন্মদিন বলে! তাড়াতাড়ি চলে এসো। আমি বের হচ্ছি।

আচ্ছা, এক্ষুণি বের হচ্ছি মণি। অনেক ভালোবাসি পাগলি!

মেয়েটা আজ ভালো হয়ে গেছে। জন্মদিন আমাকে বাঁচিয়ে দিলি! এসব ভাবতে ভাবতে ওয়াশরুমে ঢুকলো ফারাবী। আজ তিন-তিনটি বছর এ মেয়েটির সাথে কাটিয়ে দিয়েছে ফারাবী। অনেকটা গোপনীয় সংসারের মতো। সে প্রথম দেখা, প্রেম। সবকিছুতে সাপোর্ট দিয়ে এসেছিল তার। স্মৃতিগুলো গুছিয়ে ও মনে করতে পারছে না ফারাবী। আনন্দের দিনও বলা যায়। সিলভিয়া বলেছে আজ তার জন্য স্পেশাল একটা গিফট আছে! মেয়েটা এরকমই। প্রতিবারই স্পেশাল বলে ভিন্ন কিছু দিয়ে বসে। গতবারে এক ডজন রঙিন কলম আর নীল একটা ডায়েরি। এর আগে পাঁচটি বই! এবার নিশ্চয়ই পাওয়ার ব্যাংক হবে। সিলভিয়া বলেছিল ফারাবীর একটা পাওয়ার ব্যাংক দরকার। হয়তো সেটাই। যাই হোক, রেডি হয়ে রওনা দিলো সে। ফারাবীর অনেক বন্ধুই আছে। সিলভিয়ারও। সবাইকে এক করেছে সিলভিয়া। সবার সাথে সিলিভিয়ার যোগাযোগ হয়। আজকের জন্মদিনটা সে তার মতো করে পালন করবে এটা একবছর আগে থেকে বলা। ফারাবী মনে মনে স্থির করলো, সিলভিয়ার কাছ থেকে জমানো টাকাগুলো চাইবে আজ, তার একটি বাইক দরকার। যেটা দিয়ে পুরো শহর ঘুরে বেড়াবে দু’জনে। সিলভিয়া প্রথমদিকে লুকিয়ে ডিপিএস করে প্রতিমাসে টাকা জমাতো। কিন্তু একদিন ফারাবী জেনে যায়। তখন হেসেই সিলভিয়া বলেছিল— কাজে লাগবে তাই জমাচ্ছি। আজ ফারাবী সেগুলো চাইবে। পরে না হয় শোধ করে দেবে আস্তে আস্তে। হুট করেই সিলভিয়া বলে বসলো ফারাবীর সাথে সম্পর্ক আর রাখতে পারছে না। সিলভিয়ার পরিবারের সিদ্ধান্তে সে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে।

এটাই তার জন্মদিনের উপহার! সবাই চমকে গেলো। যেন মনে হলো সবাই যেটা পরিকল্পনা করছে তার ব্যতিক্রম ঘটলো। সোজা পথ ধরে হেঁটে চলে যেতে বললো ফারাবীকে। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে তার! দ্বিতীয়বার আর সাহস হলো না সিলভিয়ার দিকে তাকানোর। বন্ধুদেরকেও অদৃশ্য দেখাচ্ছে তার! সোজা হাঁটতে লাগলো। একবার প্রশ্নও করেনি সে কেন এমন করা হলো তার সাথে? অনুরোধও করলো না! কারণ এর আগে এমনটা হয়নি। তাদের সম্পর্কে বিচ্ছেদের কখনোই আসেনি। ফুটপাতে উঠতে যাবে রাস্তা থেকে ঠিক সে মুহূর্তে গাড়ির একটা ক্র্যাচ করে শব্দ হলো। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো ফারাবীর মাথা! ছিটকে পড়লো সিলভিয়ার সামনে। সিলভিয়ার চিৎকারে ভারী হয়ে উঠলো আকাশ! কিছুই বলতে পারছে না সে। কিংকর্তব্যবিমূঢ়! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিলো। প্রথমে চিৎকার করলেও এখন একদম চুপ! তার হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে আসলো বাইকের চাবি! যেটি সাজানো আছে একটু সামনেই। ফারাবী ফুটপাতে উঠলেই যেটা দেখতে পেত। তার জন্মদিনের উপহার!