সরেজমিন : পোর্ট এক্সেস রোড

১৪ কিলোমিটার সড়কের ২২ পয়েন্টে উঠা-নামা!

ভূঁইয়া নজরুল
পোর্ট এক্সেস রোড (টোল রোড) এর সাথে যুক্ত করে গড়ে তোলা ট্রাক টার্মিনাল। টোল রোড ঘেষে এ ধরনের অনেক টার্মিনাল গড়ে উঠেছে। ছবিটি ফৌজদারহাট অংশ থেকে তোলা - হেলাল সিকদার
পোর্ট এক্সেস রোড (টোল রোড) এর সাথে যুক্ত করে গড়ে তোলা ট্রাক টার্মিনাল। টোল রোড ঘেষে এ ধরনের অনেক টার্মিনাল গড়ে উঠেছে। ছবিটি ফৌজদারহাট অংশ থেকে তোলা - হেলাল সিকদার

১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পোর্ট এক্সেস রোডের ২২ পয়েন্টে রাস্তা কেটে তৈরি হয়েছে উঠা-নামার সুযোগ। কোথাও কাভার্ড ভ্যানের গ্যারেজ আবার কোথাও তৈরি হয়েছে রেস্টুরেন্ট, কনটেইনার রাখার স্থান কিংবা পাথর ব্যবসা কেন্দ্র। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য আনা নেয়ার জন্য পোর্ট এক্সেস রোডটি ৮০ এর দশকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর নির্মাণ করলেও দিন দিন আর এই সড়কে গাড়ি উঠা-নামার সুযোগ তৈরি হয়ে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বন্দরমুখী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি ও প্রাইম মুভারের চলাচল।
গত মঙ্গলবার ফৌজদারহাট থেকে বন্দর এলাকা পর্যন্ত পোর্ট এক্সেস রোডটি সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রাঙ্ক রোড থেকে ফৌজদারহাট থেকে গাড়িগুলো পোর্ট এক্সেস রোডে ঢুকার সাথে সাথে হাতের ডানে গড়ে উঠেছে দুটি গ্যারেজ। গ্যারেজ দুটি পার হয়ে ৫০ মিটার সামনে পেরুলে বাম দিকে মোড় নেওয়ার সময় বাম পাশের জায়গায় গড়ে উঠেছে বিশাল একটি গ্যারেজ। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানগুলো মেরামতের জন্য পোর্ট এক্সেস রোডের রাস্তা গিয়ে সহজেই গ্যারেজে প্রবেশ করছে এবং বের হচ্ছে। এই অংশে রাস্তার উপরেও অনেক গাড়ি থাকছে। ঝালকাঠি ১১-০১৩৮ নম্বরের একটি ট্রাক রাস্তার একাংশ দখল করে দাঁড়িয়ে থাকায় জানতে চাইলে ট্রাকটির চালক জানায়, কিছু মেরামত করতে হবে। গ্যারেজের ভেতরে জায়গা নেই, তাই বাইরে অপেক্ষা করছি।
শুধু এই ট্রাক নয়, একইসাথে রোডের উপর সারিবদ্ধভাবে আরো চারটি গাড়ি রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ছিল।
পার্কিং পার হয়ে একটু সামনে (বন্দরমুখী) গেলেই হাতের ডান পাশে রয়েছে শুকতারা নামের একটি রিসোর্ট। বঙ্গোপসাগরের বেঁড়িবাধের ভেতরের দিকে (সাগরের অংশে) গড়ে উঠা এই রিসোর্টটিতে যাতায়াতের জন্য পোর্ট এক্সেস রোড ব্যবহার করা হয়েছে। শুকতারা পার হয়ে আরো সামনের দিকে অগ্রসর হলে কালুশাহ এলাকায় পোর্ট এক্সেস রোডের অংশের সাথে ইট সুরকি ফেলে যাতায়াতের পথ তৈরি করে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানের গ্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে। একই এলাকায় রাস্তার সাথে যুক্ত করে নির্মাণ করা হচ্ছে মেসার্স জে এসি রিফুয়েলিং স্টেশন। আরো সামনে অগ্রসর হলে নগরীর উত্তর কাট্টলীর সাথে ঈশান মহাজন রোডের সাথে যুক্ত করা হয়েছে এক্সেস রোডটিকে। এজন্য রোডের কাঁটাতারের