হারিয়ে গেছেন আমাদের একজন বীরউত্তম

আবদুল মান্নান

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের টালমাটাল সময়ে দেশের মানুষ বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথার সাথে সাথে দুজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম প্রায় শুনতো। এদের একজন নয় নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল আর অন্যজন টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী। বিদেশি বেতার মাধ্যমের কল্যাণে তাদের শৌর্যবীর্যের কথা প্রায়শ দেশের মানুষ জানতে পারত। এই দু’জন অন্যদের তুলনায় কিছুটা ব্যতিক্রমী ছিলেন এই কারণেই যে তারা ভারতের সহায়তা ছাড়াই বিসত্মীর্ণ এলাকা মুক্ত রেখেছিলেন। যুদ্ধচলাকালীন সম্ভবত সেপ্টেম্বর মাসের দিকে দৈনিক পাকিসত্মান পত্রিকা মেজর জলিলের মাথাভর্তি চুল আর দাড়িভর্তি একটা ছবি প্রকাশ করে তাতে শিরোনাম দেয় ‘হিপ্পি বেশে তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা’। কাদের সিদ্দিকী বা কাদেরিয়া বাহিনীর নাম শোনা গেলেও ১৬ ডিসেম্বরের আগে তাঁর ছবি কখনো প্রকাশিত হয়নি। পনেরই ডিসেম্বর পাকিসত্মানের পূর্বাঞ্চলীয় জিওসি লে. জেনারেল নিয়াজীর সাথে আত্মসমর্পণের বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য ঢাকা সেনানিবাসে আসেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল জেকব। সাথে নিয়ে আসেন কাদের সিদ্দিকীকে। এর আগে ঢাকায় প্রথম প্রবেশকারী মিত্রবাহিনীর জেনারেল গান্ধার্ভ নাগরা নিয়াজীর সাথে প্রাথমিক আলোচনা সেরে ফেলেছেন । জেকব আর নিয়াজী দু’জনই এক সময় ভারতের দেরাদুন সেনা স্টাফ কলেজের ছাত্র ছিলেন। প্রথমে দুই পূর্বপরিচিত বন্ধু করমর্দন করেন। জেনারেল নিয়াজী কাদের সিদ্দিকীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে কাদের সিদ্দিকী করমর্দন করতে অস্বীকার করেন।
কাদের সিদ্দিকীকে প্রথম বিশ্বমিডিয়াতে দেখা যায় ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর, যখন তিনি পল্টন ময়দানে প্রকাশ্যে দিনের বেলায় কয়েক হাজার মানুষের সামনে তিনজন রাজাকারকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেন। আনত্মর্জাতিক মিডিয়াতে এই সংবাদটি অত্যনত্ম নেতিবাচক হিসেবে প্রচারিত হয়। বলা হয় বাংলাদেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরম্ন হয়েছে। এই রকম ঘটনা দেশের অন্যান্য স’ানেও ঘটেছে। খুলনায় দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকেও হত্যা করার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ে গিয়েছিল। কিন’ তার আকুতি শুনে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বাহাত্তর সালের ১০ জানুয়ারি পাকিসত্মানের কারাগার হতে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলে এই ধরনের কর্মকা-ের ইতি ঘটে। তিনি ঘোষণা করেন, কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেন। সকল মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র জমা দিতে তিনি নির্দেশ দেন। টাঙ্গাইলে কাদের সিদ্দিকী ও তাঁর নিয়ন্ত্রিত বাহিনী বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দেয়। বঙ্গবন্ধু কাদের সিদ্দিকীকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর তিনি তাঁকে টাঙ্গাইলের জেলা গভর্নর নিযুক্ত করেন। সম্ভবত কাদের সিদ্দিকীকে প্রথম সংবর্ধনা জানানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুহসিন হল ছাত্র সংসদের পড়্গ হতে। সাথে ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক আবদুল জব্বার। বস’তপড়্গে সে’দিন প্রথমবারের মতো একজন বড় মাপের মুক্তিযোদ্ধা দেখার সুযোগ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিড়্গার্থীর। কাদের সিদ্দিকী ততদিনে একজন কিংবদনিত্ম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সারা দেশে পরিচিত। ততদিনে