হপ্রসাদ শাস্ত্রী ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ স্মরণে

আনিসুজ্জামান হ

১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শিক্ষাদানকারী ও আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য আর কোনোটির ছিল না। সূচনাকালে এখানে ছিল তিনটি অনুষদ এবং ১২টি বিভাগ। কলা অনুষদের অন্তর্ভুক্ত ছিল সংস্কৃত ও বাঙ্গালা, ইংরেজি, ফারসি ও উর্দু, আরবি ও ইসলামি বিদ্যা, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান, এবং শিক্ষা; বিজ্ঞান অনুষদে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিত; এবং আইন অনুষদে কেবল আইন বিভাগ। তিনটি আবাসিক হল স’াপিত হয়েছিল : ঢাকা হল, জগন্নাথ হল এবং মুসলিম হল। শিক্ষকসংখ্যা ছিল ৬০ – কলা অনুষদে ২৮ জন, বিজ্ঞানে ১৭ জন এবং আইনে ১৫ জন। ছাত্রসংখ্যা ছিল ৮৭৭ – আবাসিক ও অনাবাসিক মিলে ঢাকা হলে ছিল ৩৮৬ জন, জগন্নাথ কলেজে ৩১৩ জন, মুসলিম হলে ১৭৮ জন। কোনো ছাত্রী ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে বি এ ও বি
এসসি (পাস ও অনার্স), এম এ ও এম এসসি এবং এলএল বি ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস’া হয়। প্রথম বছরে কিছু কিছু ছাত্রকে দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় – মনে হয়, পাস কোর্সে। ১ সংস্কৃত ও বাঙ্গালা বিভাগের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ হয়ে আসেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (৬.১২.১৮৫৩-১৭.১২.১৯৩১)। ভারততত্ত্ববিদ হিসেবে তাঁর খ্যাতি তখন দেশ জুড়ে, এমনকি দেশের বাইরেও , বয়স ৬৭। ১৯০৮ সালে তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে অবসর নিয়েছিলেন। ২ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন দুটি কারণে : তাঁর ভাষায়, ‘ভরৎংঃ, সু ষড়াব ভড়ৎ ঃযব ংঁনলবপঃ ধহফ ঃযব ড়িৎশ ঃযধঃ ও [ধস] বীঢ়বপঃবফ ঃড় ফড়, ধহফ ংবপড়হফষু, সু ঢ়ষবধংঁৎব ঃড় নবরহম ধংংড়পরধঃবফ রিঃয ুড়ঁৎংবষভ [চ ঔ ঐধৎঃড়ম] রহ ধহ রহংঃরঃঁঃরড়হ ভঁষষ ড়ভ যড়ঢ়ব ধহফ ঁংবভঁষহবংং.’ ৩ নতুন বিভাগ স’াপন করতে যেসব কাজ করা আবশ্যক হয়, তার সবই তিনি করেছিলেন সানন্দে, শিক্ষকতায় খুব সফলতাও লাভ করেছিলেন। রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন :

শাস্ত্রী মশায় তখন বৃদ্ধ, বয়স বোধহয় সত্তর বছর। কিন’ শিক্ষক হিসাবে ঢাকায় তিনি খুব খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সংস্কৃত কাব্য তিনি এমনভাবে পড়াতেন যাতে ছাত্ররা সহজে রস গ্রহণ করতে পারে, ব্যাকরণের কচকচি থাকত না। এ কারণে তিনি ছাত্রদের কাছে বিশেষ প্রিয় ছিলেন। ৪ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চান্সেলরের বেয়ারা কালীপদ দাস জানিয়েছেন : ছাত্ররা তাঁর বাড়িতে প্রায়ই আসত। মুসলমান ছাত্ররাও খুব আসত। সকলকে তিনি যত্ন করে খাওয়াতেন। পড়াশুনার কথা আলোচনা করতেন। ৫ এ সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অবস’ান সবটা সুখকর হয়নি। তিনি প্রথম আঘাত পেয়েছিলেন কলা অনুষদের ডিন নির্বাচনের সময়ে। অনুষদের অনেক সদস্য বলেছিলেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সবার চেয়ে প্রবীণ, তাঁকেই ডিন করলে শোভন হয়। কেউ কেউ বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আইনকানুন তৈরি করতে হবে, এত পরিশ্রমের কাজ একজন বৃদ্ধের পক্ষে করা সম্ভব নয়। তাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দাঁড় করালেন রমেশচন্দ্র মজুমদারকে। ভোটাভুটিতে হরপ্রসাদ হেরে গেলেন। ৬ হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর নিয়োগ ছিল তিন বছরের জন্যে। উনি পুনর্নিয়োগলাভের আশা করেছিলেন কি না, জানি না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষ তেমন কোনো উদ্যোগ নেননি, বরং অতিথি
অধ্যাপকরূপে তাঁকে বক্তৃতাদানের আহ্বান জানান। হরপ্রসাদ সে-প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বোধহয় আরো কিছু ঘটেছিল। শুনেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঘন ঘন ছুটি নিয়ে তাঁর কলকাতায় সভা-সমিতিতে যোগদানের বিষয়ে কেউ নাকি অ্যাকাডেমিক কাউনসিলে প্রশ্ন তুলেছিলেন – তাতে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী খুবই বিব্রত হয়েছিলেন। কালীপদ দাস বলেছেন : শাস্ত্রী মহাশয় মন খারাপ করে ঢাকা থেকে চলে গেলেন। কোনো গণ্ডগোল হয়েছিল শুনেছিলাম। উনি মাথা উঁচু করে চলা মানুষ ছিলেন। খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। সভা করে তাঁকে বিদায় দেওয়া হয়। টিপার্টিতে তখনকার ভি.সি. ল্যাঙলি সাহেব ৭ ছিলেন। অনেক প্রফেসার ছিলেন। শাস্ত্রী মহাশয় কিছু খেলেন না। আমাদের বকশিস দিলেন, সেইসঙ্গে শিশুদের মতো ক্রন্দন করেছিলেন।
৮ অবশ্য পরে, ১৯২৭ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে সম্মানসূচক ডি লিট উপাধি প্রদান করে। অনুমান করি, তিনি তা সানন্দে গ্রহণ করেন।

দুই
সংস্কৃত ও বাঙ্গালা বিভাগের সূচনায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সঙ্গে আরো তিনজন শিক্ষক যোগ দেন। সংস্কৃতের রিডারপদে শ্রীশচন্দ্র চক্রবর্তী ও লেকচারার পদে রাধাগোবিন্দ বসাক এবং বাংলার লেকচারার ও একমাত্র শিক্ষকরূপে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (১০.৭.১৮৮৪-১৩.৭.১৯৬৯)। এর আগে শহীদুল্লাহ্ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপকের গবেষণা-সহকারীরূপে কর্মরত ছিলেন। ঢাকায় অনতিকাল পরে তিনি আইন বিভাগের খণ্ডকাল শিক্ষক এবং মুসলিম হলের হাউস-টিউটর নিযুক্ত হন। বাংলার একমাত্র শিক্ষক হিসাবে বাংলায় পাস, অনার্স ও এম এ শ্রেণির পাঠ্যসূচি প্রণয়নের দায়িত্ব মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র প্রতি অর্পিত হয়। এ-সম্পর্কে তিনি যে-বর্ণনা দিয়েছেন, তা কৌতূহলোদ্দীপক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স’াপনের পর থেকেই প্রাচীন বাংলার পঠন-পাঠন আরম্ভ হয়। তখন আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র বাংলার শিক্ষক ছিলাম। অন্যান্য শিক্ষকগণ সংস্কৃত পড়াতেন। সংস্কৃত এবং বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আমার উপর বাংলা পাঠ্যবিষয় ও পাঠ্যপুস্তকের তালিকা প্রস’তের ভার দেন। আমি বাংলা অনার্স শ্রেণীর জন্য প্রাচীন বাংলা পাঠ্য-বিষয় নির্দিষ্ট করি আর তার জন্য বৌদ্ধগান পাঠ্য সি’র করি। শাস্ত্রী মহাশয় আমার প্রস্তাব শুনে বললেন – ‘এ পড়াবে
কে?’ আমি বললাম – ‘আজ্ঞে, আমি পড়াব।’ তিনি বললেন – ‘তুমি পড়াতে পারবে?’
