হাবিলদারের বিদ্রোহ

গোলাম মুরশিদ

মহাযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে থেমে গিয়েছিলো ১৯১৮ সালের ১১ই নভেম্বর। তারপরও ৪৯ নম্বর বঙ্গবাহিনীকে টিকিয়ে রাখা হয়েছিলো সতর্কতা হিসেবে। তবে সৈন্যদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো যে, বাহিনীর মেয়াদ শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে। বেশির ভাগ কর্মকর্তারা বেশির ভাগই চলে যেতে থাকেন। তারপর ১৯২০ সালের মার্চ মাসে এ বাহিনীকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়। বেকার নজরুল তখন অন্যদের সঙ্গে ঘরমুখো হলেন। সে সময়ে তিনি ছিলেন এক অপরিণত যুবক; উচ্ছ্বসিত তরুণ – ভবিষ্যতের কথা ভাবার চেয়ে বর্তমান নিয়ে মেতে থাকতে পছন্দ করেন; বন্ধুদের নিয়ে হৈচৈ করতে ভালোবাসেন। এই বৈশিষ্ট্য তাঁর স্বভাবের মধ্যেই ছিলো। পরেও তাঁর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এর প্রায় ন মাস আগে সৈন্যবাহিনীতে পদোন্নতি পেয়ে তিনি হাবিলদার হয়েছিলেন। বাহিনী ভেঙে গেলেও, নিজের সেই ‘হাবিলদার’ পদবী নিয়ে তিনি ছিলেন রীতিমতো গর্বিত। এই উপাধি পাওয়ার পর তাঁর দুটি রচনা সওগাত পত্রিকায় আর বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় চারটি গল্প-কবিতা প্রকাশিত হয়েছিলো। সবগুলোতেই নামের আগে পদবী লিখেছিলেন ‘হাবিলদার’।১ (সওগাতে প্রথমে ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ যখন প্রকাশিত হয় আগের বছর মে-জুন মাসে, তখন নামের আগে হাবিলদার পদবী ছিলো না, কারণ তখনও তিনি হাবিলদার হননি।) অন্তরে এবং বাইরে সেই ফৌজী পরিচয় নিয়েই তিনি কলকাতায় ফিরেছিলেন। গৌরবজনক বিবেচনা করে উর্দিও পরেছিলেন হাবিলদারের, যদিও চৈত্র মাসের কলকাতার গরম আবহাওয়া সে পোশাকের জন্যে খুব উপযোগী ছিলো না।
নিজের নামের আগে সেনাবাহিনীর পদবী লিখে অথবা উর্দি পরে তিনি যে প্রকারান্তরে ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে নিজের আনুগত্য প্রকাশ করছেন, এ সম্পর্কে তিনি তখন সচেতন ছিলেন বলে মনে হয় না। সত্য বটে, করাচিতে থাকার সময়ে বলশেভিক বিপ্লব এবং ‘লাল বাহিনী’র প্রতি তিনি তাঁর প্রগতিশীল মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু স্বদেশের পরাধীনতার প্রতি তাঁর মনোভাব কেমন ছিলো, তা তাঁর তখনকার কোনো রচনা অথবা কার্যের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে এ ছিলো তাঁর বাহ্যিক এবং রাজনৈতিক পরিচয়।
আর, তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় খুঁজলে দেখতে পাই, তিনি তখন অবধি পাঁচটি ছোটোগল্প প্রকাশ করেছিলেন – যেগুলো ছিলো কমবেশি আত্মজৈবনিক। সৈন্যবাহিনীতে যোগদানের আগেকার এবং বাহিনীতে থাকার সময়কার বাস্তব ঘটনা এবং কল্পনার মিশেল দিয়ে তিনি লিখেছিলেন এসব গল্প। বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে না-গিয়েই রণাঙ্গনের যেসব গল্প লিখেছেন, সেগুলো তাঁর অসাধারণ কল্পনাশক্তির পরিচয় দেয়। স্রেফ কল্পনাবলে তিনি যুদ্ধের ছবিকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। অনেকেই মনে করেন যে, এগুলো তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা। নৌশেরা হয়ে করাচিতে যাওয়া থেকে আরম্ভ করে মেসোপটেমিয়া এবং পশ্চিম রণাঙ্গনের ভের্দুনে যুদ্ধ করার বর্ণনা সবই বাস্তব বলে মনে হয়। তবে এ সময়ে তিনি যে-কটি তুচ্ছ কবিতা লিখেছেন, সে তুলনায় তাঁর গল্পগুলো বহু গুণে সার্থক। বস্তুত, তখন তাঁর মধ্যে প্রযত্ন লক্ষ করি গল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশের। এমন কি, ঔপন্যাসিক হিসেবে নিজেকে প্রকাশের স্বপ্নও ছিলো তাঁর দু চোখে। তিনি কলকাতায় একটা গোটা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি নিয়ে এসেছিলেন সঙ্গে করে। এ ছাড়া, আগেই লক্ষ করেছি, করাচিতে থাকা কালে তিনি একটি বিতর্কমূলক প্রবন্ধও লিখেছিলেন – ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’। বোঝা যায়, তখন তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিলো ছোটোগল্পকার এবং ঔপন্যাসিক হবার; এমন কি, প্রাবন্ধিক হবার।
কবি? কয়েকটা কবিতা লিখলেও, তখন তিনি কি ভেবেছিলেন যে, তিনি কবি হবেন অথবা হতে পারবেন? বলা মুশকিল। অন্তত, সওগাত আর সবুুজ পত্রের সম্পাদকদ্বয় তাঁর কবি হওয়ার স্বপ্নের ওপর খানিকটা ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিয়েছিলেন। তবে লেটোর দলে থাকার সময়ে পালা লিখে, স্কুলে থাকার সময়ে শিক্ষকদের বিদায় উপলক্ষে পদ্যে বিদায়-অভিনন্দন লিখে এবং করাচিতে থাকার সময়ে সাময়িক পত্রিকায় তিনটি পদ্য প্রকাশ করে তিনি তাঁর মনের মধ্যে এ স্বপ্নকে লালন করেছিলেন বৈকি! এ ক্ষেত্রে তাঁর সম্ভাবনা তিনি অবশ্য তখনও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি। তিনি যে-কবিতা তিনটি প্রকাশ করেছিলেন, তার মধ্যে প্রথমটি ছিলো সত্য-ঘটনা-নির্ভর একটি নাতিদীর্ঘ পদ্য – ‘মুক্তি’; দ্বিতীয়টি ব্যঙ্গ-কবিতা – বারবার পত্রিকায় পাঠানো সত্ত্বেও তাঁর কবিতা প্রকাশিত না-হওয়ার বিষয়টিকে অবলম্বন করে রচিত একটি হাসির কবিতা – ‘কবিতা-সমাধি’। তৃতীয়টি কবিতা হলো ইরানী কবি হাফিজের ছ লাইনের ছোট্টো একটি কবিতার অনুবাদ – ‘আশায়’। এ কবিতাগুলোর মান উল্লেখযোগ্য ছিলো না। তাঁর কবি-জীবনের পড়ন্ত বেলার আগে পর্যন্ত এ কবিতাগুলো তিনি কোনো কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেননি। তা থেকে মনে হয়, এ কবিতাগুলোর কাব্যমান সম্পর্কে তিনি নিজেও বিশেষ আশাবাদী ছিলেন না।২
