বাঁশখালীতে ডিজিটাল চোরের উপদ্রব

৩ মাসে দিনে-রাতে দুই শতাধিক চুরি

নিজস্ব প্রতিনিধি, বাঁশখালী

বাঁশখালী উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার মো. আরিফুল ইসলাম মৃদুল সকালে নিজ অফিসে এসে দেখলেন, বড়-বড় তালা কেটে চোরের দল অফিসের ল্যাপটপ নিয়ে গেছে। একই ভাবে শেখেরখীল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. ইয়াসিনও দেখলেন, ইউনিয়ন পরিষদের দরজার তালা কেটে বিভিন্ন মালামাল কারা যেন নিয়ে গেছে। চাম্বল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মুজিবুল হক ও বাঁশখালী পৌরসভার প্যানেল মেয়র মো. হারুনেরও মোটরসাইকেল গায়েব হয়ে গেছে। এছাড়াও উপজেলা পরিষদ ফটকের সম্মুখের গ্রিন চিলি হোটেল, জনতা ফার্মেসি, কালীপুর নাসেরা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা অরু বেগমের ঘরের ঘুলঘুলি ভেঙে চুরি হয়েছে।
এভাবে গত ৩ মাস ধরে পৃথক-পৃথক সময়ে বাঁশখালী উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের দোকান, ঘরবাড়ি, সরকারি-বেসরকারি অফিসে চোরের দল তালা কেটে মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশার তালা ভেঙে দুই শতাধিক চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, চোরের দল এমনভাবে তালা কেটে নিচ্ছে যা ডাকাতির চেয়েও ভয়াবহ। এসব ঘটনায় লাখ লাখ টাকা চুরি হলেও ভুক্তভোগীরা আইনি জটিলতার কারণে মামলা করতে পারেননি। অনেকে সর্বস্ব হারিয়ে ওল্টো মামলার ভোগান্তিতে যেতে আগ্রহী নয়। ফলে চোরের দল বেপরোয়া হয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে চুরি করে যাচ্ছে। চোরের দল এতই বেপরোয়া যে, উপজেলা সদরের কোথাও দিন-দুপুরে মোটরসাইকেল রেখে চায়ের দোকানে ঢুকলেই মোটর সাইকেল নিয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চুরি হচ্ছে বাঁশখালী থানার আশপাশে ৫০ থেকে ১০০ গজের মধ্যে। চুরি করতে গিয়ে চোরের দল বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করছে এবং তালা কাটতে বা ভাঙতে শক্তিশালী যন্ত্রাংশ ব্যবহার করছে। এছাড়া বিভিন্নস্থানে সংযুক্ত সিসি ক্যামরাগুলোও এসব চোরদের চুরির ঘটনা ধরা পড়ছে না। এসব ডিজিটাল চোরের ভয়ে বিভিন্ন বাজারের পাহারদাররা চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে বলেও জানা গেছে।
১১ সেপ্টেম্বর বাঁশখালী উপজেলা আইনশৃংখলা কমিটির সভায় শেখেরখীল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. ইয়াসিন বলেন, অন্য চুরিগুলো হচ্ছে তা মেনে নিলাম কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদে চুরি তো লজ্জার ব্যাপার। ওই আইন শৃংখলা কমিটির সভায় অপরাধ দমনে আরো বক্তব্য রাখেন বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর, সাধনপুর ইউপি চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন চৌধুরী খোকা, কালীপুর ইউপি চেয়ারম্যান এডভোকেট আ ন ম শাহাদাত আলম, বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. বদরুদ্দিন চৌধুরী, পূজা কমিটির সভাপতি প্রদীপ গুহসহ আরো কয়েকজন। তারা সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করলেও চুরি বন্ধে এবং চোরদের দমনে কোনো স্থায়ী সিদ্ধান্ত হয়নি।
তবে ওই সভায় বাঁশখালী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে উপস্থিত থাকা উপপরিদর্শক কামরুল ইসলাম কায়কোবাদ বলেন, চুরি হচ্ছে এটা ঠিক। এই চুরি দমনে চৌকিদার-দফাদারদের পাহারা এবং দায়িত্ব পালনের বণ্টনন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্ধারণ করতে হবে। বিভিন্ন হাট-বাজারে বাজার কমিটির পক্ষ থেকে পাহারাদার নিয়োগ করতে হবে। বিভিন্ন বাজারে দোকানদারদের কোটি-কোটি টাকার সম্পদ আছে অথচ পাহারাদার নেই। এলাকার মাদকাসক্ত, জুয়াড়ি ও বখাটেদের চিহ্নিত করে অভিভাবকদের সর্তক করা উচিত এবং যত্রতত্র চলাচল বন্ধ করতে হবে। গ্রামবাসী, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন প্রত্যেকের সহযোগিতা পুলিশের অবশ্যই প্রয়োজন। পুলিশ চুরি-ডাকাতি বন্ধে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাঁশখালী উপজেলা সদর বাজার কমিটির একাংশের নেতা ছমিদুল হক বলেন, তাঁর উপজেলা পরিষদ ফটকের সম্মুখের ফার্মেসির ৪ লাখ টাকার ওষুধ চুরি করে নিয়ে গেছে চোরের দল। অপর অংশের নেতা ও বাঁশখালী পৌরসভা যুবলীগ যুগ্ম আহ্বায়ক উত্তম কুমার কারণ বলেন, বাজারের পাহারাদার চোরের ভয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। আমরা ব্যবসায়ীরা বৈঠক করে এবং আমাদের নজরদারি বাড়িয়ে আবার পাহারাদারকে চাকরিতে বহাল রেখেছি। চোরের দল ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে চুরি করছে। সবাই আতংকে আছে।
উপজেলা সদরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, রাত হলেই থানার আশে-পাশে কতিপয় মাদকাসক্ত বখাটে যুবকের চলাফেরা বেড়ে যায়। তাদের কাগজে-কলমে লেখাপড়া না থাকলেও রাতে মাদকাসক্ত হয়ে কখনও সাংবাদিক পরিচয় দিয়েও গভীর রাত পর্যন্ত নানা অপকর্ম করে বেড়ায়। পুলিশকে বোকা বানাতে এসব বখাটে কম্পিউটার প্রিন্ট করা নানারকম অখ্যাত নিবন্ধনবিহীন অপ্রকাশিত পত্রিকা হাতে রাখে। প্রয়োজনে উপস্থাপন করে। ওইসব বখাটেরা চোরের দলের সাথে মোবাইলে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে পুলিশের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে চুরির ঘটনা ঘটায়।
বাঁশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আলমগীর হোসেন বলেন, চোরদের উপদ্রব বন্ধে পুলিশ দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। স্থানীয় চোরদের এবং বখাটেদের চিহ্নিত করতে পারেন জনপ্রতিনিধিরা। তারা সার্বিক সহযোগিতা করলে পুলিশ খুব সহজেই চুরির ঘটনা দমন করতে পারবে।