আমি বললাম – ‘আপনার আশীর্বাদ থাকলে নিশ্চয়ই আমি পারব।’ তাতে তিনি খুশী হয়ে বললেন – ‘বাহ, বেশ।’
এটা ১৯২১ সালের জুন-জুলাই মাসের কথা। তারপর থেকে বরাবর প্রাচীন-বাংলার পঠন-পাঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবিষয়-ভুক্ত হয়ে আছে। এর অনেক পর পর্যন্ত কিন’ বৌদ্ধগান কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়নি।৯

এ-প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, বাংলায় অনার্স ও এম এ শ্রেণির যে-পাঠ্যসূচি শহীদুল্লাহ্ প্রণয়ন করেন, সেমেস্টার-পদ্ধতি প্রচলনের আগে পর্যন্ত তা সামান্য পরিবর্তনসহ ঢাকা ও পূর্ববাংলার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গৃহীত হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে ছুটি ও অর্থঋণ নিয়ে শহীদুল্লাহ্ ১৯২৬ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেন। কাহ্ণ ও সরহের মরমি গীতি সম্পর্কে অভিসন্দর্ভ রচনা করে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি লিট উপাধি অর্জন করেন। সেইসঙ্গে বাংলা ভাষার ধ্বনি সম্পর্কে গবেষণামূলক পত্র রচনা করে ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ডিপ্লোমা-ইন-ফোনোটিক্স লাভ করেন। একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় এই যে, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন’াগারে তাঁর ডি লিটের অভিসন্দর্ভ রক্ষিত হলেও ডিপ্লোমার গবেষণাপত্র সংগৃহীত নেই। সেখানকার গ্রন’াগারিক আমাকে জানান যে সাম্প্রতিককালে আরো কেউ কেউ ওই গবেষণাকর্মটির খোঁজ করে হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন। শহীদুল্লাহ্ নিজেও কখনো তা প্রকাশ করেননি। দেশে ফিরে শহীদুল্লাহ্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পূর্বপদে যোগদান করেন। ১৯৩৪-৩৫ শিক্ষাবর্ষে সংস্কৃত ও বাঙ্গালা বিভাগের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ সুশীলকুমার দে এক বছরের জন্যে ছুটিতে যাওয়ায় শহীদুল্লাহ্ অস’ায়ী রিডার ও অধ্যক্ষরূপে দায়িত্বপালন করেন। ১৯৩৭ সালে সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগ পৃথক হয়ে যায়। তখন সুশীলকুমার দে সংস্কৃতের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ থেকে যান, শহীদুল্লাহ্কে রিডার পদে উন্নীত করে বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ করা হয়। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রথম প্রোভোস্টের দায়িত্বপালন করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরগ্রহণ করেন এবং বগুড়ায় আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষপদে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ভারতে চলে যান। এই সংকট মোচন করতে বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষ যেসব ব্যবস’াগ্রহণ করেন, তার মধ্যে একটি ছিল শহীদুল্লাহ্কে ১৯৪৮ সালে সংখ্যাতিরিক্ত শিক্ষক হিসেবে বাংলা বিভাগে ফিরিয়ে আনা। ১৯৫০ সালে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগ একত্রিত হয়। ১৯৫২ সালে পূর্ণ অধ্যাপকের মর্যাদায় তাঁকে এই বিভাগের অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি কলা অনুষদের ডিন নির্বাচিত হন। পরের বছর আবার এই পদে প্রার্থী হলে তিনি নির্বাচনে পরাজিত হন। ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ জানা গেল যে, সেই বছর ১৯ নভেম্বরে শহীদুল্লাহ্ অবসরে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ৩০ জুনে অবসর নেন। শহীদুল্লাহ্ কেন নভেম্বরে অবসরে যাবেন? এ-সিদ্ধান্ত নাকি ভাইস-চান্সেলর ডব্লিউ এ জেনকিনসের। আমরা, বিভাগের কতিপয় ছাত্র, সি’র করলাম, শহীদুল্লাহ্র শিক্ষকতার মেয়াদবৃদ্ধি দাবি করে ভাইস-চান্সেলরকে

