হেমন্তের নানা রঙ

আশরাফুন নুর
Untitled-1

শরতের বিদায়ে শ্রাবণের যে শ্রাব রস আসীন হয়ে পড়ে প্রকৃতির শরীরে সেই রসের আশ্বিনে এসে শেষ হয়। নতুন পর্ব শুরু হয় কার্তিকে। ‘কার্তিক’ শব্দটি এসেছে ‘কর্তন’ হতে। কর্তন মানে পৃথক করা, কাটা। এই কার্তিকই বাংলা বছরকে দুই ভাগ করে দেয়। আসলে আশ্বিনে রসের পর্ব শেষ, আর কার্তিক সেই রস কেটে দিয়ে নি-রস তথা শুকনোর পর্ব শুরু করে। এ কার্তিক হলো হেমন্ত ঋতুর প্রথম মাস। ‘হেমন্ত’ কে ভাঙলে পাওয়া যায় ‘হিম+অন্ত’। হিম মানে ঠাণ্ডা আর অন্ত মানে শেষ। তাহলে বুঝা যায় পুরো হেমন্ত মানে ঠাণ্ডা-শেষ। কিন্তু আমরা দেখি হেমন্ত তো ঠাণ্ডার শুরু। মূলত এখানে অন্ত বলতে বুঝানো হয়েছে আন্ত, মানে আন্‌-তো, আনো-তো। যেমন বলা হয়ে থাকে “বাতাস হিম আনে-তো। হিম আনে-তো এটিকে অনেকে সংক্ষেপে বলে ‘হেমন্ত এসে গেছে’।
সময়ের সাথে সাথে প্রতিটি ঋতুই তার নিজস্ব রূপ- বৈচিত্র্যে প্রকৃতিতে রাজত্ব করে চলে। হেমন্তও তার রূপ-বৈচিত্র্যে আধিপত্য করে এবং রাজত্ব করে যায়। যদিও তাকে ঋতুর রাজা কিংবা রাণী বলা হয় না। তবুও তো একটা প্রভাব আছে প্রকৃতির উপর তাঁর। হেমন্তের নিজস্ব সত্ত্বা আছে। রূপ যৌবনে ভরপুর। হেমন্ত ধীর স্বভাবে আসে শীতের হাতছানি দিয়ে। তার গায়ে মাখা থাকে কুয়াশা, পরা থাকে কুয়াশার সাদা চাদর।
যার সাথে শরতের স্নিগ্ধতার গন্ধও থেকে যায় সামান্য। সে শরৎ থেকে যেমন পৃথক নয় তেমনি শীত থেকেও বিচ্ছিন্ন নয় তার প্রকৃতি। হেমন্ত শান্ত, আবার রূপ বৈচিত্র্যে লাজুক প্রকৃতির। সকালটা হালকা কুয়াশা-চাদরে ঢাকা থাকে। ভোরে কুয়াশা ভেজা মিষ্টি প্রকৃতির রোদ ও মৃদু হিম স্পর্শ প্রাণে শিহরণ জাগায়। সবুজ ঘাসের ডগায় ডগায় শিশিরের মুক্তোর দাঁত দেখিয়ে হাসে। এ দাঁতগুলো যেন সূর্য-কিরণের কল্যাণে হীরকের দ্যুতি ছড়ায়। ভোরের সূর্য সময়ের সাথে সাথে শিশু-কিশোর বয়েস পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করলেই এ কুয়াশার ঘোমটার চাদর সরে যায়। তারপর ফকফকা রোদ, সোনালী রোদের ঝিলিক। সকালের সূর্যের উদীয়মান দৃশ্য দেখলেই হেমন্তের রূপের বৈচিত্র্যতা ধরা পড়ে। চোখের সামনে ভাসে তার রূপ লাবণ্য।
হেমন্ত ঋতুর রাণী শরতকে অনুসরণ করে চলে। তাই হেমন্তেও দেখা যায় শরতের মতো মেঘমুক্ত নীলাকাশ। হেমন্তকে ঋতুকন্যাও বলা হয়। হেমন্তের এ রূপ লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে কোনো কবি-লেখক নিরব থাকতে পারেনি। তাঁরা লোকগাথা কবিতা, গান, গল্পে তার রূপের বর্ণনা করেছেন যুগে যুগে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কবিতায় এ হেমন্তের রূপ ধরা পড়ে-
“আজ হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে,
জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে।
শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার,
রয়েছে পড়িয়া শান্ত দিগন্ত প্রসার
স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।” (নৈবেদ্য)