বেষ্টনি কেটে ইট সুরকি দিয়ে রোড থেকে অনেক নিচের সড়কটির সাথে গাড়ি চলাচলের জন্য যুক্ত করা হয়েছে। একইভাবে এক্সেস রোডের সাথে যুক্ত করে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনিঘাট এলাকায় গড়ে উঠা আরো দুটি রিসোর্ট, কোস্টাল মারমেইড রেস্টুরেন্টও গড়ে তোলা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি গ্যারেজ, পাথর ব্যবসা কেন্দ্র ও কনটেইনার ইয়ার্ড গড়ে তোলা হয়েছে হালিশহর চেয়ারম্যান ঘাটা থেকে টোল প্লাজার আগ পর্যন্ত। হালিশহরের চেয়ারম্যান ঘাটা ( আর্টিলারির পর) টোল প্লাজা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় একটি জেলে বস্তি, দুটি পাথর ব্যবসা কেন্দ্র, একটি কনটেইনার ইয়ার্ড, একটি রেস্টুরেন্ট ও তিনটি বড় আকারের গ্যারেজ গড়ে তোলা হয়েছে। এসব গ্যারেজ ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানগুলো প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় দুই লেনের পোর্ট এক্সেস রোডে যানজটের সৃষ্টি হয়। এছাড়া অনেকে রাস্তায় পার্ক করে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
এই রোডের সাথে কোনো ধরনের সংযোগ দেয়া নিষিদ্ধ জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এই রোডটি তৈরি করা হয়েছে শুধুমাত্র বন্দরে যাতায়াত করা ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি ও প্রাইম মুভারগুলো চলাচলের জন্য। আর তাই এই রোডের দুই পাশে কাঁটাতারের বেড়া ও বেষ্টনি দেয়া ছিল। কিন্তু এখন অনেক স্থানে তা কেটে ইট সুরকি দিয়ে নিচের ভূমির সাথে সড়কের যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে যা অবৈধ।’
এ বিষয়ে পোর্ট এক্সেস রোডটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে কাঁটাতারের বেঁড়া থাকায় ধীরে ধীরে স্থানীয়রা তা কেটে অনেকে এই রোডের সাথে যুক্ত সড়ক বা যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করেছে। এগুলো বেআইনি, শিগগিরই এসব যুক্ত বন্ধ করে দেয়া হবে।
জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আফতাব হোসেন খান বলেন, ‘এই রোডের সাথে যেকোনো ধরনের সংযোগ তৈরি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। তবে এই রোডের পাশের জায়গা নিয়ে এডিবির (এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক) অর্থায়নে পুরো সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে সার্ভের কাজ শিগগিরই শুরু হবে। আর চার লেন সড়ক নির্মাণ হলে স্থানীয় মানুষ ও আশপাশে যাদের বসতি থাকবে তাদের জন্য একটি সার্ভিস রোড নির্মাণ করা হবে।’
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের ৯২ শতাংশ পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। এসব পণ্যের বেশিরভাগ এই রোড দিয়ে চলাচল করে। বন্দরের এনসিটি ইয়ার্ড ও এমপিবি গেইট থেকে পণ্য নিয়ে গাড়িগুলো ঢাকা ও অফডকের দিকে যায়। আবার অফডক থেকে রপ্তানিমুখী কনটেইনার নিয়ে বন্দরের জেটিতে প্রবেশ করে। আর এই রোডে যাতায়াতের জন্য গাড়িগুলোকে টোল দিয়ে যাতায়াত করতে হয়।