স্মারকপত্র দেবো। এম এ ক্লাসের এক ছাত্র ছিলেন আমাদের সর্দার-পোড়ো। তিনি বললেন, ভাইস- চান্সেলরের আছে যাওয়ার আগে সারের মতটা নাও। আমরা কজন শহীদুল্লাহ্র কাছে গেলাম। তিনি নিষেধ করলেন। বললেন, ‘তোমরা নিজে থেকে যেতে চাচ্ছ, কিন’ লোকে মনে করতে পারে, তোমরা আমার ইঙ্গিতে এমন করছ। সেটা আমার পক্ষে সম্মানজনক হবে না। তাছাড়া, আমার উত্তরাধিকারী ঠিক হয়ে গেছে – সে-ই বা কী ভাববে!’ আমরা অধোবদনে ফিরে এলাম। তবে ঘটা করে তাঁর বিদায়-সংবর্ধনা দিলাম। তাতে তাঁর মনের মেঘ খানিকটা হলেও কাটল।
অবসর নেওয়ার পরদিন শহীদুল্লাহ্ ফরাসি ভাষার খণ্ডকাল শিক্ষকরূপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন। দীর্ঘকাল পরে, ১৯৬৭ সালে, তাঁকে এমেরিটাস অধ্যাপক নিযুক্ত করা হয় – জানামতে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম এই পদাধিকারী। তিনি বেজায় খুশি হন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি লিট উপাধি দেয় – তখন তিনি সব চাওয়া-পাওয়ার বাইরে চলে গেছেন।
তিন ইতিহাস ও ধর্ম এবং সমাজ ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্র সম্পর্কে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ব্যাপক কৌতূহল ছিল এবং সেসব বিষয়ে গভীর অসন্ধিৎসার বশবর্তী হয়ে ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় তিনি লিখেছেন। তাঁর জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে সংস্কৃত ও অন্যান্য আর্যভাষায় লিখিত পাণ্ডুলিপির অনুসন্ধান, সংগ্রহ ও পরিচয়প্রদানে। প্রথম জীবনেই তিনি প্রসিদ্ধ পুরাতত্ত্ববিদ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের (১৮২২-৯১) সান্নিধ্যে আসেন। নেপাল থেকে সংস্কৃতে লেখা বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতিবিষয়ক যেসব পুঁথি রাজেন্দ্রলাল সংগ্রহ করেছিলেন, তিনি তখন তার বিবরণ লিখতে অগ্রসর হয়েছিলেন, কিন’ শারীরিক অসুস’তার কারণে কাজটি সম্পন্ন করে উঠতে পারছিলেন না। সেই
অবস’ায় তাঁর অনুরোধে হরপ্রসাদ তাঁকে সাহায্য করেন। ঞযব ঝধহংশৎরঃ ইঁফফযরংঃ খরঃবৎধঃঁৎব ড়ভ ঘবঢ়ধষ গ্রনে’র ভূমিকায় হরপ্রসাদের ভূয়সী প্রশংসা করে রাজেন্দ্রলাল তাঁর ঋণস্বীকার করেন। এশিয়াটিক সোসাইটির হয়ে রাজেন্দ্রলাল যেসব পুঁথি সংগ্রহ করেন, ঘড়ঃরপবং ড়ভ ঝধহংশৎরঃ গংং. নামে তিনি তার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। তার দশম খণ্ড, প্রথম ভাগ প্রকাশের পর রাজেন্দ্রলালের মৃত্যু হলে হরপ্রসাদ দশম খণ্ড, দ্বিতীয় ভাগ সংকলন করেন এবং সমগ্র দশ খণ্ডের সূচি প্রণয়ন করেন। রাজেন্দ্রলালের তিরোধানের পর পুঁথিসংগ্রহ ও তার বিবরণ লিপিবদ্ধ।

করার দায়িত্ব হরপ্রসাদের প্রতি অর্পিত হয়। হরপ্রসাদ ভারতের ও নেপালের নানাস’ান থেকে পুঁথি সংগ্রহ করেন এবং জবঢ়ড়ৎঃ ড়ভ ঃযব ঙঢ়বৎধঃরড়হং রহ ংবধৎপয ড়ভ ঝধহংশৎরঃ গংং. নামে খণ্ডে খণ্ডে তাঁর কাজের বিবরণ দেন। এশিয়াটিক সোসাইটিতে যে ১১,২৬৪টি পুঁথি সংগৃহীত হয়, তার ৮১০৮টি হরপ্রসাদের সংগ্রহ, বাকি রাজেন্দ্রলালের। উবংপৎরঢ়ঃরাব ঈধঃধষড়মঁব ড়ভ ঝধহংশৎরঃ গধহঁংপৎরঢ়ঃং রহ ঃযব এড়াবৎহসবহঃ ঈড়ষষবপঃরড়হ ঁহফবৎ ঃযব পধৎব ড়ভ ঃযব অংরধঃরপ ঝড়পরবঃু ড়ভ ইবহমধষ নামে হরপ্রসাদ ছয় খণ্ডে এর অধিকাংশের বিবরণ প্রকাশ করেন (১৯১২-২১) এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে আরো চার খণ্ডের পাণ্ডুলিপি প্রণীত হয়, সেগুলি হরপ্রসাদের মৃত্যুর পর প্রকাশলাভ করে (১৯৩৪-৪৮)। তাছাড়া তাঁর সম্পাদিত অন্তত দশটি পুঁথি এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হয় – তার মধ্যে বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণ, আনন্দভট্টকৃত বল্লালচরিত, সন্ধ্যাকর নন্দীকৃত রামচরিত ও অশ্বঘোষকৃত সৌন্দরনন্দ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