বিষয়বস্তু ছাড়াও তাঁর মানসিকতার কিছু পরিচয় পাওয়া যায় করাচি থেকে পাঠানো তাঁর রচনাসমূহ থেকে। যেমন, কোন্‌্‌ কোন্‌্‌ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো তাঁর রচনা কটি, এসব লেখায় তাঁর ভাষার বৈশিষ্ট্য কী, এগুলোর চরিত্রগুলো কারা ইত্যাদি থেকে। ‘আশায়’ অর্থাৎ হাফিজের অনুবাদ-কবিতাটা তিনি পাঠিয়েছিলেন সবুজপত্রে। কিন্তু তাঁর আশা ভঙ্গ করে পত্রিকার সম্পাদক কবিতাটি প্রকাশের জন্যে অমনোনীত করেন। তখন এ পত্রিকার কর্মচারী পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের দৌলতে সেই অমনোনীত কবিতাটিই ছাপা হয়েছিলো প্রবাসীতে৩, যে-পত্রিকা ছিলো মূলধারার অভিজাত পত্রিকা। এ পত্রিকার পৌষ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৯) এ কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পরের মাসেই নজরুল কদিনের ‘হোম লীভে’ বেড়াতে আসেন কলকাতায়। প্রবাসীতে কবিতা প্রকাশিত হওয়া ছিলো তাঁর কলকাতায় বেড়াতে আসার উপরি পাওনা। তাঁর বাকি কবিতা দুটি প্রকাশিত হয়েছিলো মুসলমানদের পরিচালিত সাময়িকীতে – বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা এবং সওগাতে।
বেছে বেছে লেখাগুলো মুসলিম পরিচালিত পত্রিকায় পাঠানোর কারণ কি? এর একটা কারণ হলো, খুব সম্ভব তিনি মনে করেছিলেন যে, তাঁর রচনার সাহিত্যিক মান এমন উঁচু নয়, যাতে তা অমুসলমান-পরিচালিত প্রধান ধারার সাময়িকপত্র – সবুজপত্র, প্রবাসী, ভারতবর্ষ, মানসী ও মর্মবাণী ইত্যাদিতে প্রকাশিত হতে পারে। তিনি ভেবে থাকবেন, এবং ভেবে থাকলে যথার্থভাবেই ভেবেছিলেন যে, তাঁর লেখাগুলো মুসলিম-পরিচালিত পত্রিকায় পাঠালে সেগুলো প্রকাশের জন্যে বিবেচিত হবে অধিকতর সহানুভূতির সঙ্গে। এসব পত্রিকার একজন সম্পাদকের কথা থেকে জানতে পাই যে, তিনিও নজরুলের পাঠানো অনেক লেখাই প্রকাশের জন্যে মনোনীত করতে পারেননি। এমন কি, নজরুল যখন কলকাতায় ফিরে আসার অব্যবহিত পরে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন, তখনও তিনি তাঁর কাছে আরও লেখা চাননি।
তাঁর লেখা তখনো কাঁচা। তাই তাঁর লেখা পাবার জন্যে তখন বিশেষ আগ্রহ দেখালাম না। কারণ এর আগে অনেক লেখাই তো তাঁর সওগাতের জন্যে মনোনীত হয়নি। নজরুল যে একদিন এতো বড় কবি হবেন, সেদিন তা মনে আসেনি। তাহলে সেই সব অপ্রকাশিত লেখা রেখে দিলে আজকের দিনে সেগুলি গবেষণার বিষয় হতো। তাঁর প্রথম জীবনের উচ্ছ্বাসে ভরা প্রকাশ ব্যাকুলতার সংগে আজকের সাহিত্যিক সমাজের পরিচয় ঘটতো।৪
এই সম্পাদক – মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের লেখা থেকে অনুমান করা যায় যে, নজরুল কেবল সওগাত পত্রিকায় নয়, অন্য পত্রিকায়ও লেখা পাঠিয়ে থাকবেন, যা প্রকাশিত হয়নি। তবে, সত্যি বলতে কি, তাঁর এসব অমনোনীত রচনা একেবারে বিফলে যায়নি, বরং এসব মক্‌্‌শো করতে করতেই তিনি গল্পকার এবং কবি হয়ে উঠেছিলেন। লক্ষণীয় যে, তিনি প্রথমেই সবুজপত্রে কবিতা পাঠাননি, পাঠিয়েছিলেন তাঁর দুটি কবিতা বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা এবং সওগাতে প্রকাশিত হওয়ার পর অর্থাৎ তাঁর কবিতা প্রকাশের উপযুক্ত – এই প্রমাণ পাওয়ার পর।
কেবল কাঁচা লেখা বলেই নয়, করাচিতে থাকা-কালে যে-গল্পগুলো তিনি রচনা করেছিলেন, সেগুলোর পাত্রপাত্রী ছিলো মুসলমান। তিনি ভালো করেই জানতেন যে, তাঁর নিজের মুসলিম নাম অথবা মুসলিম নামধারী নরনারীদের নিয়ে রচিত গল্প – কোনোটাকেই মূলধারার পত্রপত্রিকা স্বাগত জানাবে না। সুতরাং তিনি তাঁর রচনা প্রকাশের জন্যে মুসলিম-পরিচালিত পত্রিকাই বেছে নিয়েছিলেন। চরিত্রগুলোর নামগুলো বদলে দিয়ে সেগুলো অমুসলমান পরিচালিত পত্রপত্রিকায় পাঠালেন কেন – এ প্রশ্ন অবশ্য তোলা যায়।
তাঁর এই রচনাগুলোর ভাষা বিচার করলে দেখতে পাই যে, তাঁর গদ্য উচ্ছ্বাসপূর্ণ, কোথাও কোথাও চটুল এবং প্রচুর আরবি-ফারসি-প্রভাবিত। এসব আরবি-ফারসি শব্দের মধ্যে অনেকগুলো আবার এমন, যা সচরাচর ব্যবহৃত হয় না – যা প্রায় অপ্রচলিত। তিনি যে একজন পাঞ্জাবী মৌলবি সাহেবের সাহায্য নিয়ে এ সময়ে ফারসি শিখছিলেন – এসব শব্দ এবং তাদের মূলানুগ বানান থেকেও তার পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। আরবি-ফারসি শব্দ ছাড়াও, তাঁর ভাষায় প্রচুর হিন্দী/উর্দু প্রয়োগ অথবা অনুবাক্য লক্ষ করা যায়। একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক:
যার চালচলন শরিফের মত সেই ত আশরাফ। খোদা কিয়ামতের দিনে কখ্‌্‌খনো এমন বলবেন না যে, তুমি সৈয়দ সাহেব, তোমার আবার পাপ পুণ্যি কি, তোমার নিঘ্‌্‌্‌ঘাত বেহেশ্‌ত আর তুমি হালগজ্জা শেখ, অতএব তোমার সব সওয়াব বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে, কাজেই তোমার কপালে ত জাহান্নাম ধরাবাঁধা।৫
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তাঁর গদ্যরচনায় এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করলেও, তাঁর তখনকার কবিতার ভাষা ছিলো নির্ভেজাল বাংলা। এমন কি, হাফিজের অনুবাদ করতে গিয়েও আরবি-ফারসি শব্দের আধিক্য তো দূরের কথা, ‘সবুজ’ শব্দটি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেননি।
এই হলো সৈনিক নজরুলের সৃজনশীলতার মোটা দাগের পরিচয় – সংক্ষিপ্ত এবং নাতি-উচ্চ মান-বিশিষ্ট। কিন্তু এই অখ্যাত যুবকই কলকাতায় ফিরে আসার এক বছর ন মাসের মাথায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে সবাইকে বিস্ময়ে অভিভূত করে দিয়েছিলেন এবং বাংলা সাহিত্য-গগনে সহসা আবির্ভূত হয়েছিলেন বিশাল এক ধূমকেতুর মতো। এই কবিতাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁকে স্থায়ী আসন দান করেছিলো। প্রশ্ন হচ্ছে: এতো অল্প সময়ের মধ্যে এই অত্যাশ্চর্য এবং অতি-অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটলো কী করে? এর কোনো সুনির্দিষ্ট, অথবা চোখে-দেখা-যায় এমন সুস্পষ্ট উত্তর নেই। এর একমাত্র ব্যাখ্যা হলো: তিনি সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তাই সাধারণ মানুষের মাপকাঠি দিয়ে তাঁর বিচার করলে সে হিসেব মিলবে না। তিনি ছিলেন এক অসামান্য প্রতিভা। সাধারণ মানুষ একটা জিনিশ যেভাবে শেখে, যতো দিনে শেখে, যতোটুকু শেখে – একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি সেভাবে, ততোদিনে অথবা ততোটুকু শেখেন না। শেখার জন্যে তাঁকে স্কুল-কলেজেও যেতে হয় না। প্রতিভাবান ব্যক্তিরা দেখে শেখেন, শুনে শেখেন, পরিবেশ থেকে শেখেন, ভেবে শেখেন। নজরুলও অনেকটা সেভাবেই শিখেছিলেন। নয়তো কলকাতায় ফিরে আসা পর্যন্ত তাঁর অর্জন গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না। প্রতিভাবান ছিলেন বলেই তিনি রাতারাতি কবি হয়ে উঠেছিলেন, সঙ্গীত-শাস্ত্রজ্ঞ হয়েছিলেন। এক কথায়, তিনি যা হয়েছিলেন, তা হয়েছিলেন এই অ-সাধারণ পথ ধরে।
