স্মৃতির পাতা থেকে

সেলিনা হোসেন
Pic 03 18.05.18

১৯৬৪ থেকে শুরম্ন করে ২০১৬ পর্যনত্ম সময়ের হিসাবে স্যারকে আমি ৬২ বছর ধরে চিনি। অধ্যাপক মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ক্লাসের শিড়্গক। আমি বাংলা বিভাগের ছাত্রী ছিলাম ১৯৬৬-৬৮ সাল পর্যনত্ম। কিন’ লেখার জ্ঞানের শিড়্গক হিসেবে তাঁকে পাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে। ১৯৬৪ সালের কথা।
সেই বছরে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার বিভাগের অধীনে যত কলেজ আছে সব কলেজের শিড়্গার্থীদের নিয়ে একটি সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। সে বছর আমি রাজশাহী মহিলা কলেজের ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার জন্য আমার নাম পাঠানো হয়। বলা হয় প্রতিযোগিতার সাতটি বিষয়ে অংশগ্রহণ করার জন্য। তারমধ্যে একটি ছিল উপসি’ত বক্তৃতা। কলেজের প্রতিযোগিতায় বিতর্কে অংশ নিতাম। বিষয় আগে দিয়ে দেয়া হতো। তাই যুক্তি দাঁড় করিয়ে কথা বলার জন্য প্রস’ত হতে পারতাম। কিন’ তাৎড়্গণিকভাবে উপসি’ত বক্তৃতা কীভাবে করব? ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম।
বিষয়টি দেয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে কথা বলতে হবে। এত অল্পসময়ে কীভাবে নিজের চিনত্মা গোছাব ভাবতেই আমি আঁতকে উঠি। কলেজের অধ্যড়্গকে গিয়ে বলি, আপা এই বিষয় থেকে আমার নাম বাদ দিন। আমি কথাই বলতে পারব না। প্রিন্সিপাল রূঢ় কণ্ঠে বকা দিলেন। বললেন, পারতে হবে। চিনত্মা করবে। যাও।
রাজশাহী সরকারি কলেজে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। ‘আত্মারাম খাঁচা ছাড়া’ অবস’ায় নির্দিষ্ট স’ানে গিয়ে হাজির হলাম। দেখলাম উপসি’ত বক্তৃতা বিষয়ের প্রতিযোগিতার সভাপতি অধ্যাপক মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম। ওইদিন প্রথম আমি স্যারকে সামনাসামনি দেখি। সেদিন স্যার একটি বিষয়কে কীভাবে গুছিয়ে বলতে হয় সে বিষয়ে আমাদের বোঝার জন্য কথা বললেন। স্যারের কথা শুনে ভয়ের ভাব খানিকটুকু কাটে। নিজের সাহস ধরে রাখার চেষ্টা করি।
সেদিন যে বিষয়টি পেয়েছিলাম সেটি নিয়ে আমি খুশি হয়েছিলাম। ভয়ের ভাব খানিকটুকু কেটে গিয়েছিল। বিষয় ছিল ‘তালগাছ এক পায় দাঁড়িয়ে’। দ্রম্নত চিনত্মা করি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিয়েই শুরম্ন করব ভাবি। ‘তালগাছ’ কবিতাটির শুরম্নর কয়েকটি লাইন মুখস’ ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে ডাক পড়ল। স্যারের লেখা কথাগুলো মাথায় রেখে রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিয়ে শুরম্ন করলাম। তাল কুড়িয়ে পাওয়া আনন্দের কথা বলে শেষ করলাম। এটা নিজের অভিজ্ঞতার কথা। অবাধ প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়িয়ে তাল কুড়ানোর আনন্দ কত গভীর হয় সেদিন মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সেটা অনুভব করছিলাম।
রেজাল্ট ঘোষণার সময় প্রথম বিজয়ী হিসেবে নিজের নাম শুনলাম। আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটলাম স্যারকে সালাম করতে। স্যার আমার মাথায় হাত রাখলেন। এখন পর্যনত্ম অনুভব করি স্যারের হাতটি আমার মাথার উপরেই আছে। কলেজ শিড়্গার্থী হিসেবে যে হাতটি পেয়েছিলাম বাষট্টি বছর ধরে হাতটি আমার মাথার উপরেই আছে।
