অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে ‘ঋণ’, বিপিসির ভাষ্য ‘ভর্তুকি’

২৮ হাজার কোটি টাকা নিয়ে টানাপোড়েন!

মোহাম্মদ রফিক

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা পাওনা দাবি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। পাওনা আদায় করতে গত সপ্তাহে বিপিসিকে তাগাদাও দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই সংস’ার মধ্যে কয়েকমাস ধরে টানাপোড়েন চলছে বলে জানিয়েছেন বিপিসির এক কর্মকর্তা।
তবে বিপিসি’র একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য- ঋণ নয়, ভর্তুকি হিসেবে এ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। এখন সেই টাকা ঋণ হিসেবে দাবি করছে তারা।
বিপিসির পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যানিং) মোজাম্মেল হক বলছেন ভিন্ন কথা। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি সুপ্রভাতকে জানান, ২০১০ ও ২০১১ সালে বিপিসিকে ভর্তুকি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। বাস্তবে চুক্তিপত্রে সেটি ছিল ঋণ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, আমদানি মূল্যের চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রি করে গত তিন বছর ধরে লাভের মুখ দেখছে বিপিসি। গত তিন অর্থবছরে এ খাতে ২১ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে এই সংস’া। কিন’ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে তারা জমা দিয়েছে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
এ কর্মকর্তা জানান, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে অভ্যন্তরীণ বাজারে তেল বিক্রি করে বিপিসি মুনাফা করেছে ৭ হাজার ৩৩৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ৯ হাজার ৪০ কোটি ৭ লাখ। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। কিন’ তেল বিক্রি করে বিপিসি বিপুল পরিমাণ মুনাফা করলেও ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টাকা জমা দেয়নি। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে ১ হাজার কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে জমা দিয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
গতকাল রাতে কথা হলে নাম প্রকাশ না করে বিপিসি’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুপ্রভাতকে জানান, গত তিন অর্থ বছরে বিপিসি লাভের মুখ দেখলেও এখন ধীরে ধীরে লোকসানের দিকে যাচ্ছে। তার দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন ডলারের দাম বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে এক ডলারের বিপরীতে ৭৯ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৩ টাকা। এ পরিসি’তি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থ বছরে বিপিসির লোকসান হবে ৬০০ কোটি টাকা। এছাড়া বর্তমানে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েল বিক্রিতে ৯ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলেও ভর্তুকি দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে বিপিসি। ২০১১ সাল পর্যন্ত জ্বালানি খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন’ ভর্তুকির সেই টাকাকে এখন ঋণ দাবি করে সুদে-আসলে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা ফেরত চাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
সূত্রটি জানায়, প্রতি লিটার অকটেনে ২৫ টাকা, পেট্রোলে ২০ টাকা, ডিজেল ও কেরোসিনে প্রতি লিটারে ১৭ টাকা মুনাফা করছে বিপিসি। তবে বিপিসির দাবি, লাভের মুখ দেখার পর প্রথমেই দেনা শোধ করেছে সংস’াটি। বাড়তি টাকা দিয়ে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ শুরু করেছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল দিবাগত রাত ১২টা থেকে তেলের দাম কমানোর সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। নতুন দর অনুযায়ী অকটেন ৮৯ টাকা, পেট্রোল ৮৬ টাকা, ডিজেল ও কেরোসিন ৬৫ টাকা। এর আগে ২০১৩ সালে প্রতি লিটার অকটেন ৯৯ টাকা, পেট্রোল ৯৬ টাকা, কেরোসিন ও ডিজেল ৬৮ টাকা ছিল।
২০১৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ব্যাপক দরপতন শুরু হলেও বিপিসি’র ভর্তুকির লোকসান পুষিয়ে নেয়ার অজুহাতে তেলের দাম কমাচ্ছিল না সরকার।
বিপিসি সূত্র জানায়, জ্বালানি খাতে ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত ৯ বছরে ৪৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। জ্বালানি খাতে বিপিসির উৎপাদন খরচ অকটেনে ৬১ দশমিক ২৫ টাকা, পেট্রোলে ৬২ দশমিক ৫০ টাকা, ডিজেলে ৪৯ দশমিক ২৫ টাকা এবং কেরোসিনে ৪৮ দশমিক ২৫ টাকা।