ধূ-ধূ বিস্তৃত সোনালী ধানের মাঠ হেমন্তের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও রূপ। শরতে বেড়ে ওঠা কচি আমন-আউশ হেমন্তে পেকে সোনালী রূপ ধারণ করে। কৃষকের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ধান কাটার ধুম পড়ে যায় মাঠে মাঠে। ভোরে কুয়াশা ভেজা অলস-নিদ্রারত ধানক্ষেত কৃষকের হাত-পা-কাস্তের স্পর্শে জেগে উঠে। সারাদিন মাঠে ক্লান্তি নেই তাদের হেমন্তের আবহাওয়াতে এক রকম প্রশান্তি আছে, যার কারণে ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি কৃষকের মুখে ক্লান্তির ছাপ পড়ে না।
এ ধান কাটার আমেজে অতিথি হিসেবে থাকে পাখি। তারা পাকা ধানে উড়ে এসে জোরে বসে কিংবা কাটা ধানের স্তূপে স্তূপে ঝাঁকে ঝাঁকে এসে বসে। শালিক, টিয়া ও ময়নার দল উড়ে এসে জোরে বসে ধান খায়। পল্লীকবি জসীম উদ্দিনের কবিতার ক্যানভাসে এমন দৃশ্যে দেখতে পাই-
“আশ্বিন গেল কর্তিক মাসে/পাকিল ক্ষেতের ধান,/সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন/হলদি কাটার গান।/ধানে ধানে লাগি বাজিছে বাজনা/গন্ধ উড়ায় বায়ু,/কলমি লতায় দোলন লেগেছে/ফুরাল ফুলের আয়ু।” (সুখের বাসর/ নক্সীকাঁথার মাঠ।)
“সবুজ হলুদে সোহাগ চুয়ায়ে ধান ক্ষেত/ পথের কিনারে পাতা দোলাইয়া করে সাদা সংকেত/ ছড়ায় ছড়ায় জড়াজড়ি করি বাতাসে ঢলিয়া পড়ে/ ঝাঁকে আর ঝাঁকে টিয়া পখিগুলো শুয়েছে মাঠের পরে।”
সারা গ্রাম মেতে ওঠে নতুন ফসল ঘরে তোলার উৎসবে। এ উৎসবে আলাদা গন্ধও থাকে আর তা হলো পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ। ছোটকালে ঢেঁকিতে চাল ভানার আওয়াজ শুনতাম, চাল ভানার আমেজ দেখতাম, এখন সেই দৃশ্য গ্রামগুলোতে এ দৃশ্য দেখা যায় না। বিজ্ঞানের কল্যাণে আধুনিক মেশিনের আধিপত্যই এর কারণ। গ্রাম বাংলার নবান্ন উৎসবের পরিবর্তন এসেছে সময়ের বিবর্তনে। নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি হয় নানা নামের পিঠা-পুলি। কবি সুফিয়া কামাল তাঁর কবিতায় লিখেছেন-
“এই তো হেমন্ত দিন, দিল নব ফসল সম্ভার/ অঙ্গনে অঙ্গনে ভরি, হে রূপ আমার বাংলার/ রিক্তের অঞ্চল ভরি, হাসি ভরি, ক্ষুধার্তের মুখে/ ভবিষ্যৎ সুখের আশা ভারি দিল কৃষকের বুকে।….মাতা হেরিতেছে নবান্ন আসন্ন উৎসবে/ বিমুগ্ধ নয়নে হেরি পরিপূর্ণ ফসলের ভার।”
তাঁর ‘মন ও জীবন’ তিনি বলেছেন-
“হেমন্তের কবি আমি, হিমাচ্ছন্ন ধূসর সন্ধ্যায়
“গৈরিক উত্তরীয় টানি মিশাইয়া রহি কুয়াশায়।”
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় হেমন্ত, শিশির ভেজা হিমেল বাতাসের অনুভূতি আর সকালের কাঁচা রোদের উষ্ণ পরশের কথা পাওয়া যায়।
“হেমন্তের ঐ শিশির নাওয়া হিমেল হাওয়া
সেই নাচনে উঠল মেতে।
টইটুম্বুর ঝিলের জলে
ফাটা রোদের মানিক জ্বলে
চন্দ্র ঘুমায় গগন তলে
সাদা মেঘের আঁচল পেতে।”
জীবনানন্দ দাশ বলা হয় হেমন্তের কবি। হেমন্ত কবির প্রিয় ঋতু। কবির কব্যিক তুলির আঁচড়ে হেমন্তের রূপ ধরা দিয়েছে। তাঁর মতো করে আর কারো কাব্যে এত বেশি অলংকার, শব্দের নতুনত্ব সৃষ্টিতে অনবদ্য প্রকাশ চোখে পড়ে না। তাঁর ‘অঘ্রাণ’ কবিতায় লিখেছেন-