প্রথমেই তাঁর সামাজিক এবং ধর্মীয় পরিচয়ের বিবর্তন কী করে হলো, সেদিকে নজর দেওয়া যাক। তিনি যখন করাচি থেকে ফিরে আসেন, তখন নিজের মুসলিম-পরিচয় সম্পর্কে তিনি ছিলেন ষোলো-আনা সচেতন। আগেই বলেছি, তাঁর গল্পগুলোর পাত্রপাত্রীরাও ছিলো মুসলিম নামধারী। যদিও স্বীকার করতে হবে যে, তাঁর মুসলিম-স্বরূপ প্রকাশ পেলেও, তাঁর কোনো রচনাতেই বিদ্বেষপূর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ছাপ ছিলো না। তিনি আদৌ মুসলমান-ঘেঁষা ছিলেন না। স্কুলে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা ছিলো অতি নগণ্য। তাঁর স্কুল-জীবনের দিকে তাকালে তাঁর কোনো মুসলমান বন্ধুর নাম খুঁজে পাই না।৬ বরং তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিশেবে নাম জানা যায় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের, যিনি ছিলেন হিন্দু; আর শৈলেন্দ্রকুমার ঘোষের, যিনি ছিলেন খ্রিস্টান।
স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে হিন্দুরা যেমন ছিলো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ, সৈন্যবাহিনীতেও হিন্দুদের সংখ্যা ছিলো তেমনি – মুসলমানদের তুলনায় বহু গুণ বেশি। মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো শতকরা মাত্র সাত/আটজন।৭ তাই বাহিনীতে থাকার সময়ে যাঁদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়েছিলো, তার মধ্যে একজন মুসলমানের কথাই আমরা জানি – তাঁর উপরওয়ালা – ভাণ্ডারের কর্মকর্তা মুনিরুদ্দীন। এ ছাড়া, তাঁর বন্ধুদের মধ্যে কেউই মুসলমান ছিলেন বলে জানা যায় না। তাঁর পরিচিতদের পরিধি এ রকম হওয়া সত্ত্বেও, এ কথা সঠিক যে, তিনি গল্পগুলো লিখেছিলেন মুসলিম চরিত্র অবলম্বনে। কেবল তাই নয়, সেগুলোর ভাষাতেও মুসলমানী ছাপ ছিলো অত্যন্ত স্পষ্ট। কলকাতায় ফিরে তিনি প্রথম দিকে যেসব গল্প লিখেছেন, সেগুলোও মুসলিম পাত্রপাত্রীদের নিয়ে। (অসমাপ্ত)

এমন কি, করাচিতে থাকার সময়ে যা লক্ষ করিনি, কলকাতায় ফিরে এসে কোনো কোনো কবিতায়ও তিনি এন্তার আরবি-ফারসি-হিন্দী শব্দ এবং অনুবাক্য সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ অন্তরের অন্তস্তলে তাঁর মুসলমান পরিচয় তখনও পর্যন্ত পাকাপোক্ত ছিলো। কিন্তু তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং মন-মানসিকতা দ্রুত বদলে গিয়েছিলো।
আসলে, কলকাতায় আসার ফলে তাঁর বিচরণের ক্ষেত্রটাই আমূল পাল্টে গিয়েছিলো। সেনা-ছাউনিতে সহকর্মীদের উর্দি-বুট-কম্বল সরবরাহ করার বদলে এ সময় তিনি কলম নিলেন হাতে। তাঁর ওঠা-বসা এবং বসবাস – এক কথায় – তাঁর জীবনযাত্রায় লক্ষ করা যায় ব্যাপক এবং আমূল পরিবর্তন। আগের আড়াই বছর তিনি ছিলেন সুদূর করাচিতে, সৈন্যবাহিনীর কড়া শৃঙ্খলা এবং শাসনের মধ্যে। অপর পক্ষে, কলকাতায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবনের দৃশ্যপটের পরিবর্তন হলো। শৃঙ্খলার শিকলটা ভেঙে পড়লো, শুরু হলো ঢিলে-ঢালা জীবন, মন যখন যেমন চায়, তেমন মুক্ত-স্বাধীন-বাধা-বন্ধনহীন জীবন। সৈন্যবাহিনীতে তাঁর সময় কাটতো বরাদ্দ দায়িত্ব পালন আর অবসর সময়ে সাহিত্য চর্চা করে। এ ছাড়া, হৈচৈ করেও সময় কাটতো তাঁর। হৈচৈ হতো বেশির ভাগ স্বল্পশিক্ষিত সহকর্মীদের সঙ্গে। কিন্তু কলকাতায় তাঁর মেলামেশা এবং বসবাস শিক্ষিতদের মধ্যে। সেই আড্ডায় তিনি মাথা নীচু করে অন্যদের কথাবার্তা নীরবে শুনে যাবার পাত্র ছিলেন না, কথার পিঠে কথা বলা, অন্যের কথায় ফোড়ন দেওয়া – এ ছিলো তাঁর স্বভাব। শিক্ষিত এবং তাঁর চেয়ে বেশি বয়সী লোকেদের সঙ্গে চলাফেরা করা বস্তুত তাঁর জন্যে একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিলো। তাঁরও দ্রুত শিক্ষিত হয়ে উঠতে হলো।
তিনি যখন তাঁর বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মেসে উঠেছিলেন, তখন মেসের বাসিন্দাদের মনোভাব কতোটা বিরূপ হয়েছিলো, নজরুল তা বলেছিলেন কলকাতায় যে-জনা চারেক লোককে চিনতেন, তাঁদের একজন – পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে:

তারপর যখন শৈলজা ‘নুরু নুরু’ বলে ডাকছে আমায়, তারা আমার নাড়ীনক্ষত্রের খোঁজ নিতে শুরু করে দিল। … যখন ওরা আবিষ্কার করল আমি মুসলমান, তখন ওদের মেজাজ যা হল, তাতো বুঝতেই পারো। দল বেঁধে ঘর চড়াও হল, রুচিবোধের সীমা ছাড়িয়ে কোরাস-কণ্ঠে বলে উঠল, আপনি মশায়, মুখুজ্যে বামুনের ছেলে হয়ে লেড়ের কাছে বোন বিয়ে দিতে পারেন, আমরা কিছু বলব না, কিন্তু জেনেশুনে আপনি আমাদের জাতধর্ম নষ্ট করছেন, এ জন্যে আপনাকে কি করা উচিত জানেন?৮
পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় রাঁধুনীর কথা উল্লেখ করেননি। কিন্তু অন্য সূত্র থেকে খবর পাওয়া যায় যে, রাঁধুনী যখন জানলো, নজরুল মুসলমান, তখন তাঁর এঁটো বাসন-কোসন ধুতে রাজি হলো না।৯ এর আগেও নজরুল এমন সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন কিনা, আমাদের জানা নেই। কিন্তু এবারে পড়লেন। তখন তিনি শৈলজানন্দকে সঙ্গে করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন নিজের বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে।১০ এর ফলে তাঁর মনে হিন্দু-বিদ্বেষ তৈরি হতে পারতো, কিন্তু তেমনটা হয়েছিলো বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে জাতিভেদ এবং ছোঁয়াছুঁয়ির নিন্দা জানিয়ে তিনি কবিতা ও গান লিখেছিলেন।
