হাসিমুখের শূন্যতা

আবুল মোমেন
Portrait-(1)

ফাহমিদা আপার কথা মনে করলেই তাঁর হাসিমুখটা ভেসে ওঠে। হাসতে এবং হাসাতে ভালোবাসতেন তিনি। প্রাণবন্ত মানুষ এ সংসারে বিরল, তাই তাঁর হাসিমুখ এত স্মরণীয় আমাদের কাছে। হাসিখুশি বয়োজ্যেষ্ঠরা হলেন সংসারের ভূষণ। ফাহমিদা আপা বয়সের হিসেবে যথাসময়ে বার্ধক্যে পৌঁছেও আমৃত্যু আগের মতই হাসিখুশি ছিলেন।
ব্যক্তিগত শোক বিশেষত সন্তানের অকাল নিষ্ঠুর মৃত্যু তাঁকেও যে-কোনো মায়ের মতই বিধ্বস্ত করেছিল। তবে শোকের সাথে বোঝাপড়া করেছিলেন তিনি নীরবে নেপথ্যে শোভন সুন্দরভাবে। মৃত্যু বা ব্যক্তিগত বেদনা জীবনের প্রসাদ যেন মিথ্যা করে না দেয় সেই মর্যাদাবোধ কখনো হারাননি তিনি।
অন্তরের এই প্রশান্তি এবং জীবনের প্রতি আগ্রহ কখনো হারাননি তিনি। কী ছিল এর পেছনে? কোন শক্তিতে এটা তিনি পেরেছেন? স্রষ্টার ওপর বিশ্বাস তো ছিলই, কিন্তু তাতে ইহলোক ছেড়ে পরলোক-চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকেননি তিনি। আদতে তিনি ছিলেন জীবনবোধে সম্পন্ন মানুষ, তাঁর মধ্যে টইটুম্বুর করত জীবন সম্পর্কে রসবোধ। ফাহমিদা আমিন ছিলেন জীবনরসিক মানুষ। সেই রসবোধ তাঁকে বয়সের ভার, জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার আঘাত, দায়িত্ব-কর্তব্যের চাপ অনায়াসে পেরিয়ে যাবার রসদ দিয়েছে, দিয়েছে পুষ্টি।
এই রসবোধ, রসপূর্ণ জীবনবোধই বা তিনি পেলেন কোথায়? পেলেন মূলত সাহিত্য থেকে। পারিবারিক পরিমণ্ডলে সাহিত্যপাঠের অভ্যাস গড়ে উঠেছিল তাঁর। ফাহমিদা আপাদের পরিবারে শিক্ষার সাথে সাথে সংস্কৃতিচর্চার রেওয়াজ ছিল। আর এটাই তাঁকে দিয়েছে জীবনকে উপভোগের সামর্থ্য এবং রুচি।
বিয়ে করেছিলেন চট্টগ্রামের এক বিদ্বান ব্যক্তি ড. এম. আর. আমিনকে, যিনি রসায়নশাস্ত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও গরিবের চিকিৎসা হোমিওপ্যাথির চর্চায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। পিতৃ পরিবারের জ্যেষ্ঠজন হিসেবে ভাইদের আর নিজের পরিবারের সাতপুত্রের জনক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল এক বৃহত্তর পরিমণ্ডলের অভিভাবকের। পারিবারিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অভিভাবকত্ব দিয়েছেন আমিনসাহেব। কনিষ্ঠ ভাইদের আর পুত্রদের মাধ্যমে এই সুকৃতি যেন তাঁর অনুপস্থিতিতেও বয়ে চলেছে। ফাহমিদা আপা এই দায়িত্বশীলতার কেজো জগতের মধ্যে সুগন্ধ ও সুমিষ্ট রসের জোগান দিয়েছেন। যেন এ জীবন সবার জন্যে সুন্দর ও সার্থক হয়ে ওঠে।
পরিবারের বাইরে ফাহমিদা আপার জগৎটা নিছক ছোট ছিল না। সাহিত্য ও সামাজিক সূত্রে এসব যোগাযোগ ঘটেছে, এবং সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয়, সরব, সহাস্য ভূমিকা থাকত। বান্ধবী পত্রিকা, লেডিজ ক্লাব, মহিলা সমিতি, এতিমখানা, চট্টগ্রামে বেতার এবং আরো নানা সংস্থার সাথে যুক্ত ছিলেন আপা।
নিজে লিখেছেন মূলত রম্যরচনা। দীর্ঘদিন জাতীয় দৈনিক জনকণ্ঠের চতুরঙ্গ পাতায় একটি রম্য কলাম লিখেছেন নিয়মিত। এ সূত্রে দেশব্যাপী পাঠক পেয়েছেন। ঢাকায় তাঁর পরিচিতি গড়ে উঠেছিল। তবে নিজের জায়গা তো চট্টগ্রামই, বহুকাল ধরে এখানকার সমাজ জীবনের তিনি এক পরিচিত মুখ।
তিনি বড় এবং ছোটদের জন্যে অনেক লিখেছেন, বেতারে নিয়মিত অনুষ্ঠান করেছেন, নানা সাহিত্য অনুষ্ঠানে কথা বলেছেন। সেসব লেখা ও কথা কেজো বিষয়ে ভারাক্রান্ত রসকষহীন নয়। তিনি এভাবে নিরেট কাজের কথা বলে যেতে কিংবা নিছক উপদেশ দিয়ে যেতে পারতেন না। সব লেখা ও কথা রসের ভিয়েনে চড়িয়ে রসিকজনের কাছে তুলে ধরতেন।
আজ বাংলাদেশে যখন খুব দরকার হাসির তীরে বিঁধে সত্যের হুলটি ফোটানো, ব্যঙ্গের চাবুক দিয়ে বাস্তবের অসঙ্গতি দেখিয়ে দেওয়া, বিদ্রূপের ফণায় বিঁধে ভণ্ডামি-প্রতারণার শঠতাকে খুলে ধরা তখন খুব শূন্যতা অনুভব করি। ফাহমিদা আপা রাজনীতির অঙ্গনে পারতপক্ষে পা বাড়াতেন না, দূষিত রাজনীতির বিষে জর্জরিত সমাজেও দ্বন্দ্ব-বিভাজনের যে হাস্যকর অসঙ্গতির প্রকাশ অহরহ ঘটে তাকেও তিনি বেশ ঘাঁটাতেন না পাছে দলীয় রাজনীতির পচা শামুকে পা কাটে। তাঁর হৃদয়ের ও মননের ঝোঁক ছিল নির্মল হাস্যরসের দিকে। মুশকিল হল বাংলাদেশের সমাজ তো দিনে দিনে নির্মল বাস্তবতা ও সৌন্দর্য সম্পূর্ণ হারিয়েছে। এত ক্লেদ এত আবর্জনা জমেছে যে তাতে নির্মল হাস্যরস শিশুকিশোরদের জগৎ ছেড়ে বয়স্কদের জগতে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে।
এটা যে কোনো সমাজের জন্যে দুর্ভাগ্যের অশনি সংকেত। যে সমাজে নির্মল হাস্যরসের স্থান কেবলই সংকুচিত হতে থাকে, বড়দের জগতে নির্মলতা ও হাস্যরস উভয়ই যখন প্রাসঙ্গিকতা হারায় সে সমাজে তখন কেবল অবক্ষয়ই ঘটে। হায়, যখন দেশে উন্নয়ন চলছে জোরকদমে তখন বাংলাদেশ তার প্রাণের রসদ হারিয়ে ফেলছে। সমাজের এই বিসঙ্গতি নিয়ে এখন কে লিখবেন? এ নিয়ে জরুরি লেখাটি তো ফাহমিদা আপারই লেখার কথা।
বড় বিপদে আছি আমরা। এই বিপদের দিনে মনে পড়ছে ফাহমিদা আপার হাসিমুখ আর অসঙ্গতি তুলে ধরে তাঁর ধারালো হাসির কথাগুলো। সেটুকু থাকলেও দমবন্ধ করা পরিবেশে আমরা একটু হাঁফ ছাড়তে পারতাম। ফাহমিদা আপা অপূরণীয় শূন্যতাই সৃষ্টি করে গেলেন।