১০ এসবের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস-পুনর্গঠনের উপাদান পাওয়া গেছে, তেমনি সংস্কৃত সাহিত্যের বিষয়বৈচিত্র্য ও ভাষারীতির বৈচিত্র্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা করা গেছে। সংস্কৃত সাহিত্য সম্পর্কে তিনি যে-অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন, তাতে একদিকে তাঁর ইতিহাস- অনুসন্ধিৎসু মন এবং অন্যদিকে কাব্যরসগ্রাহী চিত্তের পরিচয় আছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ১৯০২ সালে প্রকাশিত তাঁর মেঘদূত-ব্যাখ্যা গ্রন’টি সম্পর্কে অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠে এবং সরকার থেকে এ-সম্পর্কে জানবার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এই অভিযোগ সমর্থন করায় ক্ষুব্ধচিত্ত হরপ্রসাদ অনেকদিন বাংলায় প্রবন্ধ লেখা থেকে ক্ষান্ত হন এবং বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করেন। বৌদ্ধধর্ম-বিষয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বিশেষ অনুরাগ ছিল। বৌদ্ধধর্মের উদ্ভব, বিকাশ, বিলয় এবং তার অভ্যন্তরে মতাদর্শিক সংঘাত সম্পর্কে তিনি ইংরেজি ও বাংলায় অনেক প্রবন্ধ লেখেন।
নিম্নশ্রেণির হিন্দুসমাজে ধর্মঠাকুরের পূজার মতো যেসব লৌকিক আচার ও পূজাপার্বণ দেখা যায়, তার মধ্যে তিনি বিলীয়মান বৌদ্ধধর্মের রেশ দেখতে পান। এজন্যে কোনো কোনো বিদ্বান তাঁকে বৌদ্ধবাতিকগ্রস্ত বলে আখ্যা দিয়েছেন। বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে তাঁর লেখা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ তাঁর মৃত্যুর পরে বৌদ্ধধর্ম (১৯৪৮) নামে প্রকাশিত হয়। হিন্দু সমাজে যারা ব্রাত্য বলে পরিচিত, তাদের সম্পর্কেও তিনি গবেষণা করেন। উধপপধ টহরাবৎংঃরু ইঁষষবঃরহ ঘড়. ৬ রূপে প্রকাশিত তাঁর অনংড়ৎঢ়ঃরড়হ ড়ভ ঃযব ঠৎধঃুধং (১৯৩৮) ক্ষুদ্র কিন’ মূল্যবান রচনা। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, উধপপধ টহরাবৎংঃরু ইঁষষবঃরহ ঘড়. ১ ছিল হরপ্রসাদের লেখা খড়শধুধঃধ (১৯২৫) নামে একটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ। হিন্দু ও বৌদ্ধ তন্ত্র সম্পর্কেও তাঁর অনেক তাৎপর্যপূর্ণ প্রবন্ধ আছে।

পুথিসংগ্রহের উদ্দেশ্যে তৃতীয়বার নেপালে গিয়ে হরপ্রসাদ ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ নামে একটি পদ- সংকলন, সরোরুহবজ্রের ‘দোহাকোষ’ এবং কৃষ্ণাচার্যের ‘দোহাকোষে’র পুথি আবিষ্কার করেন ১৯০৭ সালে। সবগুলির তিব্বতি অনুবাদও তিনি খুঁজে পান। ১৯১৬ সালে উক্ত পুথি তিনটি এবং পূর্বে সংগৃহীত ‘ডাকার্ণব’ তাঁর সম্পাদনায় হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা নামে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ থেকে প্রকাশিত হয়। হরপ্রসাদ সবগুলি পুথিই বাংলায় রচিত বলে মনে করেন। পরবর্তী গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এর মধ্যে কেবল ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ পদ-সংকলনের
ভাষা বাংলা, অপরগুলি অপভ্রংশে লেখা। এগুলির রচনাকাল সম্পর্কে দুটি মত প্রচলিত আছে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর অনুবর্তীরা মনে করেন, এগুলি দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর রচনা, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও তাঁর অনুসারীরা মনে করেন, এগুলি সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে লিখিত। ৬ষ্ঠ পৃষ্ঠায়