সড়ক এখন ঘাতকের রূপ নিয়েছে

সারা নাঈম, তওসীফ সাদমান, রাদিয়া সিফাত শিক্ষার্থী, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়

গাড়ি জিনিসটা এমনি এমনি আসেনি পৃথিবীতে। তার একটি লম্বা ইতিহাসও রয়েছে। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্র্ব সাড়ে তিন থেকে তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় (বর্তমানে ইরাক) প্রথমে আবিষ্কার হয় চাকা। এই চাকাকে বলা যায় সভ্যতার গতি। মানুষের ধীরগতির জীবনে গতি আনে এই চাকা। চাকা আবিষ্কার হওয়ার আগে মানুষ নিজেই বইতো তার যাবতীয় ভারের বোঝা। তবে সেই চাকা এখন আর নাই। আরও পরে এবং আজকে মানুষ পেয়েছে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি নামের পরিবহন।
গত ১৫ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯ দিনে চট্টগ্রাম নগর এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কসহ আশেপাশের এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪জন। এদের মধ্যে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া চারজন শিক্ষার্থী, একজন চিকিৎসক এবং একজন সরকারি কর্মকর্তাও রয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এ মৃত্যুর মিছিল থামাতে সম্প্রতি দেশের জেলা শহরে রাস্তায় নেমে এসেছিল বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্ররা। তাদের আন্দোলনের প্রতি সম্মানও দেখায় সরকার। সংসদে পাশ করেন সড়ক পরিবহন আইন। এদিকে আইন পাশ হওয়ার পর কাজও শুরু করে পুলিশ। চালকের গাফিলতিতে মৃত্যু হয়ে থাকলে এবং বিষয়টি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হলে ‘হত্যা’ মামলা দায়ের করছে তারা। এছাড়াও ফিটসেনবিহীন যানবাহন এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী গাড়িও নিয়মিত জব্দ করছে তারা। দেওয়া হচ্ছে মোটরযান আইনে মামলাও। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এই সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। থামছে না মৃত্যুর এই চলমান মিছিল।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করে যাত্রী কল্যাণ সমিতি নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির হিসাব মতে, ২০১৮ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৭ হাজার ২২১ জন। ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় এসব প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হয় প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার মানুষ। আর সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশেরই কারণ হলো চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতি। তাদের (চালক) মনোভাব ও গতির উন্নয়ন ঘটাতে না পরলে সড়ক দুর্ঘটনাও কমানো যাবে না বলে হুঁশিয়ারি করেছে বুয়েট। সড়ক মহাসড়ক এখন ঘাতকের চেহারা নিয়েছে। কদিন আগে ঢাকায় বাবার হাত ধরে কন্যা স্কুল থেকে আসছিল। গাড়ি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এখানেই শেষ নয়, গাড়িটি মেয়েটির শরীরের উপর দিয়ে চলে যায়। মেয়েটির করুণ মৃত্যু ঘটে গাড়িটি আটক করেছে কিন্তু চালক পলাতক। এ ধরনের ঘটনা নিত্যদিনই ঘটছে। দেখা যাবে ঘাতক চালক কিছুদিন পালিয়ে থেকে আবার নতুন কোন গাড়ি চালাবে। এখানে মালিক কিংবা শ্রমিক নেতাদের কি কোন দায় নেই? সম্প্রতি হাইকোর্টে বিআরটিএ-র পেশ করা প্রতিবেদনে দেখা গেল ৩৫ শতাংশ গাড়ির ফিটনেস সনদ নেই। এগুলো তাহলে চলছে কি করে?
সড়ক অব্যবস্থাপনা, বেপরোয়া চালক, নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতা আর ট্রাফিক ব্যবস্থার হযবরল এর কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। অকালে ঝরে যাচ্ছে প্রাণ।এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে দুর্ঘটনায় কর্মজীবী এবং কিশোর-তরুণরা মারা যাচ্ছে বেশি। এতো জীবনের করুণ পরিসমাপ্তির পরও কোথাও কোনো সচেতনতার দাগ লাগছে না।