হৃদয়ছোঁয়া পহেলা বৈশাখ

আবছার উদ্দিন অলি

পহেলা বৈশাখের উৎসব শুরম্নর দিকে ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক: গ্রামীণ মেলা, লোকজ নানা ধরনের খেলাধুলা ও নৃত্য-সংগীত ছিল এর প্রধান আকর্ষণ। দিনে দিনে এই উৎসব আড়ম্বর শহরগুলোতেই বেশি লড়্গ্য করা যায়। ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারম্নকলা অনুষদ থেকে সূচিত বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা ছাড়াও চট্টগ্রাম চারম্নকলা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পকলা একাডেমী, ডিসি হিল, সিআরবি, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, নেভাল একাডেমী। এছাড়াও কক্সবাজার, বান্দরবান, টেকনাফ, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সেন্টমার্টিন, কাপ্তাই বিভিন্ন পর্যটন স্পটে নববর্ষ উৎসব বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হবে। মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় নানা ধরনের অনুষ্ঠান হয়, মেলা বসবে। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও বৈশাখী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, ব্যবসায়ীরা খুলে বসেন হালখাতা। পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা আয়োজনে পালিত হবে নববর্ষ উৎসব। তরম্নণ-তরম্নণীরা বৈশাখী উৎসবের রঙিন পোশাক পরে বেরিয়ে আসে, ঐতিহ্যবাহী দেশি খাবারের উৎসব চলবে। সর্বত্র দেখা যায় নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস।
এবার পহেলা বৈশাখ উদযাপন ইলিশবিহীন হবে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পহেলা বৈশাখে পানত্মা-ইলিশ খাওয়া একটি সামপ্রতিক প্রচলন। ঐতিহাসিকভাবে এর পড়্গে কোনো জোরালো উদাহরণ পাওয়া যায় না। সমপ্রতি পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে চালু হয়েছে জাটকা নিধন, নিষিদ্ধ জেনেও বেশি দামের প্রলোভনে এ অপরাধ চলছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ইলিশের দাম মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ইলিশের দাম। এ কারণে জেলা প্রশাসন চট্টগ্রাম উদ্যোগ নিয়েছে, এ বারের বৈশাখ উদযাপন হবে ইলিশবিহীন।’
বৈশাখ নিয়ে আসে, মানুষে মানুষে প্রীতি মিলন। বছর ঘুরে আবার এলো পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ। যা কিছু জীর্ণ-পুরোনো, অশুভ ও অসুন্দর, তা পিছে ফেলে নতুনের কেতন উড়িয়ে বাঙালি বরণ করে এই দিন। শুরম্ন হলো আরও একটি নতুন বছর ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। বাঙালির নববর্ষ এক অনন্য বৈশিষ্ট্যময় উৎসব। কেননা, পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন’ বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস’াকে ঘিরে এর প্রচলন, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো। দিনে দিনে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে এক সার্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। ধর্ম-সমপ্রদায় নির্বিশেষে বাংলা ভূখন্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। এমন অসামপ্রদায়িক উৎসব সত্যিই পৃথিবীতে বিরল।
একটা সময় পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নেওয়ার এই আয়োজন ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। আর এর ওপর ভিত্তি করেই গ্রামীণ নানান অর্থনৈতিক কর্মকা-েরও বিকাশ হয়। কিন’ ব্যসত্ম নগরজীবনেও এখন নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামমুখী ওই উৎসব এখন হয়ে উঠেছে শহরমুখী। আর শহরের মানুষ এই উৎসবটি উদ্যাপন করছে নানাভাবে। আর সে কারণে কিছু অর্থনৈতিক কর্মকা- হচ্ছে নগরেও। এসবের ফলে দেশে পহেলা বৈশাখ কেন্দ্রিক ছোটখাটো একটা অর্থনীতিও গড়ে উঠেছে। প্রতিবছরই বাড়ছে এসব অর্থনৈতিক কর্মকা-ের পরিধি। মানুষের ক্রয়ড়্গমতা বৃদ্ধিও এ ড়্গেত্রে ভূমিকা রেখেছে। বর্ষবরণের এই উৎসবটি এক সময় ছিল শুধুই গ্রামাঞ্চলের উৎসব। এই উৎসবে এখন নগরের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। ফলে নগরেও এখন গ্রামীণ লোকজ আমেজ জনপ্রিয় হচ্ছে। বৈশাখ উপলড়্গে তৈরি হওয়া শাড়ি, কুটিরশিল্প কিংবা খেলনায় থাকছে গ্রামীণ ছোঁয়া। এসব পণ্যের বাজারজাতকরণে বড় ভূমিকা রাখবে বৈশাখ। এতে পহেলা বৈশাখে নগরকেন্দ্রিক বাজার গড়ে উঠেছে।
