সড়কে নিরাপত্তা আনয়নে করণীয়

চৌধুরী মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম

সচেতনতা, সতর্ক, মামলা, জরিমানা, কারাদণ্ড কোন কিছুতেই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা ,বেপরোয়া গাড়ি চালানো, অসম প্রতিযোগিতা, উল্টো পথে যাত্রা, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ এসব রোধ করা যাচ্ছে না। চালক হেলপার, যাত্রী, পথচারী কেউ ট্রাফিক আইন মানছে না। সামান্য তর্কের জেরে রেজাউলকে বাসের চাকায় পিষে মারার পর ঢাকায় জাতীয় বস্ত্র প্রকৌশল ও গবেষণা ইনিস্টিটিউটের ছাত্রী আসমা আকতারকে বাসের হেলপার চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় । ভাগ্যক্রমে সে বেঁচে যায়। তর্ক করলেই যাত্রীকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে পিষে মারা কিংবা গুরুতর আহত করা চালক, হেলপারদের জন্য পান্তাভাতে পরিণত হয়েছে। চালকেরা বোঝাতে চাইছে তাদের সাথে তর্ক করা যাবে না। করলে নিশ্চিত মৃত্যু। অর্থাৎ চালকেরা যাত্রী, পথচারীদের মাঝে আতংক সৃষ্টি করে মানুষকে দমিয়ে রাখতে চায়। তাই তারা কোন যাত্রীর সাথে তর্ক হলে প্রায় বলে, সোজা পিষে দেব, কিচ্ছু হবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কুষ্টিয়ায় বাসের ধাক্কায় মায়ের কোল থেকে পড়ে শিশু আকিফার দুর্ঘটনা চালকদের অসতর্কতার করুণ চিত্র । পরে শিশুটি মারা যায়। মহাসড়কে তিন চাকার যান ও ধীরগতির যান চলাচল নিষিদ্ধ, ঢাকার মূল সড়কে লেগুনা চলাচল নিষিদ্ধ, চট্টগ্রামে বিআরটিএর অভিযানে গণপরিবহন সংকটে মানুষের ভোগান্তি হলেও মানুষ তা সমর্থন করে। মহাসড়কে তিন চাকার যান বন্ধ হওয়ায় দুর্ঘটনা কমেছে।
চট্টগ্রামে বিআরটিএ’র অভিযানে গণপরিবহনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আমরা জানি সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যখন কোন অভিযান পরিচালিত হয় তখন লাইসেন্স বিহীন চালক, ফিটনেস বিহীন গাড়ি রাস্তা থেকে উধাও হয়ে যায় । অভিযানের সময় চালক, মালিক, শ্রমিক নেতারা বলে, এখন রাস্তা গরম গাড়ি বন্ধ রাখ। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে অভিযানের সময়কে ‘গরম’ আর লাইসেন্স, ফিটনেস বিহীন বিশৃংখলভাবে গাড়ি চালানোকে ‘শান্ত’ সময় মনে করে। এভাবে চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশেরা চালকদের থেকে প্রকাশ্যে টাকা নেয়ার ঘটনা এখন নিত্যদিনর। তাই চালকেরা কাগজপত্র হালনাগাদ করতে অনীহা প্রকাশ করে।
অন্যদিকে অভিযানে মানুুষ গণপরিবহন সংকটে পড়লেও সাধারণ মানুষ স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই রকম নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। অনেক চালক, মালিক মনে করে নিয়মিত অভিযান সবার জন্য মঙ্গলজনক। এখন প্রশ্ন হল, অভিযানের সময় এই কৃত্রিম পরিবহন সংকট মোকাবেলায় আমরা কি কোন পদক্ষেপ নিয়েছি? কোন পদক্ষেপ না নিয়ে অভিযান পরিচালনায় সুফল পাওয়ার নিশ্চয়তা কতটুকু ? মানুষের দুর্ভোগের কারণে কি তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে অভিযান বন্ধ থাকবে?। মোটেও নয়। অভিযান চলবে, তবে অভিযানের সময় কৃত্রিম সংকটের মোকাবেলায় চট্টগ্রামের ১৭ টি সড়কে বিআরটিএর বাস সার্ভিস চালু করলে মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে না।