সড়কের পাশে ড্রেন নির্মাণে চৌধুরীহাটে ভূমি অধিগ্রহণ

১০ ফুটের টাকা নিয়ে ভাঙা হচ্ছে ৬ ফুট!

মোহাম্মদ রফিক
Untitled-1

অক্সিজেন-হাটহাজারী মহাসড়কের পাশে (পূর্ব) ড্রেন নির্মাণ করতে ৩৩ শতাংশ জায়গা অধিগ্রহণ করেছে সরকার। এ খাতে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে আড়াই কোটি টাকা। ড্রেনটি নির্মাণের কথা কুলগাঁও থেকে চৌধুরীহাট পর্যন্ত। চৌধুরীহাট ছাড়া বাকি প্রায় জায়গায় ড্রেন নির্মাণ শেষ হয়েছে। অধিকাংশ জায়গার মালিক ও ভাড়াটিয়াদের ক্ষতিপূরণও পরিশোধ করেছে জেলা প্রশাসন।
চৌধুরীহাটে ড্রেনের জন্য সড়কের পাশে ৯ থেকে ১০ ফুটের মধ্যে লাল দাগ দিয়ে বিদ্যমান স্থাপনা ভাঙার নির্দেশও দিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। ইতোমধ্যে নিজ উদ্যোগে ভাঙার কাজও শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিপত্তি অন্য জায়গায়। ভাঙার কথা ৯ কিংবা ১০ ফুট। কেউ ভেঙেছেন ৫ ফুট। আবার কেউ ভেঙেছেন ১০ ফুট।
একাধিক দোকানদার জানান, সরকার দলীয় স্থানীয় বিতর্কিত এক নেতার পক্ষ থেকে ড্রেনের জন্য ৪-৫ ফুট জায়গা ভাঙতে দেওয়া হবে না মর্মে ‘আশ্বাস’ পেয়ে তারা এমনটি করেছেন। এজন্য ওই নেতার পকেটও ভারি করেছেন তারা।
প্রসঙ্গত, চৌধুরীহাটে মহাসড়কের পূর্ব পাশে মুরগিহাট গলি থেকে উত্তরে দাতারাম চৌধুরী সড়কের মোড় পর্যন্ত ৩০-৩৫টি দোকান রয়েছে।
অভিযোগ আছে, সওজ, গণপূর্ত ও জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কিছু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করার নামেও টাকা ছড়াচ্ছেন জায়গা ও দোকান মালিকেরা। যারা ১০ ফুট ভাঙেননি, তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ হাজার করে প্রায় চার লাখ টাকা তুলেছেন এক দোকানদার। এ ধরনের একটি তথ্য পাওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন সওজের উপসহকারী প্রকৌশলী মং থুই মারমা।
গতকাল মঙ্গলবার সওজ’র এ কর্মকর্তা বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি চৌধুরীহাট গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে এসেছি। সরকার থেকে টাকা নেবেন ১০ ফুটের, আর ভাঙবেন ৫ ফুট, তা হতে দেওয়া হবে না। আমরা ঠিকাদার থেকে ১০ ফুট জায়গা বুঝে নেবো। এক ইঞ্চিও ছাড় দেওয়া হবে না।’
নাম প্রকাশ না করে সওজ’র এক কর্মকর্তা জানান, লাল দাগ মোতাবেক স্থাপনা না ভাঙতে সরকার দলীয় স্থানীয় নেতাদের দিয়ে সওজ’কে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে এ কথা নাকচ করে দিয়ে সওজ’র বিভাগীয় প্রকৌশলী শাহ মো. আরেফিন সিকদার গতকাল সুপ্রভাতকে বলেন, ‘ম্যানেজ করার নামে টাকা ওড়ার খবর পেয়ে আমিও প্রকল্প এলাকায় গিয়েছি। ড্রেনের জন্য সরকার যতটুকু জায়গা অধিগ্রহণ করেছে, তার এক চুলও ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। আমরা সরকারের লোক। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এ কাজ নিয়ে সওজ’র ওপর চাপ সৃষ্টিরও কোনো সুযোগ নেই। ঠিকাদার আমাদেরকে অধিগ্রহণকৃত জায়গা বুঝিয়ে দেবেন। ১০ ফুটের কম হলে সওজ’র লোক দিয়ে ভেঙে ঠিকাদারের কাছ থেকে জায়গা বুঝে নেবো।’
