স্মৃতির ছায়াশিস

রফিকুজ্জামান রণি

মাঘের শেষটা এবারও বুধবারই পড়েছে। বছরজুড়ে শীত-কুয়াশার আনাগোনা খুব একটা ছিলো না। কিন্তু সারাবছরের কুয়াশা কি আজ একসাথেই পড়তে শুরু করেছে? রমার কাছে আজকের দিনটা দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়াল। প্রতিবছর এই দিনটি আসলে বুকের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকা স্মৃতির অগ্নিঘোড়াটা নতুন উদ্যমে লাফিয়ে ওঠতে থাকে। একেতো প্রচণ্ড শীতের প্রকোপ, অন্যদিকে শরীরটাও বিশেষ সুবিধের নয়। তারপরেও বিছানা ছেড়ে ওঠতেই হলো তাকে। সূর্য ওঠার আগে-আগে পবিত্র হয়ে ঠাকুর ঘরে কিছুকাল সময় কাটিয়ে, তারপর রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো রমা।
বেখেয়ালেই হোক আর ইচ্ছেতেই হোক- আজও ঝাঁঝরে এক-পট চাল বেশিই তুললো রমা। নিজেকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছে না সে।
চাল ধোয়ার সময় মেয়েটার উজ্জ্বল মুখখানি হঠাৎ করেই স্মৃতিপটে ভেসে ওঠলো। চোখ ছিড়ে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করলো। মেয়েটা থাকলে কি এতো সকাল সকাল বিছানা ছাড়তে হতো তাকে? সমস্ত গ্রাম টৈ টৈ করে ঘুরে বেড়ালেও ঘরের কোনো কাজের উপরে তার হাত পড়েনি কখনো?
তুলসী রমার একমাত্র মেয়ে। অনেকবছর আগে মাঘ মাসের এক বুধবারে ১৩ বছরের তুলসী হারিয়ে গিয়েছে। আর ফিরে আসেনি। সেকারণেই হয়তো বছরের স্মৃতিময় এই দিনটিতে রান্নার পাতিলে এক-পট চাল বেশিই ঢালে রমা। ভাবে, মায়ের টানে আজ হয়তো মেয়েটি চলেই আসবে। কিন্তু…
পনের বছর চলে গেলো। তুলসী ফেরেনি।
তুলসিকে হারানোর পর আচানকভাবেই আর মা হতে পারলো না রমা। ডাক্তার-কবিরাজের দাওয়াই-চিকিৎসা নিয়েও কোনোদিন মাতৃত্বের স্বাদ পেলো না সে। কিন্তু কেন যে সে সন্তান ধারণের ক্ষমতা হারালো তা সবার মতো রমার কাছেও রহস্যাবৃতই হয়ে রইলো। ফলে হারিয়ে যাওয়া তুলসীর স্মৃতিটুকুও আর মুছে ফেলতে পারলো না সে।
চাল ধোয়ার সময় মেয়েটার কথা মনে আসতেই বুকটা ধপ করে ওঠলো। কোথায় আছে আদরের তুলসী? কেমন আছে? বেঁচে আছে, নাকি …? এতো বছর পরও কি মায়ের কথা মনে পড়ে না তার! মেয়েটা হারিয়ে যাওয়ার পর পাড়ার লোকজনও সুযোগ পেয়ে সান্ত্বনা তো দূরে থাক উল্টো তুলসীর চরিত্র নিয়ে আজেবাজে মন্তব্য জুড়ে বসেছে।
২.
সাতসকালে দরজায় টোকা পড়ায় একটু বিব্রত হলো রমা। প্রথমবার খুললো না দরজা। কিন্তু একাধিকবার টোকা পড়ায় ধীরপদে এগিয়ে গেলো সে এবং তারপর দরজা খুলেই আঁৎকে উঠলো-
‘মা তুলসী, তুই!
রমা তার মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠলো সে।
যে মেয়ের প্রতীক্ষায় ছিলো এতোটা বছর, কাকতালীয়ভাবে সে কিভাবে ঘরে ফিরে এসেছে এ-যে চিন্তা করাও দুষ্কর। আবেগাপ্লুত হয়ে সে কান্নাজড়ানো কণ্ঠে মেয়েকে প্রশ্ন করলো- কোথায় ছিলি মা এতোদিন, কার কাছে ছিলি? মায়ের কথা কি একবারও মনে আসেনি?
মেয়েটি কোনো কথাই বললো না। নির্বিকার তাকিয়ে রইলো রমার মুখের দিকে।
তুলসীকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে এতোটাই আপ্লুত হয়ে পড়লো রমা তাতে বিরাট একটাা অসঙ্গতিপূর্ণ দৃশ্য তার চোখের আড়ালেই ঢাকা পড়ে গেলো। ফিরে আসা মেয়েটি অবিকল তুলসীর মতোই দেখতে কিন্তু হারানোর-কালে তুলসীর গায়ে যে পোশাক-পরিচ্ছদ ছিলো হুবহু সেই পোশাক-পরিচ্ছদই এখন গায়ে এবং শারীরিক গঠন-গাঠনেও ন্যূনতম পরিবর্তন আসেনি।
ঠোঁটের তিলটাও ঠিক আগের মতোই রয়ে গেলো। কিন্তু ১৫ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো কিশোরী পুনরায় পূর্বের অবয়ব নিয়ে ফিরে আসাটা কীভাবে সম্ভব? বয়সেরওতো তারতম্য ঘটেনি! হয়নি শারীরিক পরিবর্তনও! কীভাবে সম্ভব এটা?
বিষয়টা ক্ষণকালের জন্যেও রমার মাথায় ঢোকেনি। একযুগেরও অধিকসময় পরে মেয়েকে কাছে পেয়ে একপ্রকার বোধশক্তিহীন হয়েই সে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়তে আরম্ভ করলো-
‘এতোদিন কই ছিলি রে মা? কার কাছে ছিলি? কে তোরে দেখাশোনা করেছে? কে তোরে খাইয়েছে, পরিয়েছে?
একেরপর এক প্রশ্ন করেই চলছে রমা কিন্তু উত্তর আসেনি কোনো।
মেয়েটির মুখের কথা না ফোটায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলো সে। দীর্ঘক্ষণ তাকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ঢেলে দিয়ে বললো- ‘মায়ের সাথে রাগ করেছিস মা?’
বাকহীন তুলসীকে জড়িয়ে ধরে যখন একেরপর এক উত্তরহীন প্রশ্ন করে যাচ্ছিলো রমা- ঠিক তখনই গুটি গুটি পায়ে তার শিয়রের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে বোরকা পরিহিতা একজন নারী, চোখ দুটো তার ভিতু হরিণীর মতো অচঞ্চল! রমার নির্ভার কাঁধে সে নিজের কম্পমান হাতখানি সঁপে দিয়ে অস্ফুটস্বরে বলে ওঠলো- মা!
রমাদেবীর শরীরটা হঠাৎ করেই শিউরে ওঠলো কেনো!

আপনার মন্তব্য লিখুন