নজরুল অতঃপর আশ্রয় পেলেন একটি মুসলিম মেসে। এর পেছনে একটা ইতিহাস আছে। সৈন্যবাহিনী থেকে স্থায়ীভাবে কলকাতায় ফিরে আসার মাস দুয়েক আগে – জানুয়ারি মাসের (১৯২০) শেষ দিকে১১ তিনি কলকাতায় এসেছিলেন হোম-লীভে (বাড়ি বেড়িয়ে যাবার ছুটিতে)। তখন তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার অন্যতম কর্মচারী মুজফ্‌ফর আহ্‌্‌মদের সঙ্গে পরিচয় করে গিয়েছিলেন। তার কারণ মুজফ্‌ফর আহ্‌্‌মদ তাঁর ‘মুক্তি’ কবিতাটি ছেপেছিলেন, আর ছেপেছিলেন দুটি গল্প ‘হেনা’ এবং ‘ব্যথার দান’।১২ মুুজফ্‌ফর থাকতেন ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রীটে – ‘বঙ্গীয় মুুসলমান সাহিত্য সমিতি’র অফিসে। তখনই নজরুলকে মুজফ্‌ফর আহ্বান জানিয়েছিলেন যে, সৈন্যবাহিনী থেকে কলকাতায় ফিরে তিনি যেন তাঁর মেসে ওঠেন। সেই আহ্বানের সূত্র ধরেই নজরুল এখন শৈলজানন্দকে সঙ্গে করে মালপত্র নিয়ে সোজা চলে এলেন মুজফ্‌ফর আহ্‌্‌মদের আস্তানায়, তাঁকে আগে থেকে কিছু না-জানিয়েই।১৩ এই আস্তানায় মুজফ্‌ফরের পাশের কক্ষে থাকতেন শান্তিপুরের (কবি) মোজাম্মেল হকের পুত্র আফজালুল হক। তিনি একটা বইয়ের দোকানের আংশিক মালিক ছিলেন১৪ এবং মোসলেম ভারত নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশের জোগাড়-যন্ত্র করে ফেলেছিলেন। পত্রিকার প্রথম সংখ্যার পাণ্ডুলিপিও পাঠিয়েছিলেন ছাপাখানায়। পরে তিনি নজরুলের বইয়ের প্রকাশকে পরিণত হন।
এই একই ঠিকানায় এর অব্যবহিত পূর্বে মুজফ্‌ফর আহ্‌্‌মদের সঙ্গে থাকতেন মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আর আফজালুল হকের সঙ্গে থাকতেন কাজী আবদুল ওদুদ। অন্যরাও থাকতেন বিভিন্ন সময়ে। মোট কথা, ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রীট ছিলো শিক্ষিত মুসলমান যুবকদের একটি আস্তানা। তবে মুসলমানদের আস্তানা হলেও, সেটা সাম্প্রদায়িকতাপূর্ণ আবাস ছিলো না। সেটা ছিলো হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সাহিত্যিকদের আড্ডা।১৫ সেই আড্ডাতেই ঠাঁই হলো নজরুলের। প্রথম রাতেই সেখানে চা পান১৬ আর গানের আড্ডা বসলো।
দুই-একদিন মুজফ্‌ফর আহ্‌্‌মদের মেসে থাকার পর দিন সাতেকের জন্যে চুরুলিয়ায় বেড়াতে যান নজরুল। সেখান থেকে কোথায় যান, পুরোনো বন্ধুদের খোঁজে রানীগঞ্জে গিয়েছিলেন কিনা – এসব খবর কোথাও লেখা নেই। তবে গেছেন বলেই মনে হয়। রানীগঞ্জ অথবা আসানসোল হয়েই তো চুরুলিয়ায় যেতে হয়। নজরুল যে-তরুণীর চুলের কাঁটা নিয়ে করাচি গিয়েছিলেন, সেই তরুণী তখনও রানীগঞ্জে ছিলেন কিনা, কে জানে! না-থাকাই সম্ভব। বিয়ে হয়ে যাবার কথা। যা জানা যায়, সে হলো: কোনো কারণে মায়ের সঙ্গে নজরুলের মনোমালিন্য হয়েছিলো। সে মনোমালিন্য এমন যে, পরের বছর – ১৯২১ সালে – তিনি মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সঙ্গে তালতলা লেনের বাড়িতে থাকার সময়ে একদিন তাঁর বড়ো ভাই সাহেবজান এবং বাবার খুড়তুতো / চাচাতো ভাই বজলে করিম এসে নজরুলকে একবার চুরুলিয়ায় যাবার জন্যে অনেক সাধাসাধি করেন। অসম্ভব নয়, তাঁর কোনো বিয়ের প্রস্তাব এসেছিলো। কিন্তু তিনি যেতে রাজি হননি।১৭ পরেও মায়ের সঙ্গে তাঁর আর দেখা হয়নি। ঘটনা হিশেবে এটা অতো গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতোটা গুরুত্বপূর্ণ কবির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্যে। তিনি অসম্ভব অভিমানী ছিলেন।
আর-একটা খবর জানা যায় যে, চুরুলিয়া থেকে আসানসোল অথবা রানীগঞ্জ হয়ে কলকাতায় ফেরার পথে তিনি বর্ধমানে নেমেছিলেন। সেখানে সাব-রেজিস্ট্রার পদের জন্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে একটা দরখাস্ত দিয়ে এসেছিলেন তিনি। তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে শম্ভুনাথ রায় এবং মনিরুদ্দীনের সাব-ডেপুটি কালেক্টরের (অর্থাৎ রেজিস্ট্রারের) চাকরি হয়েছিলো। কিছু দিন পরে সে চাকরির জন্যে নজরুল সাক্ষাৎকারের আমন্ত্রণও পেয়েছিলেন। কিন্তু মুজফ্‌ফর আহ্‌্‌মদ এবং আফজালুল হক-সহ তাঁর মেসের বন্ধুরা তাঁকে ইন্টারভিউতে উপস্থিত না-হওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁরা বোঝান যে, এই চাকরি করলে তাঁকে হয়তো মফস্বলের কোথাও পড়ে থাকতে হবে এবং তার ফলে তাঁর সাহিত্যিক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে না।১৮ এই বন্ধুদের মধ্যে আফজালুল হকের প্রত্যক্ষ স্বার্থ জড়িত ছিলো এই অনুরোধের পেছনে। তিনি মোসলেম ভারত পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং নজরুলকে রাজি করিয়েছিলেন এ পত্রিকায় নিয়মিত লেখা দেবার জন্যে। বস্তুত, পরবর্তী এক বছর নজরুলই ছিলেন তাঁর পত্রিকার প্রধান লেখক।
গ্রাম থেকে ফিরে নজরুল থিতু হয়ে বসলেন ৩২ নম্বরের সেই মেসে। তাঁর অর্জন এবং রূপান্তরের সূচনা হলো তখন থেকে। তবে তাঁর সৌভাগ্য যে, এই পথে দৈবক্রমে তিনি মুজফ্‌ফর আহ্‌মদকে পথপ্রদর্শক-বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন। মুজফ্‌ফর নানাভাবে প্রভাবিত করেছিলেন তাঁকে। বয়সে তাঁর থেকে বছর দশেকের বড়ো, তিনি ছিলেন সেকালের জন্যে যেটা খুব অসাধারণ – আন্তরিকভাবে অসাম্প্রদায়িক। আর, জাতিধর্ম-নির্বিশেষে মানব-দরদ ছিলো তাঁর একেবারে মজ্জাগত। এই মানব-দরদের প্রেরণা থেকেই পরের বছর তিনি কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একেবারে প্রথম দিন থেকেই নজরুল তাঁর কাছে শুনেছিলেন অসাম্প্রদায়িকতা আর মানবতার মন্ত্র। পরবর্তী কালে এই দুই মন্ত্র – বরং বলি জাদুমন্ত্র – দিয়েই নজরুল জনপ্রিয়তার ধ্বজা উড়িয়েছিলেন।
কলকাতায় যে-নজরুলকে দেখি, তিনি আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক ছিলেন। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ তিনি দিয়েছিলেন – এ কথা বলা যায় না। অবশ্য তাঁর কোনো কোনো জীবনী-লেখক দাবি করেছেন যে, দেশপ্রেমই নাকি তাঁকে সৈন্যবিভাগে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। এ দাবিকে আত্মবিরোধী বা প্যারাডক্সিক্যাল বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক, যদিও রিক্তের বেদনে নজরুল নিজেও এ রকম ইঙ্গিত দিয়েছেন।১৯ তা ছাড়া, সে পর্যায়ে তাঁর দেশপ্রেম থাকলেও, এই দেশপ্রেমের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশ এবং সংজ্ঞিত অবয়ব ছিলো কিনা সন্দেহ হয়। ধরা যাক, তিনি কি বিপ্লবী ছিলেন? যদি বলি ছিলেন, তা হলে সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিয়ে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী সরকারের সেবা করা যুক্তিপূর্ণ হয় না। শ্রেয় হোক, অনুচিত হোক অথবা ভ্রান্ত হোক, যাঁর কাছ থেকে তিনি বিপ্লববাদের পরিচয় পেয়েছিলেন, তাঁর সেই শিক্ষক – নিবারণ ঘটক কিন্তু সৈন্যবাহিনীতে যোগ না-দিয়ে বরং আদর্শের মূল্য স্বরূপ কারাবাস করেছিলেন। নজরুলের পরম সৌভাগ্য যে, কলকাতায় ফিরে প্রথমত মুজফ্‌ফর আহ্‌্‌মদের সংস্পর্শে এসে এবং দ্বিতীয়ত নবযুগ পত্রিকায় লিখতে গিয়ে তাঁর দেশপ্রেম অবয়ব এবং দিকনির্দেশ – উভয়ই লাভ করেছিলো।
