সড়ক তুমি কার

‘নির্মাণাধীন সড়কের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো জনবসতি কিংবা গ্রাম নেই’

আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান

‘জঙ্গি সম্পৃক্ততা’য় অভিযুক্ত প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক শফি উল্লাহ’র বাগানে যেতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে সরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করা হচ্ছে রাস্তা। সোনাইছড়ি ইউনিয়নের জুমখোলায় পাহাড় কেটে পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সাড়ে তিন কিলোমিটার ইটের (সলিং) রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারও অধ্যাপক শফি উল্লাহ। বর্তমানে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কোনো পদে নেই তিনি। কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা’র সঙ্গে তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে তার (শফি উল্লাহ’র)। চেয়ারম্যানের সঙ্গে ঘনিষ্টতার সুবাদে ভাগিয়ে নেয়া উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী। সড়কের অধিকাংশ স্থানেই বালির পরিবর্তে পাহাড়ের বালি মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অধ্যাপক শফি উল্লাহ নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি এবং নাইক্ষ্যংছড়ি সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটির সাবেক সভাপতি ছিলেন। কিন্তু জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে কয়েকবার আটক হওয়ার পর পদগুলো থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, পার্বত্য জেলা পরিষদের সরকারি অর্থায়নে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের জুমখোলায় জনস্বার্থবিরোধী একটি রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। চলমান উন্নয়ন কাজটির আশপাশের প্রায় ৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো জনবসতি এবং পাহাড়ি-বাঙালি কারো গ্রাম নেই। তাহলে কার স্বার্থে, কার উন্নয়নে সরকারি অর্থায়নে রাস্তাটি নির্মাণ করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা অধ্যাপক শফি উল্লাহ’র বনায়ন ও ফলজ বাগান রয়েছে ওই এলাকায়। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পার্বত্য জেলা পরিষদ বান্দরবানের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা’র ঘনিষ্টজন হওয়ার সুবাদে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি পরিচয়দানকারী অধ্যাপক শফি উল্লাহ’র বাগানে যাবার জন্যই সরকারি অর্থায়নে রাস্তাটি নির্মাণ করা হচ্ছে। জনস্বার্থ বিবোচনায় নয়। আপাতত স্থানীয় জনসাধারণের কোনো কাজেই আসবে না নির্মাণাধীন সড়কটি। তবে সোনাইছড়ি জুমখোলা হয়ে সড়কটি পরবর্তীতে চাকঢালার চাথুই পাড়ায় গিয়ে যুক্ত হবে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে গোপন টেন্ডারে পাওয়া উন্নয়ন কাজটি মং বাহাইন আকাশের নামীয় সাঙ্গুওয়ে লাইসেন্সে বাস্তবায়ন করছেন আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক শফি উল্লাহ নিজেই। তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার ব্যবসায়িক সহযোগী সুমন দাশ এবং একসময়ের শিবিরনেতা আমিনুল ইসলাম। নিম্নমানের ইট-বালি ব্যবহার করে দায়সাড়া ভাবে নির্মাণ কাজটি দ্রুত শেষ করতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে শ্রমিকেরা। সড়কের অধিকাংশ স্থানেই বালির পরিবর্তে পাহাড়ের বালি মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। রাস্তা নির্মাণের জন্য দু’পাশের অনেকগুলো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়াই স্কেভেটর দিয়ে কাটা হয়েছে পাহাড়ও। সাড়ে তিন কিলোমিটার ইটের (সলিং) রাস্তাটি নির্মাণের জন্য পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে টেন্ডার দেখানো হয়েছে। তন্মধ্যে শুধুমাত্র মাটি কাটার জন্য ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। অথচ মাটি কাটায় দুই লাখ টাকাও লাগবে না বলে স্থানীয়দের অভিমত।
নির্মাণ কাজের শ্রমিক জসিম উদ্দিন বলেন, রাস্তা নির্মাণ কাজের ঠিকাদার শফি উল্লাহ। তার অধীনে ফুটে ৬ টাকা দামে রাস্তায় ইট বিছানো এবং বালি দেয়ার কাজটি করছি।
সোনাইছড়ি ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতি বিজয় মারমা’সহ কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, নির্মাণাধীন সড়কের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো জনবসতি এবং গ্রাম নেই। তাই বলতে পারি জনস্বার্থে রাস্তাটি করা হচ্ছে না। শুনেছি শফিউল্লাহ’র বাগান রয়েছে জুমখোলার শেষপ্রান্তে। রাস্তার নির্মাণ কাজও তিনি করছেন শ্রমিক দিয়ে। নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে।
সোনাইছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাহান মারমা জানান, জুমখোলায় সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি একটি সরকারি টাকার অপচয়। সড়কটি আপাতত জনগণের কোনো কাজই আসবে না। ঐ এলাকায় কোনো জনবসতি নেই। আশপাশে কোনো গ্রামও নেই। কার স্বার্থে এবং কিসের ভিত্তিতে রাস্তাটি নির্মাণ করা হচ্ছে জানি না। আমার কোনো পরামর্শও নেয়া হয়নি সড়কটি নির্মাণের ব্যাপারে।
অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক শফি উল্লাহ বলেন, সোনাইছড়িতে আমার সাড়ে তিন একর পাহাড়ি জমি আছে। কিন্তু জুমখোলায় আমার কোনো জায়গা নেই। রাস্তা নির্মাণের কাজও আমি করছি না। তিনি বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের আগের কমিটিতে আমি সহ-সভাপতি ছিলাম। বর্তমান কমিটিতে নেই। তবে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি এখনো আমি।
এ ব্যাপারে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাবুবুর রহমান জানান, সোনাইছড়ির জুমখোলায় ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে। এ প্রতিষ্ঠানে আমি নতুন এসেছি, তাই বিস্তারিত এ মুহূর্তে কিছুই বলতে পারবো না।
এ প্রসঙ্গে কথা বলতে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইলে নাম্বারে একাধিক চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি।