হারিরির পদত্যাগ : রিয়াদে পরিবর্তনের হাওয়া

হোসাইন আনোয়ার

সবার চোখ এখন সৌদি আরবের দিকে। কী হচ্ছে সৌদি আরবে। একই দিন তিন তিনটি বোমা ফুটেছে সৌদি আরবে। যার কেন্দ্রস্থল সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। গত ২৮ অক্টোবর ঘটে প্রথম বোমাটির বিস্ফোরণ। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির জীবনের শঙ্কা প্রকাশ করে পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। নিজ দেশ ছেড়ে সৌদি রাজধানীতে এসে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার ব্যাখ্যা হচ্ছে, লেবাননের পরিস্থিতি অনেকটা তার পিতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরির হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতির মতো। তিনি আরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ইরান আরব বিশ্বকে ধ্বংস করে দিতে চাইছে। আর হিজবুল্লাহর অস্ত্রগুলো সিরিয় ও লেবাননীয়দের দিকেই তাক করা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তিনি কী মূলত মৃত্যুর ভয়েই পদত্যাগ করেছেন, নাকি এখানে অন্য কোনো রাজনীতি কাজ করছে। এককথায় এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিন্তু সহজ নয়।
দ্বিতীয় বোমাটি পড়েছে সন্ধ্যার পরপরই। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশেই বড় ধরণের বিকট একটি বিস্ফোরণের শব্দ। প্রকাশিত খবরে বলা হলো, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দটি ছিল ইয়ামেনের প্রতি বিদ্রোহীদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের শব্দ। অভিযোগ রয়েছে, ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ইয়ামেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের মিত্র, যাঁর আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে মৈত্রী রয়েছে।
ইয়ামেনে হুতি বিদ্রোহীদের দমনে দুই বছরের বেশি সময় ধরে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে সৌদি আরব। ধারণা করা হচ্ছিল হুতিরা হয়তো দুর্বল হয়ে আসছে। কিন্তু না, শনিবারের ওই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনাটি সত্য হয়ে থাকলে, ইয়ামেনের যুদ্ধের এখুনি সমাপ্তির ঘোষণা যে আসছে না, একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
আর তৃতীয় বোমাটি(!) ফাটল মধ্যরাতের কিছু আগে। আর এটি ফাটালেন স্বয়ং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (৩২)। যাকে চলতি বছরের শুরুর দিকে সৌদি সিংহাসনের উত্তরাধিকার মনোনীত করেন বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ।
উত্তরাধিকারী মনোনীত হওয়ার পর গত ২৪ অক্টোবর রিয়াদে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করেন, তার দেশ মধ্যপন্থি ইসলামের পথে ফিরে যাবে। তিনি আরও ঘোষণা করেন সৌদি আরব আগে এই আদর্শেই পরিচালিত হতো এবং সৌদি আরব সব ধর্ম ও পুরো বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
এর পরপর তিনি যা করে বসলেন, তা একেবারেই চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা। তিনি এক ডিক্রির মাধ্যমে ১১ জন রাজপুত্র, চারজন বর্তমান মন্ত্রী এবং ১২ জন সাবেক মন্ত্রীকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আটক করে সমগ্র বিশ্বে আলোচনার ঝড় তুললেন। আটকদের তালিকায় প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহর কয়েক জন সন্তানও রয়েছেন।
গত জুলাই থেকেই প্রাসাদের ভেতরের অস্থিরতা নিয়ে গুজব গুঞ্জন ডালপালা ছড়াচ্ছিল। গুঞ্জন ছিল প্রাসাদের ভেতরেই তার বিরোধীরা বিদ্রোহের আগুন ছড়াচ্ছে। আগুনের লেলিহান শিখা ছড়াবার আগেই তিনি কামান দেগে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেছেন বলে আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। তবে এই আগুনের লেলিহান শিখার তাপে প্রিন্স সালমানের গায়েও যে ফোস্কা পড়তে পারে এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক বাজারে শেয়ারের দাম পড়ছে হু হু করে। বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের ব্যাপক দরপতনে কয়েক বছর ধরেই রাজস্ব ঘাটতিতে ভুগছে সৌদি আরব। এর উপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে ইয়ামেন হামলায় সমরাস্ত্র ক্রয়ে বিপুল অঙ্কের ব্যয়। এ অবস্থার উত্তরণে দেশকে তেল নির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে আনার রূপকল্প ২০৩০ ঘোষণা করেছিলেন যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান। কিন্তু সবকিছুই যেন ভেস্তে যেতে বসেছে, দেশটির দুর্নীতির দমনের নামে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের ঘটনায়।
সম্প্রতি দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে আটক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ধনী ও বিলিয়নেয়ার প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মন্ত্রীদের কার্লটন হোটেলে আটক রাখা হয়েছে।
সৌদি আরবের ৭০ শতাংশ মানুষের বয়স এখন ৩০ বছরের নিচে। যাদের মধ্যে এখন ২৫ শতাংশ মানুষ বেকার। প্রায় ২লাখ মানুষ এখন দেশের বাইরে পড়াশুনা করছে। এদের মধ্যে আবার ৩৫ হাজার মানুষ প্রতিবছর দেশে ফিরে এসে বেকার জীবনযাপন করছে। সৌদি আরবের রাজস্ব আয়ের ৯০ শতাংশ আসে তেল রপ্তানি থেকে। তেলের দর এখন ১১৪ ডলার থেকে ৫০ ডলারের নিচে নেমে আসায় দেশটির রাজস্ব আয়ে ‘ধস’ নামে। সৌদি পরিসংখ্যান দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে প্রথম প্রান্তিকে সৌদি আরবের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ০.৫ শতাংশ। এ প্রান্তিকে জিডিপি দাঁড়িয়েছে ৬৪৩ বিলিয়ন রিয়াল (১৭০ বিলিয়ন ডলার)। যদিও এক বছর আগে এ সময়ে জিডিপি ছিল ৬৪৬.৪ বিলিয়ন রিয়াল।
অর্থনীতির এমন গুরুতর অবস্থার মধ্যেই বাদশাহ সালমানের ৩২ বছর বয়সী সন্তান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) এর বর্তমান চমক রাজনীতিতে কি কোনো পরিবর্তন আনবে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই পরিবর্তনকে সমর্থন করেছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ।
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ক্ষমতার লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী হারিরির পদত্যাগ। লেবাননের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সরকার গঠনের আহবান পাওয়ার এক বছরের মাথায় তিনি পদত্যাগ করলেন। তাও আবার রিয়াদে বসে। এমন কি লেবাননে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করলেন না। হিজবুল্লাহ ও ইরানের প্রভাব হ্রাসে ব্যর্থতার জন্য প্রধানমন্ত্রী হারিরির কড়া সমালোচনার পরপরই, হারিরি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। সৌদি বাদশাহ সালমান ও সিংহাসনে উত্তরাধিকারী যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের বিরুদ্ধে আপোসহীন লড়াই শুরু করেছিলেন। যে কারণে হারিরির মন্ত্রিসভায় হিজবুল্লাহ সদস্যদের উপস্থিতি তারা কোনো মতেই সহ্য করতে পারছিল না।
হারিরি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সৌদি আরব এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিল। হারিরির জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার ঘোষণা লেবাননের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছিল। কিন্তু তার জন্য হিজবুল্লাহকে তাকে ছাড় দিতে হয়েছে। মন্ত্রিসভায় হিজবুল্লাহকে স্থান দিতে হয়েছে। হিজবুল্লাহ ছাড় দেওয়া মানে, কার্যত ইরানকেই ছাড় দেওয়া। যা সৌদি আরব কোনো মতেই ‘হজম’ করতে পারছিল না। তাই ধমক দিয়েই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। হারিরির পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক টুইটার বার্তায় লিখলেন, হারিরির পদত্যাগ ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার একটি চূড়ান্ত ডাক।
সৌদি যুবরাজ এর দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং ভিশন ২০৩০ প্রশ্নের সম্মুখিন হতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। তারা আরও মনে করছেন, উচ্চাভিলাষী এই যুবরাজ দেশটির রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নিজের কর্তৃত্বের ছাপ রাখতে চাইছেন। তাই কায়দা করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শুরু করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো এভাবে তিনি কতদিন চালাবেন? এ প্রশ্নের উত্তর তাকেই খুঁজতে হবে। তা না হলে তিনি হয়তো পথ হারাবেন।

লেখক : কলামিস্ট