আমরা যে-নজরুলকে এখন জানি, তিনি বহু স্ববিরোধিতা সত্ত্বেও তাঁর জীবনে এবং সৃষ্টিকর্মে নিরঙ্কুশভাবে অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু কবে থেকে তিনি সকল ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠলেন? একদিনে সেটা নিশ্চয় সম্ভব হয়নি। তিনি যখন কলকাতায় বাসা বাঁধলেন, তখনো তাঁর মুসলিম স্বরূপ আদৌ ঢাকা ছিলো না। তবে মুজফ্‌ফর আহ্‌্‌মদ এবং তাঁর উদারপন্থী বন্ধুদের প্রভাবে তাঁর সেই মুসলিম স্বরূপের ওপর ধীরে ধীরে অসাম্প্রদায়িকতার আস্তরণ পড়তে আরম্ভ করে। কলেজ স্ট্রীটের আস্তানায় আগে থেকেই অনেক হিন্দু-মুসলমান কবি-সাহিত্যিক আড্ডা দিতে আসতেন। নজরুলের আগমনের পরে তাঁর গান এবং ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে সে আড্ডার পরিধি দ্রুত সম্প্রসারিত হলো। এ সময়ে যাঁরা আসতেন, তাঁদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন মুজফ্‌ফর আহ্‌্‌মদ। এঁরা হলেন শশাঙ্কমোহন সেন, গোলাম মুস্তাফা, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, হেমেন্দ্রলাল রায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, কান্তি ঘোষ, ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায়, হিতবাদী পত্রিকার সম্পাদক যোগীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, ধীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এবং শান্তিপদ সিংহ। মোহিতলাল মজুমদারের নামও মুজফ্‌ফর আহমদ উল্লেখ করেছেন, যদিও তিনি এখানকার আড্ডায় নিয়মিত আসতেন বলে মনে হয় না। নজরুলের কয়েকটি চমক-লাগানো কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পরে মোহিতলালের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয় আরও মাস ছয়েক পরে – সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে (১৯২০)।২০
নজরুলের প্রতি মোহিতলাল মজুমদারের আকৃষ্ট হয়েছিলেন বিশেষ করে দুটি কবিতা দিয়ে – যা প্রকাশিত হয়েছিলো মোসলেম ভারত পত্রিকার আষাঢ় ও শ্রাবণ সংখ্যায়। এই কবিতা দুটি হলো ‘বাদল প্রাতের শরাব’ এবং ‘খেয়া-পারের তরণী’। মোহিতলাল এই কবিতা দুটি পড়ে আন্তরিকভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর বিস্ময় এবং মুগ্ধতার কথা তিনি লেখেন মোসলেম ভারত পত্রিকার সম্পাদকের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে। পত্রিকার ভাদ্র সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়। তাতে তিনি লেখেন:
যাহা আমাকে সর্বাপেক্ষা বিস্মিত ও আশান্বিত করিয়াছে, তাহা আপনার পত্রিকার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি লেখক হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা। বহুদিন কবিতা পড়িয়া এত আনন্দ পাই নাই, এমন প্রশংসার আবেগ অনুভব করি নাই।
তারপর তিনি ‘খেয়া-পারের তরণী’ কবিতার দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন যে,
কবিতাটী আবৃত্তি করিলেই বোঝা যায়, যে, শব্দ ও অর্থগত ভাবের সুর কোনখানে ছন্দের বাঁধনে ব্যাহত হয় নাই। বিস্ময়, ভয়, সাহস, অটল বিশ্বাস এবং সর্বোপরি প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত একটা ভীষণ গম্ভীর অতিপ্রাকৃত কল্পনার সুর, শব্দবিন্যাস ও ছন্দ ঝঙ্কারের মূর্তি ধরিয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে। আমি কেবল একটি মাত্র শ্লোক উদ্ধৃত করিব.
আবুবকর উসমান উমর আলী হাইদর / দাঁড়ী যে তরণীর নাই ওরে নাই ডর।
কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা / দাঁড়ীমুখে সারিগান – লা শরীক আল্লাহ।
এই শ্লোকে মিল, ভাবানুযায়ী শব্দবিন্যাস এবং গভীর গম্ভীর ধ্বনি, আকাশে ঘনায়মান মেঘপুঞ্জের প্রলয়-ডম্বরু ধ্বনিকে পরাভূত করিয়াছে – বিশেষ এই শেষ ছত্রের বাক্য ‘লা শরীক আল্লাহ’ যেমন মিল, তেমনি আশ্চর্য প্রয়োগ। ছন্দের অধীন হইয়া এবং চমৎকার মিলের সৃষ্টি করিয়া এই আরবী বাক্য যোজনা বাঙ্গলা কবিতায় কি অভিনব ধ্বনিগাম্ভীর্য লাভ করিয়াছে।২১
মোসলেম ভারত পত্রিকা সাধারণত নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কিছু দেরি করে প্রকাশিত হতো। কাজেই ভাদ্র সংখ্যা লেখা থাকলেও, মোহিতলালের এ চিঠি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো সম্ভবত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে। এর পরেই নজরুল একদিন সন্ধ্যেবেলায় অ্যামহার্স্ট স্ট্রীটে মোহিতলালের মেসে গিয়ে দেখা করেন।২২ এভাবে বছর দেড়েকের জন্যে দুজনের বন্ধুত্বের সূত্রপাত হয়।
নজরুলের স্বভাবেই যে অসাধারণ কাব্য-প্রতিভা ছিলো, মোহিতলালই তা সত্যিকারভাবে আবিষ্কার করেছিলেন এবং অতঃপর গভীর আন্তরিকতা এবং দরদের সঙ্গে তাঁর সঙ্গে মিশেছিলেন।। সেই সঙ্গে তিনি এ-ও উপলব্ধি করেন যে, নজরুলের লেখাপড়ার পরিধি নিতান্ত সীমাবদ্ধ। সে জন্যে তিনি অকৃত্রিম স্নেহ এবং বন্ধুত্ব নিয়ে তাঁর জ্ঞানের সীমানা সম্প্রসারিত করার প্রযত্ন করেছিলেন। নজরুলও সে দান সহজ মনে গ্রহণ করেছিলেন। কবি-সাহিত্যিকদের কলেজ স্ট্রীটের আড্ডায় তেমন নয়, কিন্তু নজরুলের অন্য আস্তানাগুলোয় তিনি তাঁকে পড়ে শোনাতেন নিজের লেখা। ইংরেজি কবিতাও পড়ে শোনাতেন এবং আলোচনা করতেন সংস্কৃত সাহিত্য নিয়ে।২৩ কিন্তু তাঁকে মোহিতলাল নিজের মুঠোয় আটকে রাখার এবং নিজের আদর্শ অনুযায়ী গড়ে তোলার যে-প্রয়াস পাচ্ছিলেন, নজরুল তাতে ক্রমশ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তারপর কিভাবে তাঁদের বন্ধুত্ব তিক্ততা এবং শত্রুতায় পরিণত হলো, তা আমরা যথাসময়ে লক্ষ করবো।
৩২ নম্বরের আড্ডায় যোগ দেওয়া ছাড়া, নজরুল এক সময়ে আড্ডা দিতে যেতেন গজেন্দ্রনাথ ঘোষের বৈঠকে। সেখানেও নিয়মিত আসর বসতো। সেই আড্ডাতেও পরিচয় হয়েছিলো অনেকের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের। তিনি সম্ভবত নজরুলের কবিতায় ছন্দ এবং সঙ্গীতপ্রধান শব্দ ব্যবহার লক্ষ করে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। তাই শুনে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বন্ধু নজরুলকে সেখানে নিয়ে যান এবং সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।২৪ এই পরিচয় ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের আন্তরিক ঘনিষ্ঠতা জন্মেছিলো। তাঁদের আত্মিক যোগাযোগের ফলস্বরূপ সত্যেন্দ্রনাথের মৃত্যু উপলক্ষে নজরুল একাধিক কবিতা লিখেছিলেন। গানও রচনা করেছিলেন একটি। তাঁর এই শ্রদ্ধাঞ্জলির মধ্য দিয়ে সত্যেন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা প্রকাশ পায়। কিন্তু তার থেকেও যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো: তিনি একাধিক ধ্বনি-প্রধান কবিতা লিখেছিলেন যাতে সত্যেন্দ্রনাথের প্রভাব অতি-স্পষ্ট। যেমন, জুলাই ১৯২১ সালে তিনি লেখন নীচের কবিতাটি :
আদর-গর-গর / বাদর দর-দর / এ-তরু ডর-ডর / কাঁপিছে থর-থর।
নয়ন ঢল-ঢল / সজল ছল-ছল / কাজল কালো জল / ঝরে লো ঝর-ঝর॥
এ ছাড়া, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরচ্চন্দ্র (দাদা ঠাকুর), মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তখনো তাঁর পরিচয় হয়নি। সে পরিচয় হয়েছিলো পরের বছরের শেষ দিকে। কারণ, রবীন্দ্রনাথ এ সময়ে একটানা প্রায় ষোলো মাস ইউরোপ-অ্যামেরিকায় ছিলেন।
এই কবি-সাহিত্যিক এবং সাহিত্যামোদীদের আলাপচারিতায় যোগ দিতেন নজরুল। কথাবার্তার বিষয়বস্তু গড়িয়ে যেতো এক প্রসঙ্গ থেকে আর-এক প্রসঙ্গে। সমকালীন সাহিত্যের কথা উঠতো, অতীত দিনের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হতো, বিদেশের সাহিত্যের কথা বলতেন কেউ-বা, দেশের সাহিত্যের সঙ্গে সে সাহিত্যের তুলনাও করতেন। কবিতা নিয়ে কথাবার্তা হতো, কবিতার আঙ্গিক নিয়ে বিতর্ক উঠতো। কে সম্প্রতি উপন্যাসে নতুন বিষয়বস্তু নিয়ে এসেছেন – সে খবর দিতেন কেউ। কার্ল মার্কসের দ্য ক্যাপিটাল গ্রন্থের নাম শুনে নজরুল তা লিখে রাখেন। ফরাসি ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার অনরি দ্য বালজাকের নাম শুনে চিরকুটে টুকে রাখেন।২৫ গানের কথা হয়, নাটকের কথা হয়, মঞ্চের কথা হয়। এমন কি, সেখানে পরনিন্দাও হয় কখনো কখনো। এসব আড্ডায় নজরুল শুনতে পান এমন-সব কথা, যা তিনি স্কুলে শোনেননি, শেখেননি, বইতেও পড়েননি। মস্ত প্রতিভাবান ব্যক্তি হিসেবে তিনি যা শোনেন, নিজের ভাবনা মিশিয়ে তার থেকেও বেশি শিখে ফেলেন। তা ছাড়া, এসব প্রগতিশীল ভাবনা দিয়ে তিনি নিজের হৃদয়কে আলোকিত করেন। তাঁর জ্ঞান এবং মননের বৃত্ত এভাবে প্রসারিত হয় জ্যামিতিক হারে – একের পরে দুই, কিন্তু তারপর চার, তারপর আট – এই হারে।
গানে তাঁর আগ্রহ ছিলো সীমাহীন, প্রতিভাও ছিলো অসামান্য। নিজে গান শোনার জন্যে কতোটা করতে তৈরি ছিলেন জানি না, কিন্তু গান শোনানোর জন্যে সে পর্যায়ে তিনি নিজের গাঁটের পয়সা ব্যয় করে কলকাতার এক প্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্তে যেতে দ্বিধা বোধ করতেন না। তাঁর সেই গানের মধ্য দিয়েও তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালিত হয়। তাঁর শ্রোতারা প্রায় সবাই ছিলেন অমুসলমান (সেকালের সাধারণ মুসলমানরা গান শোনাকে নিষিদ্ধ কাজ বলে বিবেচনা করতেন), যেসব মেস এবং পরিবার থেকে গান শোনাবার নিমন্ত্রণ তিনি পেতে থাকলেন, সেগুলো অমুসলমানদের। দুজন গায়কের সঙ্গেও এ সময়ে তাঁর ঘনিষ্ঠতা জন্মে, তাঁদের একজন তখনকার কলকাতার নাম-করা রবীন্দ্রসঙ্গীত-শিল্পী – হরিদাস চট্টোপাধ্যায়; আর-একজন নলিনীকান্ত সরকার। হরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি একযোগে গান গাইতেন বহু আসরে।২৬ অল্পকালের মধ্যে নলিনীকান্ত সরকারের সঙ্গেও তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিলো। গায়ক ছাড়া, নলিনীকান্তের আর-এক পরিচয়, তিনি কাজ করতেন সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায়।
কেবল নলিনীকান্ত নন, পত্রপত্রিকার সূত্র ধরে অনেকের সঙ্গেই নজরুলের পরিচয় হয়েছিলো। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন বিপ্লবী বারীন ঘোষ – অরবিন্দ ঘোষের কনিষ্ঠ ভ্রাতা। তিনি সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকার প্রধান ছিলেন। চিত্তরঞ্জন দাসের মাসিক পত্রিকা নারায়ণ দেখাশোনার ভারও ছিলো তাঁর ওপর।২৭ রাজনীতির পথে নয়, পত্রিকার সূত্রেই নজরুলের পরিচয় হয়েছিলো চিত্তরঞ্জন, ফজলুল হক, বারীন ঘোষ, মুজফ্‌ফর আহমদের মতো রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে। মোট কথা, যে-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিক এবং সঙ্গীত রসিকদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হলো, তাঁরা নাম-করা আর ধর্মীয় পরিচয়ে তাঁরা দু-চারজন ছাড়া সবাই অমুসলমান। এঁদের সঙ্গে মিশে তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালিত এবং দৃঢ়মূল হয়েছিলো। এ ছাড়া, দৈবক্রমে আরও এমন ঘটনা ঘটেছিলো, যা তাঁকে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে সাহায্য করেছিলো। যেমন, তাঁর কলকাতায় আগমনের পরের বছর কুমিল্লার ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতাও তাঁকে হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদ ভুলতে সাহায্য করেছিলো। এর ঠিক আগে প্রেমের আঘাতে তিনি ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই মর্মান্তিক বেদনা কাটিয়ে উঠে ছ মাসের মধ্যে তিনি যে-কিশোরীর প্রেম লাভ করেছিলেন, ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের ভ্রাতুষ্পুত্রী। এভাবেই নজরুলের মুসলিম পরিচয়ের ওপর অসাম্প্রদায়িকতার মজবুত কাঠামো নির্মিত হয়েছিলো।
দেশাত্মবোধও তাঁকে অসাম্প্রদায়িকতার পথে টেনে নিয়েছিলো। কারণ, দেশকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসলে দেশের সকল সম্প্রদায়কে সমান চোখে না-দেখে পারা যায় না, দেশতো কেবল মাটি নয়, দেশের বেশির ভাগটাই মানুষ। তদুপরি, তাঁকে যিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং দু বাহু মেলে বুকে টেনে নিয়েছিলেন, সেই মুজফ্‌ফর আহ্‌্‌মদ ছিলেন হিন্দু অথবা মুসলমান নয়, বরং সর্বহারাদের রাজনীতিতে নিবেদিত-প্রাণ একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ।