রাজশাহী বিভাগের এই প্রতিযোগিতায় গল্প লেখা একটি বিষয় ছিল। গল্প লিখেও প্রথম হই। ফলে গল্প লেখার প্রেরণা আমাকে পেয়ে বসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরে গল্প লিখতে শুরম্ন করি। বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়। সে সময়ে অধ্যাপক জিলস্নুর রহমান সিদ্দিকী এবং মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম স্যার ‘পূর্বমেঘ’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। দুজন স্যারের কেউই আমাকে গল্প দেয়ার কথা বলেননি। আমি তো গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেড়্গা করি যে, কবে ‘পূর্বমেঘ’ পত্রিকায় আমার একটি লেখা ছাপা হবে। একদিন মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম স্যারকে বলি, স্যার আমার একটি গল্প কি ছাপা হবে না? স্যার গম্ভীর মুখে বললেন, আরও তৈরি হও। পরে।
না, ওই পত্রিকায় আমার কোনো গল্প ছাপা হয়নি। মনের দুঃখে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যে গল্পগুলো লেখা হয় সেগুলোর সংকলন উৎস থেকে নিরনত্মর। ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত। তারও কয়েক বছর পরে স্যার যখন ‘সুন্দরম্‌’ পত্রিকা সম্পাদনা করতে শুরম্ন করেন তখন ডেকে বললেন লেখা দেয়ার কথা। এক যুগের বেশি সময় পরে তিনি মনে করেছেন এবার তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা যায়।
নিঃসন্দেহে তিনি একজন প্রকৃত শিড়্গক। শিড়্গার্থীকে শেখানোর জন্য তিনি সরাসরি পথ গ্রহণ করেননি। করেছেন ভিন্ন চিনত্মা। তিনি বলেছেন অধ্যবসয়ের কথা, ধৈর্য ধরার কথা। সৃজনশীল কাজের পরিচর্যার কথা। প্রকৃত শিড়্গালাভের কথা। এই অর্থে স্যারের হাত আমার মাথার উপরই আছে।
১৯৯৮ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর। আমার জীবনের একটি অধ্যায়ের শেষ দিন। দুইশ ঘণ্টা ফ্লাই করে পাইলট হওয়ার লাইসেন্স পাওয়ার পরে বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় লারার। আমার খুব ইচ্ছা ছিল শেষবারের মতো লারার মুখ দেখার। বাড়ি ভর্তি লোক। ঠিকমতো দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। কফিন বাক্স এসেছে বাড়িতে। আমি যাকে পাচ্ছি তাকেই বলছি, কফিন বাক্স খোল। আমি শেষবার ওকে দেখতে চাই। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন স্যার। শুনলাম, স্যার অন্যদের বলছেন দগ্ধ মেয়েটিকে ওকে দেখানোর দরকার নেই। এখন কফিন নিয়ে কবরস’ানে যাওয়া দরকার।
সেদিন স্যারের সিদ্ধানত্মই শেষ কথা ছিল। কেউ কফিনের বাক্স খোলেনি। আমি জানি স্যারের হাত তো আমার মাথার উপরেই ছিল।
‘এটিএন বাংলা’ চ্যানেলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘কথামালা’ নামের অনুষ্ঠান করছেন কয়েক বছর ধরে। স্যার প্রথম অনুষ্ঠানে আমাকে ডেকেছিলেন। এক হাজারের বেশি অনুষ্ঠান করেছেন এখন পর্যনত্ম।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘বাঙালির বাংলা’ নামে দেশ-জাতি-ইতিহাস-সংস্কৃতি নিয়ে সেমিনার করছেন। প্রতি সপ্তাহে দুই টেলিভিশনের জন্য দুটি করে নতুন বিষয় ঠিক করেন। ভেবে অবাক হই এত বিচিত্র বিষয় স্যারের মাথায় কোথা থেকে আসে। পরড়্গণে উত্তরটা সহজ হয়ে যায়। শিড়্গকতার বিসত্মার তো তাঁর জীবনে আছে। সেজন্য শিড়্গার্থীর সামনে তিনি এখনো শিড়্গক। শিখছি মুক্ত চিনত্মার বিকাশের শিড়্গা। শিখছি ইতিহাস ঐতিহ্যের সংলগ্নতায় দেশ ও জাতিসত্তার বিকাশ। শিখছি সামাজিক পরিবর্তনের নানামুখী ড়্গেত্র চিহ্নিত করার শিড়্গা।
এক সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরম্নম ছিল আমার পরিধি। তখন স্যার পড়াতেন সিলেবাসের বিষয়। আমার মূল লড়্গ্য ছিল পরীড়্গায় পাশ করার এবং ডিগ্রি লাভ করা। শেখার পাশাপাশি নিজেকে দাঁড় করানো কর্মড়্গেত্রে।