এদিকে এক বছর আগে একইভাবে চৌধুরীহাটের পশ্চিম পাশে ৮ থেকে ১০ ফুট জায়গা অধিগ্রহণ করে ড্রেন নির্মাণ করেছিল সওজ। তবে এক্ষেত্রেও চলেছে দুর্নীতি ও অনিয়মের খেলা। গোল্ডেন সিটির উত্তরে সওজ নিয়মমাফিক স্থাপনা ভেঙে ড্রেন নির্মাণ করলেও দক্ষিণে অন্তত দেড়শ ফুট জায়গায় ভেঙেছে ৫ থেকে ৬ ফুট। অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট জায়গাটির মালিকের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে ভাঙা থেকে সুরক্ষা দিয়েছেন সওজ ও গণপূর্ত বিভাগের অসাধু কর্মকর্তারা।
ছোটন কান্তি দস্তিদার নামে এক যুবক অভিযোগ করেন, তার মালিকানাধীন একটি দ্বিতল স্থাপনার ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রথম দফা ২৯ লাখ টাকা অ্যাসেসমেন্ট করেন গণপূর্ত বিভাগের হিসাব সহকারী আরিফুর রহমান। এ টাকা পাইয়ে দিতে তার (ছোটন) কাছে দুই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন আরিফুর। দিতে রাজি না হওয়ায় একই স্থাপনার জন্য ৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে পাঠিয়ে দেন জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায়। এ ব্যাপারে ছোটন গণপূর্ত বিভাগ-২ এ মৌখিক অভিযোগ দিলে আরিফুরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ।
স্থাপনার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে গণপূর্ত বিভাগের কিছু কর্মকর্তার দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে শুধু ছোটন নয়, আরো একাধিক দোকানদার আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ছোটন কান্তি দস্তিদার আরো জানান, অভিমান করে এলএ শাখা থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৯ লাখ টাকা আজও তিনি গ্রহণ করেননি। সম্প্রতি আলোচ্য স্থাপনার ক্ষতিপূরণ পুনরায় নির্ধারণ করতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছেন। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
জানতে চাইলে গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মুহম্মদ আশিফ ইমরোজ গতকাল বিকালে তার দপ্তরে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘হিসাব সহকারী আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। আমরা শুধু অধিগ্রহণ করা সংশ্লিষ্ট স্থাপনার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসনে পাঠিয়ে দিই। কে কত ফুট জায়গা ছাড়ল কিংবা ভাঙল, সেটি দেখে সওজ বিভাগ। আর জায়গার মূল্যসহ ক্ষতিপূরণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় জেলা প্রশাসন।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, হাটহাজারী মহাসড়কের পূর্ব পাশে (চৌধুরীহাট বাজার এলাকা) প্রায় তিনশ ফুট জায়গায় বিদ্যমান ৩০-৩৫টি দোকানের সামনের অংশ ভাঙার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। মুরগিহাট গলির পাশে সওজ’র দেওয়া লাল দাগ মোতাবেক একটি ফোন-ফ্যাক্সের দোকানের প্রায় ৯-১০ ফুট অংশ ভাঙা হয়েছে। দাতারাম সড়ক মোড়ে ‘ক্যাফে রাবেয়া’ কর্তৃপক্ষ একইভাবে সরকারি ড্রেনের জন্য প্রায় ১০ ফুট ভেঙে ফেলেছেন। কিন্তু অবশিষ্ট একজন দোকানদার কিংবা জায়গার মালিক সওজ’র লাল দাগ মোতাবেক স্থাপনা ভাঙেননি।
এ প্রসঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার সওজ চট্টগ্রাম সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী জুলফিকার আলী তার দপ্তরে সুপ্রভাতকে বলেন, ‘কারো কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে সরকারের অধিগ্রহণকৃত জায়গা এক চুল পরিমাণ কম ভাঙার সুযোগ নেই। বাতাসে অনেক কথাই ওড়ে।’