তাঁর লক্ষ্য ছিলো কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার জন্যে সংগ্রাম করা এবং তাঁর সেই রাজনৈতিক আদর্শকে তুলে ধরার জন্যে একটি পত্রিকা প্রকাশ করা। সে পত্রিকায় লেখার জন্যে লোক কোথায় পাবেন, সে নিয়ে তিনি তেমন দুশ্চিন্তা করেননি। কারণ তিনি নিজে তো ছিলেনই, তার ওপর এখন হাতের কাছেই ছিলেন বেকার নজরুল, যাঁর লেখা তিনি ইতিপূর্বে ছাপিয়েছেন। পত্রিকার জন্যে তিনি তাঁকে বিবেচনা করলেন একজন উৎকৃষ্ট সহকর্মী হিসেবে। অবশ্য সাংবাদিক হিসেবে নজরুলের কোনো অভিজ্ঞতা ছিলো না। কিন্তু অভিজ্ঞ সাংবাদিকও পেয়ে গেলেন মুজফ্‌ফর – মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীকে। ফজলুল হক সেলস্‌্‌ওয়ার্সি এবং মঈনুদ্দীন হুসায়েনও মদত দিলেন। অর্থাৎ লোকবলের অভাব ছিলো না, পত্রিকা প্রকাশের পথে প্রধান সমস্যা ছিলো অর্থ জোগানের। অবশ্য সে সমস্যারও সমাধান জুটে গেলো। সৌভাগ্যক্রমে এ পত্রিকার জন্যে অর্থদাতা হিসেবে যাঁকে পাওয়া গেলো, তিনি পরবর্তী কালের বাংলার প্রধান মন্ত্রী আবুল কাসেম ফজলুল হক – মুসলিম ভোট-নির্ভর হলেও যিনি ছিলেন একজন মোটামুটি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক এবং কলকাতা হাই কোর্টের একজন নাম-করা উকিল।
টাকা ছাড়াও, তাঁর নিজের একটা প্রেস ছিলো – যদিও সেই নিষ্ক্রিয় প্রেসটাকে খোঁড়া প্রেস বলাই ভালো। টাইপ ইত্যাদি জুটিয়ে সেই ছাপাখানা থেকে দু পৃষ্ঠার সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ পত্রিকা প্রকাশিত হলো ১২ই জুলাই তারিখে (১৯২০), নজরুল কলকাতায় আসার প্রায় চার মাস পরে। বেকার নজরুলের একটা হিল্লে হলো। তার আগে পর্যন্ত তাঁর যা আয় ছিলো, সেটা ছিলো মোসলেম ভারত, সওগাত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা ইত্যাদি সাময়িক পত্রিকা থেকে পাওয়া পারিশ্রমিক। মঈনুদ্দীন হুসায়েন নামে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গ্র্যাজুয়েট করাচি থেকে পাঠানো নজরুলের গল্প-কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনিও ডাক মারফত নজরুলকে পঞ্চাশটি টাকা পাঠিয়েছিলেন কোনো দাবি-দাওয়া ছাড়াই।২৮ বিভিন্ন আসরে গান শুনিয়েও নজরুল অল্পস্বল্প আয় করতেন বলেও মনে হয়, যদিও জীবনীকারেরা এ সম্পর্কে কিছুই লেখেননি।
নজরুলের চমকদার শিরোনাম এবং আবেগপূর্ণ লেখার দরুন প্রথম থেকেই নবযুগ পত্রিকা জনপ্রিয়তা লাভ করলো হিন্দু ও মুসলমান – উভয় সম্প্রদায়ের কাছে। তাঁর লেখা নিবন্ধের দু-একটি শিরোনাম তুলে ধরলেই পাঠক-চিত্তকে আকৃষ্ট করার তাঁর নিজস্ব কৌশল বোঝা যাবে। ইরাকের সুলতান ফয়সলকে নিয়ে তিনি একটা সংবাদের শিরোনাম লিখেছিলেন: ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার / পরাণ সখা ফয়সল হে আমার।’২৯ রবীন্দ্রনাথের গানের উদ্ধৃতি তাঁর লেখায় তিনি জীবনের সে পর্বে বারবার দিতেন। সুতরাং সেদিক দিয়ে তাঁর শিরোনাম অথবা লেখার মধ্যে দেওয়া রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি অসাধারণ নয়। কিন্তু এর মধ্যে বিষয়বস্তু এবং ছন্দের কারণে যে-চমক সৃষ্টি হয়েছে, তা অসাধারণ। এ রকমের অন্য কয়েকটি ধরতাই শিরোনাম হলো: ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’, ‘কালো আদমীকে গুলি মারা’, ‘লাট-প্রেমিক আলী ইমাম’, ‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ।’ ‘মুহাজিরিন হত্যার জন্য দায়ী কে’ শিরোনামটা তেমন চটকদার না-হলেও, এই সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখার জন্যে নবযুগের জামানত এক হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত হয়েছিলো। এবং পত্রিকার বয়স মাস দেড়েক হতে না হতে তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।
নবযুগ পত্রিকা একদিকে যেমন হিন্দু-মুসলমানকে কাছাকাছি আসার প্রেরণা জুগিয়েছিলো, তেমনি এই ঐক্যের আহ্বান জানাতে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে নজরুল নিজেও ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করেছিলেন। ‘নবযুগ’ নামে একটি সম্পাদকীয়তে তিনি লিখেছিলেন,
এস ভাই হিন্দু। এস মুসলমান! এস বৌদ্ধ! এস ক্রিশ্চিয়ান! আজ আমরা সব গণ্ডী কাটাইয়া, সব সংকীর্ণতা, সব মিথ্যা, সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি।৩০
আর-একটি সম্পাদকীয়তে তিনি হিন্দু এবং মুসলমান – উভয়েকে তাঁদের সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের জন্যে ধিক্কার জানিয়েছেন। বিশেষ করে নিন্দা করেছেন হিন্দুদের ছোঁয়াঁছুঁয়ির লোকাচারকে। আহ্বান জানিয়ে বলেছেন,
হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার এই মহাগগনতলের সীমা-হারা মুক্তির মাঝে দাঁড়াইয়া – মানব! – তোমার কণ্ঠে সেই সৃষ্টির আদিম বাণী ফুটাও দেখি! বল দেখি, “আমার মানুষ ধর্ম।”৩১
এ সম্পাদকীয়তে তিনি হিন্দু এবং মুসলমান – উভয় ধর্মাবলম্বী সাম্প্রদায়িক লোকেদের প্রতি সমান ধিক্কার জানিয়েছেন।
নবযুগ পত্রিকায় কাজ করার ফলে কেবল তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনাই জোরদার হয়নি, তাঁর আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ লাভ হয়েছিলো। আগেই বলেছি, তিনি দেশপ্রেমের পরিচয় দিলেও, তাঁর সেই দেশপ্রেমের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশ ছিলো না। নবযুগে যেন কৃষক-শ্রমিকদের কথা লেখা হয় – এ কথা বলে দিয়েছিলেন পত্রিকার মালিক ফজলুল হক।৩২ মুজফ্‌ফর আহ্‌্‌মদেরও ছিলো সেই একই লক্ষ্য, একটু বেশি মাত্রায়ই ছিলো। নজরুলেরও। কিন্তু ফজলুল হকের রাজনৈতিক আনুগত্য ছিলো কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, খিলাফত আন্দোলন এবং তাঁর ভাবী ভোটদাতা কৃষক-শ্রমিকদের প্রতি – চতুর্মুখী। অচিরে নজরুল এসব নানামুখী রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। সেপ্টেম্বরের (১৯২০) ৪ তারিখে লালা লাজপত রায়ের সভাপতিত্বে কলকাতায় কংগ্রেসের যে-অধিবেশন হয়, নবযুগের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি তাতে যোগদান করেন৩৩ এবং ভেতর থেকে কংগ্রেসের চেহারাটা দেখতে পান। সেই থেকে রাজনীতিতে তাঁর হাতে-খড়ি।