তিনি বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হয়েছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের প্রতিবাদে কাদের সিদ্দিকী তাঁর যুদ্ধদিনের কয়েকশত সঙ্গী নিয়ে সীমানত্ম পার হয়ে ভারতে চলে যান। প্রতিজ্ঞা করেন তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ না নিয়ে ড়্গানত্ম হবেন না। যুদ্ধ ঘোষণা করেন বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা (তখনও বিএনপি প্রতিষ্ঠা হয়নি তবে খোন্দকার মোশতাককে ড়্গমতাচ্যুত করে সেনা শাসক হয়েছেন) জিয়ার বিরম্নদ্ধে। জিয়া তার অবর্তমানে কাদের সিদ্দিকীকে সামরিক ট্রাইবুনালে তামাশার বিচার করে মৃত্যুদ-ে দ-িত করেন। তাঁর বাহিনীর সদস্যরা সীমানত্ম অতিক্রম করে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর সাথে যু্দ্ধ করতে গিয়ে একাধিকবার পরাসত্ম হয় এবং অনেকে ধরা পড়েন। সম্প্রতি এমন এক যোদ্ধা বিশ্বজিৎ নন্দী কাদের সিদ্দিকীর কাছে এক খোলা চিঠি লিখেছেন। বিশ্বজিৎ সেই সময় বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর বিরম্নদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে ধরা পড়েন এবং সামরিক আদালতে তাঁর মৃত্যুদ- হয়। পরে মৃত্যুদ- রহিত করা হয় এবং সাত বছর পর তিনি ছাড়া পান। তিনি তাঁর খোলা চিঠিতে কাদের সিদ্দিকীর প্রতি দাবি করেছেন তাঁকে যেন তাঁর সেই সাত বছর ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
জিয়ার মৃত্যুর পর আশির দশকে কাদের সিদ্দিকীকে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন জেলায় ‘কাদের সিদ্দিকী স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি নানা স’ানে সভা সমাবেশ করে নিঃশর্তভাবে কাদের সিদ্দিকীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সুযোগ দেওয়ার দাবি করে। শেখ হাসিনা এই দাবির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। এরশাদ পতনের কিছু আগে কাদের সিদ্দিকী দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা তাঁর জামিনের ব্যবস’া করেন এবং নির্বাচনে টাঙ্গাইলের একটি আসন হতে তাঁকে মনোনয়ন দেন । নির্বাচনে আমাদের বঙ্গবীর বিএনপি’র প্রার্থী হুমায়ুন খান পন্নী’র কাছে পরাজিত হন।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা পুনরায় তাঁকে মনোনয়ন দেন এবং এই প্রথমবারের মতো তিনি বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হন। সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি তৎকালিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সাথে টাঙ্গাইলে তাঁর জবরদখলকৃত বাড়ি হতে উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন ২০০১ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নামে একটি পৃথক দল গঠন করেন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয় লাভ করেন। সেই দলে কৃষকও তিনি, শ্রমিকও তিনি, জনতাও তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এই পর্যনত্ম তাঁর দল হতে তিনিই একমাত্র প্রার্থী যিনি কোন সংসদ নির্বাচনে বিজয় লাভ করেছেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তাঁর নির্বাচনী এলাকা টাঙ্গাইল হতে প্রার্থী হয়েছিলেন । ঋণখেলাপি হওযার কারণে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে।
আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ড়্গমতা হতে ফেলে দিতে আর বিএনপিকে বিলুপ্তি থেকে বাঁচাতে গঠিত ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে সম্প্রতি যোগ দিলেন আমাদের বঙ্গবীর। যে কাদের সিদ্দিকী স্বাধীনতার পরপর বিশ্বমিডিয়ায় সংবাদ শিরোনাম হয়েছিলেন প্রকাশ্যে রাজাকার হত্যার জন্য, সেই কাদের সিদ্দিকী তার কাঁধে তুলে নিলেন একাত্তরের ঘাতক দল জামায়াতকে।
সম্প্রতি কাদের সিদ্দিকীর নেতা ড. কামাল হোসেনকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি যাদের সাথে ঐক্য করেছেন তাদের সাথে তো জামায়াতও আছে। তাদের নিয়ে তিনি কী ভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাসত্মবায়ন করবেন ? তিনি সোজা উত্তর দিলেন, তিনি বিএনপি’র সাথে ঐক্য করেছেন জামায়াতের সাথে নয়। জাতির দুর্ভাগ্য যে ড. কামাল হোসেনরা বাংলাদেশের সকল মানুষকে নিম্নশ্রেণির বোকা ভাবেন। মানুষ কিভাবে বিশ্বাস করবে, যে বিএনপি বিশ দলের মোর্চার নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং যে মোর্চার দ্বিতীয় বৃহৎ দল হচ্ছে জামায়াত সেই দলকে বাদ দিয়ে বিএনপি ড. কামাল হোসেনের মতো একজন ফ্লপ রাজনীতিবিদের ঐক্যে সামিল হবেন? জামায়াতের পঁচিশজন প্রার্থী বিএনপি’র ধানের শীষ মার্কা নিয়ে নির্বাচন করছেন। বিএনপি’র একজন বড় মাপের নেতা নজরম্নল ইসলাম খান সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন জামায়াতের মধ্যেও মুক্তিযোদ্ধা আছে । হ্যাঁ আছে, তবে তারা পাকিসত্মানের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছেন। এই বিষয়ে ড. কামাল হোসেন গং কী বলবেন তা জাতি জানতে চায়? মানুষ কী এটা বোঝে না বিএনপি-জামায়াত জোট তাঁকে ছাতা হিসেবে ব্যবহার করছে ? প্রয়োজন শেষে তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে বেশি সময় লাগবে না ।
পাঠকদের একটু পিছনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই। ১৯৮৯ সালে কাদের সিদ্দিকী চট্টগ্রামের প্রথম বিজয় মেলায় বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন। উলেস্নখ্য, বিজয় মেলার জন্ম ওই বছর চট্টগ্রামে। সেই মেলায় আমার সাথে যুগ্ম-আহ্বায়ক ছিলেন ফারম্নখ-ই-আজম বীর প্রতীক। ষোলই আগস্ট চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সামনের মাঠে নির্মিত বিজয়মঞ্চে সন্ধ্যায় মুক্তিযুদ্ধের নায়ক কাদের সিদ্দিকী তাঁর যুদ্ধ দিনের কাহিনী শুনাবেন। সভাপতি আমি। সামনে কম করে হলেও হাজার দশেক মানুষ। সে’দিন বঙ্গবীর প্রায় ঘণ্টাখানেক যুদ্ধ দিনের অসাধারণ সব কথা শুনিয়েছিলেন, বীরত্বের কথা বলেছিলেন। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ভারতীয় বাহিনীর জেনারেল জেকবের সাথে ঢাকা সেনানিবাসের ঘটনাপ্রবাহের কথা শোনাতে গিয়ে বলেছিলেন ‘সেদিন জেনারেল নিয়াজি যখন তার অস্ত্র সমর্পণ করেছিলেন সেখানে আমার বুট ছিল, কোন একজন মেজর জিয়ার বুট নয়।’ সেই কাদের সিদ্দিকী এখন জিয়ার সৃষ্ট বিএনপি’র একজন একনিষ্ঠ ভক্ত এবং তার পূনরম্নজ্জীবন দানে ব্যসত্ম। হারিয়ে গেছেন সেই দিনের সেই সন্ধ্যার আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অমিততেজ নায়ক কাদের সিদ্দিকী।
কাদের সিদ্দিকীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯৪ সালে, যখন তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন ১৫ আগস্ট টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেয়ার জন্য। এক কথায় রাজি। সে সময় কাদের সিদ্দিকী প্রতি বছর জাতীয় শোক দিবস উপলড়্গে টুঙ্গিপাড়ায় তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান করতেন। দিনে কাঙালি ভোজের ব্যবস’া হতো। রাতে গিমাডাঙ্গা হাইস্কুল মাঠে বসতো আলোচনা অনুষ্ঠান। সভাপতিত্ব করতেন বঙ্গবন্ধুর দাফন কাফনের সাথে জড়িত একজন অথবা বঙ্গবন্ধুর সমবয়েসি কেউ। তখন কাদের সিদ্দিকী একজন কিংবদনিত্ম ।
কিন’ কী দুঃখের বিষয়, সেই বঙ্গবীর এখন গলায় গামছা পেঁচিয়ে বিএনপি-জামায়াতের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে একজন বিড়াল শাবক হয়ে গিয়েছেন । জাতির জন্য এটি অত্যনত্ম লজ্জাজনক। হারিয়ে গেছেন আমাদের সেই বঙ্গবীর যাঁকে এ’দেশের মানুষ তাদের মাথায় তুলে নিয়েছিলেন । বীর উত্তম, মুজিব কোট, ধানের শীষ আর গামছা এখন একাকার। অপরাজনীতি মানুষকে যে খলনায়কে পরিণত করতে পারে, আমাদের অতিপরিচিত বীর উত্তম তার একটি উজ্জল দৃষ্টানত্ম । এটি জাতির জন্য লজ্জার।