বাংলা নববর্ষকে ঘিরে দেশি পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্যরম্নচির মর্যাদা বেড়েছে; সামপ্রতিক সময়ে এসব পণ্য বিপণনে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা। সর্বসত্মরের মানুষের মিলন ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয় পহেলা বৈশাখের এই অসামপ্রদায়িক উৎসবেই।
বাঙালির আদি সাংস্কৃতিক পরিচয়বহনকারী এই অসামপ্রদায়িক উৎসব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক গুরম্নত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমাদের বিশেষ প্রেরণা জুগিয়েছে। সামপ্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিসত্মানের শাসকশ্রেণী যখন তাদের অন্যায়-অন্যায্য শাসনকে ন্যায্যতা দিতে ধর্ম ব্যবহার করতে চেয়েছে, তখন এ ভূখ-ের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়। ষাটের দশকে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব, বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে বেগবান করেছিল। সেই একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রেরণা জুগিয়েছিল ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামেও।
পহেলা বৈশাখে কবিগুরম্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে সুর মিলিয়ে বলি বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক। নববর্ষ মানেই নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন সংকল্প। গাছে গাছে নতুন পাতা। চকচক করছে প্রখর রোদে। বাজারে, দোকানে লাল-সাদা নতুন পোশাকের সমাহার। নগরীর পথে পথে ফেরিওয়ালারা বিক্রি করছেন ডুগডুগি, নলখাগড়ার বাঁশি, বাঁশ-বেতের ঝুরি- মোড়া।
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যনত্ম সারা বাংলা ভেসেছে বিপুল আনন্দের উচ্ছ্বাসে। ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণী-পেশা, বয়স নির্বিশেষ সব মানুষ শামিল হয়েছে বৈশাখী উৎসবে। সব ভেদাভেদ ভুলে কায়মনে বাঙালি হওয়ার প্রেরণায় দীপ্ত বাঙালি বরণ করবে ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে। ঐতিহাসিকদের মতে, আগের যুগে বাংলা সনের প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ। সম্রাট আকবর ফসলি সন হিসেবে বৈশাখ মাসকে প্রথম ধরে বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন। বৈশাখ মাস থেকে বাংলায় প্রথম খাজনা আদায় করা শুরম্ন করেন নবাব মুর্শিদকুলি খান। জমিদারি আমলে পহেলা বৈশাখের প্রধান আয়োজন ছিল খাজনা আদায় উপলড়্গে ‘রাজপুণ্যাহ’ লুপ্ত হয়ে যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেনেও আসে পরিবর্তন। হালখাতাও জৌলুশ হারিয়ে ফেলে। ইদানীং নাগরিক জীবনে যে সাংস্কৃতিক চেতনায় পহেলা বৈশাখের উৎসব হচ্ছে, তা প্রবর্তনের কৃতিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তিনিই প্রথম শানিত্মনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উৎসবের আয়োজন করেন। এর অংশ হিসেবে বৈশাখ বরণের উৎসবের জন্য বাংলা নতুন বছরকে সম্ভাষণ জানিয়ে রচনা করেছেন বহু কালজয়ী সংগীত ও কবিতা। বাঙালির কণ্ঠে ছড়িয়ে গেছে সেই চেনা সুর ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো….।’