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রোড সংখ্যা কমিয়ে সমন্বিত আধুনিক, যাত্রীবান্ধব,সমন্বিত গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি রোডে বিআরটিএ’র দ্বিতল বাস সার্ভিস চালু সহ যাত্রীবান্ধব পদক্ষেপ নিয়ে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করলে বেসরকারি বাসের একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ হবে । যে কোন মূল্যে রোড পারমিট অনুযায়ী গাড়ি চলাচল, চুক্তি ভিত্তিক এর পরিবর্তে সিরিয়াল অনুযায়ী চললাচল, ভাড়া নিয়ে তর্ক রোধে টিকিট ব্যবস’া, নিদিষ্ট স’ানে যাত্রী উঠানামা, পার্কিং, লেন মেনে গাড়ি চালানো নিশ্চিত করতে হবে। এই নিয়মগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সড়কে বিশৃঙ্খলা অনেকাংশে কমে আসবে। চট্টগ্রামের রোড দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ২৫ বছরের পুরোনো টেম্পু, লেগুনা, টম টম, রিকশা। পুরো শহর জুড়ে ছোটযানের রাজত্ব। এসব ছোট যানের কারণে একদিকে মানুষের সময়, অর্থ বেশি অপচয় হচ্ছে অন্যদিকে দুর্ঘটনা, হয়রানি, প্রাণহানি বাড়ছে। মধ্যস্বত্বভোগী, দুর্নীতিবাজদের দুর্নীতি একদিকে যেমন গণপরিবহণে ব্যয় বাড়াচ্ছে তেমনি লাইসেন্স বিহীন চালক, ফিটনেস বিহীন গাড়ি মানুষ মারার লাইসেন্স পাচ্ছে । সড়কগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনে বিশৃঙ্খলা রোধ করা প্রয়োজন। এত কিছুর পরও যখন চালকদের কোন ভাবে যখন দমানো যাচ্ছেনা। তখন কেন ৩০২ ধারা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নিরাপদ সড়ক আইন পাশ করা হচ্ছে না তা বোধগম্য নয়। যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা, ঘন ঘন ব্রেক কষা, দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থেকে চালকেরা মানিসকভাবে আরো বেপরোয়া, উগ্র হয়ে উঠে। চালক মানেই উগ্র, ট্রাফিক আইন অমান্যকারী এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যাত্রী, পথচারীদের সাথে বাজে ব্যবহার, হয়রানি, বেশি ভাড়া আদায়সহ অনৈতিক যে কোন মানসিকতা বাদ দিতে হবে। কোন চালক, হেলপার যদি কোন যাত্রীর সাথে বাজে ব্যবহার, হয়রানি , গালাগাল, মারধর করে তার অভিযোগ প্রদানের জন্য হটলাইন চালু করে তার বিরুদ্ধে তড়িৎ পদক্ষেপ নিলে যে কোন হয়রানি কমে আসবে।
পথচারীদের শতকরা নব্বইজন ট্রাফিক আইন মানতে চান না। বিভিন্ন অজুহাতে মরণ ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারপার হন। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে অনীহা। যে কোন ট্রাফিক আইন ভঙ্গ, ফিটসবিহীন যান, লাইসেন্স বিহীন চালকের মোটা অংকের জরিমান চালু রাখতে হবে। নো হেলমেট, নো ফুয়েল একটি চমৎকার তত্ত্ব । এই তত্ত্বের প্রয়োগে মোটর সাইকেল অরোহীরা হেলমেট ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এভাবে যদি প্রতিটি জ্বালানি স্টেশনে পুলিশি প্রহরায় সব গাড়ির জন্য নো লাইসেন্স, নো ফিটনেস, নো ফুয়েল চালু করা হয় তাহলে রাস্তায় কোন লাইসেন্স বিহীন চালক, ফিটনেস বিহীন গাড়ি থাকবে না । সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সচেতনতা সৃষ্টি ও সবার মানসিকতার পরিবর্তন , সমন্বিত পদক্ষেপ ও কঠোর আইন প্রয়োগর বিকল্প নেই।
লেখক : প্রাবন্ধিক