মহান আদর্শের ধারক পুণ্যবান এক আধ্যাত্মিক পুরুষ

হযরত আলহাজ্ব শাহজাদা মুহাম্মদ ফৌজুল আলী খাঁন (রা.)

মীর নাজমুল আহসান রবিন

বারো আউলিয়ার পূণ্যভূমি এই চট্টগ্রামে অনেক মহান আধ্যাত্মিক সাধক পুরুষ, আউলিয়া, বুজুর্গ ব্যক্তিদের পবিত্র মাজার শরীফ অবসি’ত। এই সব পুণ্যাত্মারা তাদের জীবিতকালে যেমনি অগণিত মানুষকে পাপ, অন্যায়-অনাচারের পথ থেকে সরিয়ে এনে সঠিক পথে চলতে, ধর্মীয় রীতি-নীতি যথাযথভাবে অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করেছেন ঠিক তেমনিভাবে তাঁরা ইহজগত থেকে বিদায় নেওয়ার পরেও অগণিত মানুষকে কল্যাণের পথে জীবন পরিচালিত করতে দিক নির্দেশনা দিয়ে চলেছেন। তাঁদের মহৎ জীবনের আদর্শ, আধ্যাত্মিক চর্চার উজ্জল দৃষ্টান্ত যুগ যুগ ধরে অগণিত দিশেহারা মানুষকে সঠিক পথ চলার অনুপ্রেরণা জুগিয়ে আসছে। হযরত আলহাজ্ব শাহজাদা মুহাম্মদ ফৌজুল আলী খাঁন (রা.) তেমনি এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন মাহবুবে রব্বানী গাউছে ছমদানি হযরত শাহ সুফি আমানত খাঁন (রা.) এর পবিত্র বংশধর। দরবারী পরিমণ্ডল এবং চট্টগ্রামের সমাজ জীবনে তিনি “ছোট মিঞা” হিসাবেই সর্বধিক পরিচিত ছিলেন।
নব্বই দশকের শুরুর দিকে আমার শৈশবকালের স্মৃতিতে যতটুকু মনে পড়ে, আমার আব্বা মরহুম মীর রমজান আলী ও আম্মা মরহুম রওশন আরা আক্তার- এর সাথে আমি এবং আমার বড় বোন ফেরদৌস জাহান রিমা নিয়মিত চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস’লে অবসি’ত হযরত শাহ সূফি আমানত খাঁন (রাঃ) পবিত্র দরবার শরীফে জিয়ারত করতে যেতাম। সেখানে যাওয়াতে বিশাল হৃদয়ের আধ্যাত্মিক এই মানুষটিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তাঁকে আমি দাদা বলে ডাকতাম। তখন হযরত আলহাজ্ব শাহজাদা মুহাম্মদ ফৌজুল আলী খাঁন (রা.) দাদাকে দেখেছি আব্বার সঙ্গে আধ্যাত্মিক বিষয়ে চমৎকার মোহনীয় ভঙ্গিতে আন্তরিকভাবে কথা বলতে। দীর্ঘদেহী সদা হাস্যোজ্জ্বল, মিষ্টভাষী ও দয়ালু মানুষটির কথাবার্তায় জীবন দর্শনের অসাধারণত্বের অদ্ভুত প্রকাশ লক্ষ্য করতাম। আমি কৈশোর-যৌবন পেরিয়ে পরিণত বয়সে পৌঁছার পরেও দীপ্তিময় নূরানী চেহারায় এই মানুষটিকে দেখেছি একইভাবে দরবার শরীফে আগত ভক্ত অনুরাগী সব শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে আধ্যাত্মিক বিষয়ে কথা বলছেন আর সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে মানুষটির কথা শুনছেন।
১৯৬৪ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত হযরত শাহ সুফি আমানত খান (রহঃ)- এর দরগাহ শরীফের হযরত আনোয়ার খান প্রাইভেট ওয়াকফ এস্টেট-এর সাজ্জাদানশীন মোতওয়াল্লী হিসাবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বাবা শাহাজাদা মোহাম্মদ মৌলভী শের আলি খান (রহ.) ও মাতা মোছাম্মৎ ফিরোজা খানম। আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠা এবং চট্টগ্রামের দারুল উলুম মাদ্রাসায় শিক্ষা অর্জন করা এই সাধক সবসময় মগ্ন থাকতেন আল্লাহর ইবাদত বন্দেগিতে। তিনি নবীর সুন্নাহ এবং শরীয়তের হুকুম আহকাম মেনে চলতেন। প্রখ্যাত সুফি হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ্ ছিরিকোটি (রহঃ)-এর মুরিদ ছিলেন। ১৪৩০ হিজরীর ২৫শে জমাদিউস সানি (২০০৯ সালের ২০শে জুন) দিবাগত রাতে পবিত্র তাহাজ্জুতের নামাজের পরে ফজরের নামাজের অল্প কিছুক্ষণ আগে বাবাজান কেবলা হযরত শাহ্ সুফি আমানত খান (রহ.)- এর দরবার শরীফের অভ্যন্তরে জিকিররত অবস’ায় ইহকালের মায়া কাটিয়ে উনি আল্লাহর দিদার লাভ করেন।
মানব কল্যাণই ছিলো উনার মহান ব্রত। ঊনি আধ্যাত্মিক কার্যকলাপের পাশাপাশি নিজেকে বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও জনহিতকর কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আনজুমানে খাদেমুল হজ্ব বাংলাদেশ-এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আনজুমানে রহমানিয়া সুন্নীয়া আলীয়া ট্রাস্ট- এর সম্মানিত সদস্য ছিলেন। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল- এর সহ-সভাপতি ছিলেন। নাটাব- এর সহ-সভাপতি ছিলেন। চট্টগ্রাম জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের বোর্ড অব গভর্নর নির্বাচিত হয়েছিলেন। আনজুমানে রাহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা মাদ্রাসার সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ রোগী কল্যাণ সমিতি, চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল রোগী কল্যাণ সমিতি, কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা, চট্টগ্রাম জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি, বাংলাদেশ জাতীয় ওয়াকফ কমিটি, চট্টগ্রাম রেড ক্রিসেন্ট মাতৃসদন হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি সহ অনেক সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে আজীবন সদস্য হিসাবে খেদমত করে গেছেন।
হযরত আলহাজ্ব শাহজাদা মুহাম্মদ ফৌজুল আলী খাঁন (রা.) একজন উত্তম মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ হয়েও সমাজ বিচ্ছিন্ন হননি। এই মহান আদর্শের ধারক আধ্যাত্মিক মানুষটি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন’ তাঁর আদর্শ জীবনের ঔজ্জ্বল্য একটুও ম্লান হয়নি। আজীবন তিনি সমাজসেবামূলক বিভিন্ন জনহিতকর কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষার প্রসারেও নিয়োজিত ছিলেন এবং অন্যদেরকেও সম্পৃক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আমিন-।

লেখক : ডেপুটি গর্ভনর,