‘বেসামরিকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ’ মিয়ানমার

হোয়াইট হাউসের গভীর উদ্বেগ

বাংলা ট্রিবিউন

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিজ দেশের বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক বেসামারিক মানুষের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এক সংবাদ সম্মেলনে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ করা হয়। পালিয়ে আসা মানুষদের মানবিক সহায়তার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসাও করা হয় ওই সংবাদ সম্মেলনে।
সংকট উত্তরণে মিয়ানমারকে কফি আনানের নেত্বত্বাধীন রাখাইন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়। তবে সংবাদ সম্মেলনে রাখাইনের দুর্গত মানুষের ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয়টি একবারও ব্যবহার করা হয়নি। আর মিয়ানমারকে ডাকা হয়েছে উপনিবেশিক বার্মা নামে।
সামপ্রতিক ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের লক্ষ্যে সেনা অভিযান শুরুর কয়েকদিনের মাথায় ‘বিদ্রোহী রোহিঙ্গা’রা ২৪টি পুলিশ চেকপোস্টে বিদ্রোহীদের সমন্বিত হামলায় অন্তত ১০৪ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়ে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান জোরদার করে সরকার। এরপর থেকেই মিলতে থাকে বেসামরিক নিধনযজ্ঞের আলামত। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশতে থাকে মৌসুমী বাতাসে। মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে শূন্যে ছুঁড়তে থাকে সেনারা। কখনও কখনও কেটে ফেলা হয় তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মানুষকে। আহত শরণার্থী হয়ে তারা ছুটতে থাকে বাংলাদেশ সীমান্তে।
সোমবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ স্যান্ডার্স রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইনে পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। ২৫ আগস্ট পুলিশ চেকপোস্টে হামলার পর অন্তত ৩ লাখ মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। আমরা ওই হামলা ও সহিংসতার নিন্দা জানাই।’ সারাহ স্যান্ডার্স বলেন, ‘বেশিরভাগ বাস্তুহারা মানুষই বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা তাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ায় আমরা বাংলাদেশ সরকারকে স্বাগত জানাই। বিশাল সংখ্যক সংখ্যালঘুদের এই পালিয়ে যাওয়ার কারণে এটাই স্পষ্ট হয় যে মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেসামরিক মানুষকে রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছেন।’
সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাতিসংঘ ছাড়াও আরও ১৬টি মানবিক সহায়তা প্রতিষ্ঠান মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ত্রাণ কার্যক্রমে অসহযোগিতা আর বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলে। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে তখন বলা হয়, কখনও ভিসা বন্ধ করে, কখনও সহায়তাকর্মীদের ফেরত পাঠিয়ে, কখনওবা আবার স্থানীয় প্রশাসনের রক্তচক্ষুর মাধ্যমে ত্রাণ সরবরাহে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এতে লাখ লাখ রোহিঙ্গার জীবন শঙ্কা দেখা দেয় বলে অভিযোগ তুলেছে মানবিক সহায়তার আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো।
এদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনে সারা স্যান্ডার্স বলেন, ‘আমরা এমন অভিযোগে উদ্বিগ্ন। নিরাপত্তা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, হত্যা ও ধর্ষণসহ অনেক অভিযোগ পাচ্ছি আমরা।’ মিয়ানামার কর্তৃপক্ষকে আইনের প্রতি সম্মান রেখে এই সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান। একইসঙ্গে কাউকে যেন ঘরছাড়তে না হয় সেদিকেও নজর দিতে বলা হয়েছে।
রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা পরিস্থিতির তদন্তে গত বছর মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো সরকারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন। আগস্টের শেষ সপ্তাহে আনানের নেত্বত্বাধীন রাখাইন কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসে। এতে রোহিঙ্গাদেরকে ‘বিশ্বের একক বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন সমপ্রদায়’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার জন্য মিয়ানমার সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়।
প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, যদি স্থানীয় জনগণের বৈধ অভিযোগগুলি উপেক্ষা করা হয়, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিশ্চিত না করা হয় এবং এ সমপ্রদায়টি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক থেকে যায় তাহলে উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্য জঙ্গিবাদের উর্বর ঘাঁটিতে পরিণত হবে।
হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনে রাখাইন কমিশনের ওই প্রস্তাবনা অনুযায়ী মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীকে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
সারা স্যান্ডার্স বলেন, ‘আমরা মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীকে আইনের প্রতি সম্মান রেখে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানাই। নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করে রাখাইন কমিশনের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করারও আহ্বান জানাই আমরা।’
হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমার সরকারের মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করে স্যান্ডার্স বলেন, যতদ্রুত সম্ভব এই সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। সহিংসতার শিকার এলাকাগুলোতে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করারও আহ্বান জানানো হয় এতে।