হৃদয়ের উচ্ছলতা ঢেলে বসন্ত বরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
CRB_Bosontho-Utshob-(5)

পলাশ-শিমুলের ডালে ডালে আগুনরঙা ফুলের সমাহার। সেই সঙ্গে শীতের রুক্ষতা ঝেড়ে ফেলে গাছেরাও সেজেছে নতুন সবুজ-সজীব পাতায়। সেই পাতার আড়ালে কোকিলের ব্যাকুল কুহুতান। এই তো বসন্তের আগমনী বারতা। বহু বর্ণিল, আলোক-উজ্জ্বল, প্রাণ-প্রাচুর্যময় ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করতে হৃয়ের সকল উচ্ছলতা ঢেলে দিল নগরবাসী।
গতকাল বসন্তের প্রথম দিনে পুবাআকাশে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শিশু থেকে বৃদ্ধ- সব বয়সী নরনারীর ঢল নামে ডিসি হিলে। মেয়েরা রঙিন শাড়ি- চুড়ি, জামা আর বাহারী ফুলের সাজে সাজিয়ে ছিল নিজেদের। কোকিলের সুমধুর সুরধ্বনি আর প্রকৃতির রঙিন সাজ যেন ফুটে ওঠে তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সী মানুষের মাঝে। প্রকৃতির এ আমেজ দেখে সহজেই অনুমেয় হয় বসন্ত এসেছে দ্বারে…।
পঞ্জিকার নিয়ম অনুসারে বসন্তের আগমনী দিনকে স্বাগত জানাতে নগরীর ডিসি হিলে জড়ো হাজারো বাঙালি সন্তান। প্রবেশমুখে দেখা মিলল শিল্পীদম্পতি ভাস্কর সুকান্ত চৌধুরীর সাথে। কোলে পাঁবছরের কন্যাসন্তান মেঘ । মাথায় কয়েকটি ফুলের রিং পরেছে সে, চোখে- মুখে তাঁর আনন্দ। শিল্পী দম্পতির পরনে হলুদরঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবি। আবৃত্তি সংগঠন বোধন এই উৎসবের আয়োজন করেছে। লাল-হলুদ আর কমলারঙের ছটায় সাজানো হয় উৎসব মঞ্চ। সকালে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান। উপসি’ত ছিলেন ভারতীয় দূতাবাসের সহকারী হাইকমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জী, দৈনিক আজাদীর ব্যবস’াপনা পরিচালক ওয়াহিদ মালেক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বোধন আবৃত্তি পরিষদের সভাপতি সুজিৎ রায়।
বোধনের এই আয়োজনে সকাল থেকেই শুরু হয় বসন্তপ্রিয় বাঙালির পদচারণা। সকালের অনুষ্ঠানমালায় ছিল সেতার বাদন, একক আবৃত্তি, একক ও দলীয় নৃত্য, একক ও সমবেত সংগীত, ঢোলবাদন। বেশ আকর্ষণীয় ছিল চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের রঙ-তুলি দিয়ে ক্যানভাসে বসন্ত বরণ।
গানের তালে-তালে মন মাতালো সবাই। পলাশ গাছের নিচে বসে শিল্পীদের ‘এলো বনান্তে পাগল বসন্ত’, ‘আজ বসন্ত জাগ্রত দ্বার’, ‘অযুত বৎসর আগে হে বসন্ত, প্রথম ফাগুনে মত্ত কৌতূহলী’ গানগুলো শোনার পাশাপাশি নিজেকে নিয়ে মোবাইলে সেলফি তুলতে ব্যস্ত দেখা গেল তরুণ-তরুণীদের। বিকেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে শ্রোতাদের ধ্যানমগ্ন করে রাখেন বেহালা শিল্পীরা। ভায়োলেনিস্ট চিটাগং নামে একটি সংগঠনের শিল্পীরা এই পরিবেশনায় অংশ নেয়। এদিকে ভোর থেকে সিআরবি এলাকায়ও শুরু হয় বসন্তপ্রিয় বাঙালির পদচারণ। সিআরবির শিরীষতলায় দিনব্যাপী বসন্ত বরণের এ আয়োজন করেছে আবৃত্তি সংগঠন প্রমা। সকালে নৃত্যশিল্পী প্রমা অবন্তীর দলের নাচের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রমা’র বসন্তবরণ আয়োজন। গান, আবৃত্তি, নাচ আর কথামালায় চলতে থাকে এই আয়োজন।
কথামালা পর্বে অংশ নেন সিএমপি কমিশনার মো. ইকবাল বাহার । তিনি বলেন, শহুরে সভ্যতার চর্চা করতে গিয়ে আমরা বাঙালির অনেক চিরায়ত উৎসব হারিয়েছি। এই উৎসব মনে করিয়ে দেয় আমরা বাঙালি। বসন্ত উৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসব। আরো ছিলেন সিসিএল-এর পরিচালক শ্যামল কুমার পালিত, প্রমার সভাপতি রাশেদ হাসান। কথামালা সঞ্চালনা করেন প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ পাল। কথামালা শেষ হতেই শিরীষতলা হয়ে ওঠে প্রাণের উৎসব প্রাঙ্গণ। মাথায় লাল-হলুদ ফুল। হলুদ শাড়ি পরে বাসন্তী সাজে সেজে নারী, হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে পুরুষ। কারও গায়ে আবার পলাশ রঙে রাঙা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবি অথবা শাড়ি পরে শিশুরাও শামিল হয়েছে উৎসবে। সবার মুখে ছিল বসন্তের জয়গান। এদিকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে নিজস্ব প্রাঙ্গনে ছিল বসন্ত বরণ উৎসব। শিল্পকলা প্রাঙ্গণে এ উৎসবে যন্ত্রসংগীত, বসন্ত কথন, একক আবৃত্তি, দলীয় আবৃত্তি, একক সংগীত, দলীয় সংগীত, দলীয় নৃত্য, আদিবাসী ও শিশু-কিশোরদের বিশেষ পরিবেশনায় অনিরুদ্ধ মঞ্চ ছিল অনবদ্য। রাত ৯টা পর্যন্ত চলে ডিসি হিল, সিআরবির শিরীষতলা, শিল্পকলা প্রাঙ্গণে বসন্ত বরণের বর্ণাঢ্য আয়োজন।
সব মিলিয়ে ফাগুনের প্রথম দিনে বসন্তের রঙ ছড়িয়েছে প্রাণের উচ্ছ্বাস সুরে ও ছন্দে।