ইংরেজ সরকারকে স্বরাজ অর্থাৎ স্বশাসনের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করার জন্যে এই অধিবেশনেই গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করেন। তিনি বলেন যে, অসহযোগ আন্দোলন সফল হলে এক বছরের মধ্যে স্বরাজ লাভ করা সম্ভব হবে। চিত্তরঞ্জন দাস অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে গান্ধীজীর এ কথার তীব্র প্রতিবাদ করেন। গান্ধীজী যে-অসহযোগের প্রস্তাব করেন, সে অসহযোগের লক্ষ্য ছিলো শিক্ষা থেকে আরম্ভ করে দেশ পরিচালনা করার কাজকর্ম – কোনো কিছুতেই সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা না-করা। এ ঘোষণা দিয়ে নজরুল কতোটা প্রভাবিত হয়েছিলেন, বলা মুশকিল। কারণ, এই ঘোষণার সপ্তাহ তিনেক পরে যখন নবযুগ আবার প্রকাশিত হয়, তখন তিনি এ সম্পর্কে কিছু লেখেননি। লিখেছিলেন পরের বছর – একাধিক গান এবং কবিতা। কুমিল্লায় তিনি গান রচনা করে হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে সেই গান গেয়ে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।৩৪
এভাবে কলকাতায় বছর খানেকেরও কম সময় বাস করেই রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর ধারণা স্পষ্ট হলো না, নবযুগে কাজ করতে গিয়ে লেখার ব্যাপারেও মস্ত লাভ হয়েছিলো। তিনি এখানে সাধু ভাষায় এবং দ্রুতগতিতে লিখতে শেখেন। একটা লম্বা সংবাদকে সংক্ষিপ্ত করে কী করে পরিবেশন করতে হয়, সে শিক্ষাও তিনি লাভ করেছিলেন এই পত্রিকায় কাজ করতে এসে।৩৫ মোট কথা, সাংবাদিকতা এবং রাজনীতিতে তাঁর প্রথম পাঠ মুজফ্‌ফর আহমদের সাহাচর্য এবং নবযুগ পত্রিকায় কাজ করার মাধ্যমে। তা ছাড়া, এই পত্রিকায় কাজ করার সময়ে তাঁর পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তার পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছিলো।
নবযুগ নজরুলকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করলেও, সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টিতে সহায়তা করেনি। প্রথম দিকে তিনি সে সুযোগ সবচেয়ে বেশি পেয়েছিলেন মোসলেম ভারত পত্রিকার কাছ থেকে। বস্তুত, এমন যোগাযোগ খুব কমই ঘটে। নজরুল কলকাতায় ফিরে আসার আগেই ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রীটবাসী আফজালুল হক পত্রিকা প্রকাশ করার জন্যে লেখা সংগ্রহ করে প্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এমন কি, প্রথম সংখ্যার লেখাগুলোও তিনি প্রেসে পাঠিয়েছিলেন। ঠিক সেই সময়ে হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম এসে হাজির হলেন ৩২ নম্বরের মেসে এবং তক্তপোশ বেছালেন আফজালুল হকের পাশের ঘরে। আফজালুল হক তাঁর কাছে লেখা চাইলেন। এবং নজরুলকে কষ্ট করে লিখতেও হলো না – কারণ লেখা তাঁর তৈরিই ছিলো। গল্প, কবিতা তো ছিলোই, তার ওপরে ছিলো রীতিমতো একটা উপন্যাস – বাঁধনহারা। কয়েক সপ্তাহ পরেই বৈশাখ মাসে এই উপন্যাস ছাপা হলো মোসলেম ভারতে। মোসলেম ভারতের সঙ্গে কবির এই যোগাযোগ হয়েছিলো অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এই পত্রিকার পরবর্তী বারো মাসের প্রতিটি সংখ্যায় তাঁর লেখা ছাপা হয়েছিলো – কবিতা, গান এবং উপন্যাস। সেদিক থেকে বিচার করলে নজরুলের সৃজনশীলতা প্রকাশে তখন সবচেয়ে মূল্যবান ভূমিকা পালন করেছিলো মোসলেম ভারত। করাচিতে থাকাকালে তিনি একটা পত্রিকা খুঁজছিলেন যার মাধ্যমে তাঁর কবিতা এবং গল্প প্রকাশ করতে পারেন। এখন কলকাতায় এসে তিনি মোসলেম ভারতকে তো পেলেনই; তদুপরি, তাঁর রচনা প্রকাশের জন্যে পেলেন আরও কয়েকটি পত্রিকা।
চিত্র: মোসলেম ভারতের মলাট
কলকাতার অনুকূল পরিবেশে তাঁর নিজের রচনা প্রকাশের সুযোগ বৃদ্ধি পেলো – এটা বোঝা যায়। কিন্তু তার থেকে তাৎপর্যপূর্ণ এমন কিছু ঘটলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে – যার কোনো ব্যাখ্যা মেলে না। এই ব্যাখ্যাহীন ঘটনা হলো: তাঁর সৃজনশীলতা নতুন দিকে মোড় নিলো এবং প্রবল বেগে প্রবাহিত হলো বন্যাধারার মতো। গদ্য-লেখক নজরুল, পদ্য-লেখক নজরুল, রাতারাতি কবি নজরুলে পরিণত হলেন। কোথায় হারিয়ে গেলো করাচিতে লেখা ‘কবিতা-সমাধি’ অথবা ‘মুক্তি’র মতো বৈশিষ্ট্যহীন এবং নিম্ন মানের পদ্য, কলকাতায় তাঁর কলম থেকে বের হলো একেবারে ভিন্ন চেহারার, ভিন্ন রসের, হৃদয়কে নাড়া-দেওয়ার কবিতা। বৈশাখ মাসের সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘উদ্বোধন’, যার সঙ্গে করাচির পদ্যগুলোর কোনো তুলনা চলে না। এ কবিতার বিষয়বস্তুও নতুন – দেশপ্রেম। এর ভঙ্গি রাবীন্দ্রিক এবং ভাষা তৎসম শব্দপ্রধান। পঁচিশ পংক্তির এই কবিতায় একটি মাত্র আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে – ‘খুন’। এ কবিতা যদি যথেষ্ট নতুনত্বের প্রমাণ না-হয়, জ্যৈষ্ঠ মাসের মোসলেম ভারতে প্রকাশিত ‘শাত্‌্‌-ইল আরব’ কবিতা অন্তত সে দাবি প্রবল জোরের সঙ্গেই করতে পারে।
শাতিল-আরব! শাতিল-আরব! পূত যুগে যুগে তোমার তীর
শহীদের লোহু, দিলীরের খুন ঢেলেছে যেখানে আরব-বীর।
যুঝেছে এখানে তুর্ক-সেনানী
য়ুনানি মিস্‌রি আরবি কেনানী
লুটেছে এখানে মুক্ত আজাদ বেদুইনের চাঙ্গা শির
নাঙ্গা শির –
এ একেবারে নতুন সুরের, সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের কবিতা। মেসোপটেমিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে যে-বঙ্গবাহিনী গিয়েছিলো, নজরুল সেই বাহিনীতে ছিলেন না, কিন্তু সেই বাহিনীর পক্ষ থেকে তিনি এই কবিতা দিয়ে ইরাকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। কেবল শ্রদ্ধা নয়, শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রকাশ করেছেন বীরত্বের বজ্রকণ্ঠ। এর ছন্দ, শব্দাবলী, বিষয়বস্তু এবং প্রকাশভঙ্গি কেবল নজরুলের জন্যে নতুন নয় – বাংলা কবিতায়ও নতুন। বৈশাখ মাসে প্রকাশিত তাঁর কবিতা ‘উদ্বোধন’-এর সঙ্গেও এর মিল নেই। মিল আছে কেবল একটি শব্দের – ‘খুন’।৩৬ ‘মুক্তি’ আর ‘কবিতা সমাধি’ পদ্যের