“আমি এই অঘ্রাণেরে ভালোবাসি/ বিকেলের এই রং-বেরঙের শূন্যতা/ রোদের নরম রোম-ঢালু মাঠ-বিবর্ণ/ বাদামি পাখি-হলুদ বিচালি
পাতা কুড়াবার দিন ঘাসে ঘাসে/ কুড়ানির মুখে তাই নাই কোনো কথা,/ ধানের সোনার কাজ ফুরায়েছে/ জীবনেরে জেনেছে সে কুয়াশায় খালি/ তাই তার ঘুম পায়-ক্ষেত ছেড়ে/ দিয়ে যাবে এখনি সে ক্ষেতের ভিতর/ এখনি সে নেই যেন ঝড় পড়ে/ অঘ্রাণের এই শেষ বিষণ্ন সোনালী। (অঘ্রাণ)
এ নবান্নের উৎসব আমাদের প্রাচীন উৎসব। গ্রাম বাংলায় শস্য উৎপাদনের সংশ্লিষ্ট যে সকল অনুষ্ঠান কিংবা উৎসব উদযাপিত হয় নবান্ন উৎসব তার মধ্যে অন্যতম। সদ্য তোলা নতুন আমন-আউশ ধানের চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে আয়োজিত এ উৎসব। নবান্ন মানে নতুন অন্ন বা খাদ্য।
যে খাদ্য দুধ, গুড়, নারকেল, কলা প্রভৃতির সাথে নতুন আতপ চাল খাওয়ার উৎসব। যা ধান কাটার পর অগ্রহায়ণ মাসেই অনুষ্ঠিত হয়। ইট-পাথরের নগরে এর তেমন কোন আমেজ না থাকলেও গ্রাম বাংলায় তা দেখা যায়, স্বাদও পাওয়া যায়। নগরেও এর অনুষ্ঠানিতা উৎসব থাকে, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়োজন করে নানা আয়োজন। এ উৎসবের মূল বিষয় হলো ফসল তোলার পর দিনই ধানের নতুন চালে ফিরনী-পায়েস বা ক্ষীর তৈরি করে পাড়া-প্রতিবেশীদের খাওয়ানো, যদিও তা প্রায় উঠে গেছে।
এ নবান্নে মেয়ের জামাইকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হয়। বাপের বাড়িতে মেয়েরা নাইওর আসে। ক্ষেতে ক্ষেতে বেগুন, মুলা, ফুলকপি সহ নানা সবজির সমারোহ মূলত আগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পেকে ওঠে। এ মাসেই শুরু হয় নবান্নের উৎসব। এ উৎসব এখন শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ নেই, জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয় রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ প্রতিটি শহরে শহরে। জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পরিষদ ঢাকায় প্রতি বছর অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিন এ নবান্ন উৎসব উদযাপন করে। যদিও গ্রামের আমেজ এখানে থামে না কিংবা যান্ত্রিক এ শহরে নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধ নেই, শুধু ব্যস্ততাময় শহরে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য তোলা হয়, উপভোগ করা হয় সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো গান, কবিতা, গল্প, নাটক ও নৃত্যের মাধ্যমে গ্রাম বাংলার এসব ঐতিহ্য তুলে ধরে আবহমান বাংলার চিরায়ত রূপ।
নবান্ন উৎসব বাংলার প্রাচীন ও একান্ত নিজস্ব সংস্কৃতি। এ নবান্নকে উপলক্ষ করে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই আমরা বর্তমান প্রজন্ম এমন কি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি আমাদের লোকজ সংস্কৃতির সাথে। এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি অসাম্প্রদায়িক দেশীয় সর্বজনীন উৎসব।