প্রতিষ্ঠার ৯০ বছরে অপর্ণাচরণ স্কুলের প্রথম পুনর্মিলনী

স্মৃতিময় প্রাঙ্গণে প্রীতিময় বন্ধন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ছুটির দিন শুক্রবার, দুপুর দুইটা। অপর্ণাচরণ স্কুলের পুনর্মিলনী উৎসবের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়নি তখনও। শুরুর কথা আড়াইটা থেকে। কিন্তু তখন স্কুল প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেল ঢোলের বাজনা আর নানা বয়সী নারীর উচ্ছ্বাসে গম গম করছে পুরো ক্যাম্পাস। স্কুলের প্রবেশ পথে দীর্ঘসময় ধরে বিরাট জটলা। একজন প্রবেশ করে তো ‘কতদিন পর তোকে দেখলাম.’ বলে আবেগে তাকে জড়িয়ে ধরে অভ্যর্থনা জানাতে আসে কয়েক নারী। না তাঁরা এদিন আর কোন নারী নয়, একেকজন যেন বেণী দুলানো চঞ্চলা স্কুল বালিকা! কারণ তাঁরা সবাই যে আজ স্কুলে তাঁদের স্মৃতিময় প্রাঙ্গণে ফিরে এসেছে। বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের স্মৃতিধন্য স্কুল অপর্ণাচরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠার ৯০ বছর পার করলেও প্রাক্তন ছাত্রী পরিষদের ব্যানারে এবারই প্রথম বারের মতো উদযাপিত হচ্ছে দুইদিনব্যাপী পুনর্মিলনী উৎসব। গতকাল ছিল উৎসবের প্রথমদিন। পায়রা এবং বেলুন উড়ানোর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করার কথা রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের। কিন্তু আবেগ কি আর এত আনুষ্ঠানিকতার বাঁধন মানে? তাই প্রকৃতপক্ষে দুপুর ২ টা থেকেই শুরু হয়ে যায় পুনর্মিলনী উৎসব।
মাথায় সাদা ক্যাপ, বেণীতে ফুলের মালা, লাল-নীল-বেগুনী বাহারি রঙের শাড়ি পরে প্রবেশ পথ পেরিয়ে এক এক জন করে এবং দলবেঁধে স্কুলে ঢুকছেন একসময়ের প্রাণবন্ত কিশোরী যারা আজ একেকজন পূর্ণ বয়সী মহিলা। বর্তমানে এদের কেউ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বা স্কুল-কলেজের। কেউ কেউ সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থসহ নানা পদে আসীন। আবার কেউ বা স্বামী-সন্তান-সংসার নিয়ে পাকা গৃহিণী সেজে দিব্যি সংসার সামলাচ্ছেন। অথচ এই একটা দিনের জন্য তাঁরা সব পরিচয় ছাপিয়ে অপর্ণাচরণ স্কুলের একসময়ের চঞ্চলা বালিকাই হয়ে উঠল!
কাউকে কাউকে ক্লাসের দুষ্টের শিরোমণি পুরনো বন্ধুটিকে এতদিন পর ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেলতেও দেখা গেছে। এদেরই একজন ১৯৭২ ব্যাচের ছাত্রী উম্মে হাবীবা। তাঁর কাছে ‘আনন্দের দিনে চোখে জল কেন’ জানতে চাইলে তিনি সলজ্জ গলায় পাশের ভদ্রমহিলার প্রতি ইশারা করে বলেন, ‘এ আমার বান্ধবী নার্গিস, স্কুল জীবনে আমরা বড় ভাল বন্ধু ছিলাম। একসাথে থাকতাম, ঘুরতাম এবং সবসময় ক্লাসের সবচেয়ে পেছনের বেঞ্চিতেই বসতাম। কিন্তু ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেওয়ার পর সে আমেরিকা চলে যাওয়ায় তাঁর সাথে আমার আর কখনও দেখা হয়নি। কিন্তু সে যে কখন দেশে এসে পুনর্মিলনীর জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছে আমি তার কিছুই জানতাম না। এখন হঠাৎ তার দেখা পেয়ে নিজেকে তাই সামলাতে পারিনি! এখানে এসে পুরনো বান্ধবী ডাক্তার শাহানা পারভীন, শ্যামলী মজুমদারসহ আরও ১৩ জনের সাক্ষাৎ পেয়েছি। এদের সবাইকে একসাথে পেয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছি। ’
কথা হয় মিলি চৌধুরী নামের একজন প্রবীণ মহিলার সঙ্গে যিনি স্কুলের ১৯৬৬ ব্যাচের ছাত্রী। তিনি সুপ্রভাতকে ধরা গলায় বলেন, আমাদের ব্যাচে আমরা শতাধিক ছাত্রী মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু এখন বেঁচে আছি আমরা মাত্র ক’জন। স্কুলে এসে সবার কথা খুব মনে পড়ছে! এই মাঠ, মাঠের ধুলি, ক্লাস রুম, বেঞ্চি সব আগের মতোই আছে। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর কষাঘাতে আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছি!’
অনুষ্ঠানসূচিতে আড়াইটায় মেয়রের উদ্বোধন করার কথা থাকলেও তা শুরু হয় বেলা ৩ টায়। প্রাক্তন ছাত্রী পরিষদের পক্ষ থেকে মেয়রকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নেওয়ার পর জাতীয় সঙ্গীতের সুরে সুরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা পর্ব শুরু হয়। এরপর মেয়র দশটি কবুতর অবমুক্তকরণ ও বেলুন ওড়ানোর মাধ্যমে পুনর্মিলনী উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এরপর রঙিন বেলুন, ব্যানার, ফেস্টুন, বিভিন্ন ব্যাচের সন অঙ্কিত সাইনবোর্ড প্রদর্শনের মাধ্যমে এক বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের হয় যা ডিসি হিল পর্যন্ত গিয়ে আবার স্কুলে এসে শেষ হয়। র‌্যালিতে বয়স্ক ও হাঁটতে অক্ষম প্রাক্তন ছাত্রীদের ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান কিংবা রিকশা যোগে অংশ নিতে দেখা যায়। নানান বয়সী নারাীদের এতবড় র‌্যালি দেখে পথচারীরা বিস্মিত হয়ে একে অপরকে ‘আজ নারী দিবস নাকি, ঘটনা কি?’ এ জাতীয় প্রশ্ন করতে শোনা গেছে! অনেক টোকাই ও শিশু-কিশোর পথচারীদের আবার এ আনন্দঘন র‌্যালিতে নেচে-গেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
র‌্যালি শেষে প্রাক্তন ছাত্রীরা স্কুলে ফিরে এসে ফটোসেশন, আড্ডা ও সান্ধ্য খাবারে অংশ নেয়। আজ পুনর্মিলনী উৎসবের দ্বিতীয় এবং শেষ দিন। উৎসব শুরু হবে সকাল ৮ টায়, যা নানা কর্মসূচির মাধ্যমে রাত দশটায় শেষ হওয়ার কথা।