১১১ তে মাতলো অনন্য খাস্তগীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

সকালের কুয়াশা তখনো কাটেনি। শুক্রবার ছুটির দিনে পথে একটি দুটি মাত্র গাড়ি। তার মাঝে রিকশার টুংটাং শব্দও কানে বড্ড বাজে। হঠাৎ নীরবতা ভেঙ্গে দেয় জামালখান মোড়ে শতাধিক নারীর কোলাহল। আনন্দের এ কোলাহল নগরীর খ্যাতনামা স্কুল ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রীদের। তাদের অংশগ্রহণে জমে ওঠে স্কুলটির ১১১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ২০১৭ সালে মাধ্যমিক পেরোনো ছাত্রী যেমন এসেছে, তেমনি এসেছেন ১৯৭১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়া ছাত্রীও। এসেছেন ৬০ থেকে ৯০ দশকের ছাত্রীরা। দেখা মেলে ১৯৫৬ সালের ছাত্রীরও।
স্কুলপ্রাঙ্গণে ঢুকতেই চোখে পড়ে মধ্যবয়সী ও প্রবীণ ছাত্রীদের ব্যাপক উপস্থিতি। একে অপরকে জিজ্ঞেস করে বেড়াচ্ছেন কে কোন ব্যাচের? কত সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন? সবাই খুঁজে ফিরছেন নিজ নিজ ব্যাচের সহপাঠীদের। দেখা হলেই মাতছেন সেলফিতে।
জ্যৈষ্ঠ ছাত্রীদের দেখা পেলেই অনুজরা জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘আপা আপনাদের সময়ে স্কুল কেমন ছিলো?’, ‘হোস্টেলজীবন কেমন কাটিয়েছেন?’ আর এমন প্রবীণ ছাত্রীদের সাথে দেখা হওয়ার মুহূর্তটি ধরে রাখতে সেলফি তুলে নিতে ভুললেন না কেউ।
‘স্কুলে এলাম ১১ বছর পর। এসে মনে হচ্ছে, আবার ছোট হয়ে গেছি আমি। ছোট্ট সেই বালিকা, যে কি না গ্রাম থেকে এসেছে পড়াশোনা করতে।’ বলছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার। ডা. খাস্তগীর স্কুলের প্রাক্তন এই ছাত্রীর কণ্ঠে ফুটে ওঠে তাঁর আনন্দ। তিনি বলেন, ‘আমাদের সময় মেয়েরা পড়াশোনা করার কথা ভাবাই যেত না। সেখানে এই খাস্তগীর স্কুল তৎকালীন সময়ে আমাদের পথ দেখিয়েছে। অনেক সাহায্য করেছে।
স্কুলটির ১১১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধান অতিথি ছিলেন দেশবরেণ্য কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। তিনি বলেন, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আমি মনে করি পৃথিবীর এমন একটি প্রান্ত যেখানে সবাই আসে তাদের জীবনটাকে মনোরমভাবে সাজাতে। আমি মনে করি এই স্কুলটি সবসময় তার শিক্ষার্থীদের মনোরম জীবন সাজাতে অনুপ্রাণিত করে। এই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, যিনি স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি তাঁর নামে একটি বইও লিখেছি। সেলিনা হোসেন তাঁর বক্তব্যের শেষে স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ডা. অন্নদাচরণ খাস্তগীরের প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বক্তব্যে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হাসমত জাহানসহ কয়েকজন শিক্ষিকা তাঁদের বক্তব্যে স্কুলের মাঠ দখল করার জন্য একটা গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেছেন।
১১১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী আয়োজক কমিটির সভাপতি ডা. শাহানারা চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, খাস্তগীর স্কুল যুগ যুগ ধরে একটি নারী শিক্ষা বিস্তারের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে এগিয়ে চলেছে। প্রতিবছর জাঁকজঁমকভাবে এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে এর আলোকবর্তিকাকে আরও উঁচুতে তুলে ধরা এবং সবার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন রচনা করা। এই যে ছবি তোলার জন্য কেউ পোজ দিতে গেলে একজন একজন করে ৫ জন থেকে ২০ জন, আবার ২০ জন থেকে ৩০ জনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে- এভাবে সবার মধ্যে বন্ধুত্বের বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে, এটাই তো চেয়েছিলাম।
দুদিনব্যাপী ১১১ বছর পূর্তি উৎসব আনন্দঘন নানা আয়োজনের মাধ্যমে আজ শেষ হবে।