স্মার্টফোন ও ফেসবুক নির্বাসনে মানবিকতা!

ফারিহা হোসেন

হালজামানায় স্মার্টফোনসহ সামাজিক নানা মাধ্যমের ব্যবহার বেড়েছে ব্যাপকহারে। এখন এটি ফ্যাশনও বটে, কিন্তু এর ব্যবহার যত বাড়ছে, ঠিক ততটাই বাড়ছে নানান সমস্যা। মানুষকে যন্ত্রে, রোবটে পরিণত করছে এই নবপ্রযুক্তির মাধ্যম। বন্ধুবান্ধব মিলে বা নিজের সঙ্গীকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাওয়া বা খেতে যাওয়ার স্মৃতিটা স্মরণীয় করে রাখতে চায় সবাই। হাতে থাকা স্মার্টফোনেই তখন ব্যস্ততা বেড়ে যায়। আড্ডার সময়টাতে দেখা যাচ্ছে সবাই পাশের মানুষের চেয়ে হাতে থাকা স্মার্টফোনের পর্দায়ই নজর রাখছেন বেশি। সেলফিসহ সকলের ছবি তুলতে ব্যস্ত স্মার্ট ফোনে এমন ঘটনা এখন প্রতিনিয়তই দেখা যায়।
সম্প্রতি মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট-এ সংশ্লিষ্ট শিষ্টাচার বা ভদ্রতা না মানার বিষয়ে ‘মিসম্যানারস’ নামে কলাম প্রকাশিত হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বন্ধুদের সঙ্গে কোনো আড্ডায় বা প্রিয়জনের সঙ্গে বাইরে বেড়াতে গেলে কেউ তার নিজের স্মার্টফোনে না তাকিয়ে কতক্ষণ পার করেন তা এখন হিসেব করতে হয় যেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাশের মানুষকে তার মোবাইল ডিভাইসে মনোযোগ দেওয়া থেকে দূরে রাখা কষ্টসাধ্য, এক্ষেত্রে কারও ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপের বিষয়টিই চলে আসে যেন অন্যভাবে, অথচ এ অভ্যাস শিষ্টাচার ও ভদ্রতা বহির্ভূত তো বটেই, একে অন্যকে নিঃসঙ্গ করে দেওয়ারও মাধ্যম বটে।
জনপ্রিয় হয়ে ওঠা স্মার্টফোন সম্পর্কে মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে লিখেছে – ডিভাইসগুলোর দিকে একটানা এভাবে তাকিয়ে থাকলে সামাজিক, মানসিক, শারীরিকসহ নানা রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানুষের মাথার গড় ভর হচ্ছে ১০ থেকে ১২ পাউন্ড। কেউ যখন ফেইসবুক বা কোনো কিছু দেখার জন্য মাথা ঝুঁকে হাতে থাকা মোবাইল ফোনের দিকে তাকায়, তখন ভূমির দিকে আমাদের মাথায় প্রয়োগ হওয়া অভিকর্ষণ বল আর ঘাড়ের উপর পড়া চাপ ৬০ পাউন্ড পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। টেকসর্ট বা কিছু দেখার জন্য ঘাড় বাঁকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে তাকানোর অবস্থাকে বলা হয় ‘টেকস্ট নেক’। এ কারণে স্মার্টফোন এখন স্বাস্থ্যগত সমস্যার অন্যতম অনুষঙ্গ। এর অতিমাত্রায় ব্যবহারে সৃষ্ট সমস্যারও অন্ত নেই। এক্ষেত্রে যেভাবে মাথা ঝোঁকানো হয়, তার ফলে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা ছাড়াও স্মার্টফোন ব্যবহারের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে মনোযোগের অভাবে সৃষ্ট অন্ধত্ব। মেরুদন্ড বিষয়ক গবেষণা প্রকাশক দ্য স্পাইন জার্নাল-২০১৭ সালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন-এর তথ্যমতে, চালচলন আর অঙ্গভঙ্গি মানুষের মনের অবস্থা, আচরণ আর স্মৃতিতে প্রভাব ফেলে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। অধিকাংশ সময় মাথা ঝুঁকিয়ে রাখলেই তা মানুষের মনকে বিষণ্ন করে তুলতে পারে। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় হচ্ছে সোজা হয়ে বসে থাকা। অ্যামি কাডি’র মতো সামাজিক মনোবিদরা দাবি করছেন, আত্মবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেও তা মস্তিষ্কে কোরটিসোল আর টেস্টোসটেরোন হরমোনের প্রভাবকে বাড়িয়ে দেয়, যা উপরের সমস্যাগুলো প্রতিরোধ করতে পারে।
সবসময় স্মার্টফোন চালু রেখে তা ব্যবহার করতে থাকার এই আচরণ আমাদেরকে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর স্বাস্থ্যগত প্রভাব ছাড়াও যদি আমরা বেশিক্ষণ মাথা ঝুঁকে রাখি, আমাদের যোগাযোগ দক্ষতা আর ভদ্রতাও কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন আমাদের শিশুদের সঙ্গে কথা না বলা অথবা তাদের সামনে বড়দের প্রযুক্তি পণ্যগুলো নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকা শিশুদের ওপর বিরূপ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলছে। অনেকে বলেছেন, স্মার্টফোন বা ফেইসবুকই সমস্যা নয়, আমরা কীভাবে স্মার্টফোন, ফেইসবুক ব্যবহার করছি তার উপর নির্ভর করে সমস্যার মাত্রা।
বর্তমানে স্মার্টফোন অতিমাত্রায় ব্যবহার সমস্যায় সব বয়সীরাই আক্রান্ত। নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আট থেকে ১৮ বছর বয়সীরা দিনের সাড়ে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় এ ধরনের মাধ্যমে ব্যয় করছে। ২০১৫ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টার এক প্রতিবেদনে জানায়,
২৪ শতাংশ কিশোর ‘প্রায় সবসময়’ অনলাইনে থাকে। বয়স্করাও যে ভালো অবস্থায় আছেন, তাও নয়। অধিকাংশ বয়স্ক ব্যক্তি দিনের ১০ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় এ ধরনের ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে ব্যয় করেন। ২০১৭ সালে গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিলসন-এর টোটাল অডিয়েন্স রিপোর্ট নামের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
সমাজবিজ্ঞানী শেরি টারকল তার বই ‘অ্যালোন টুগেদার : হোয়াই উই এক্সেপ্ট মোর ফ্রম টেকনোলজি অ্যান্ড লেস ফ্রম ইচ আদার’-এ ৩০ বছরের পারিবারিক যোগাযোগ নিয়ে বিশ্ল্লেষণ করেছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা সমপ্রতি বলেছেন, এই প্লাটফর্ম আসক্তিপূর্ণ করে বানানো হয়েছে। নিজের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার সময় তার কোনো ধারণা ছিল না যে তিনি কী করছেন। তিনি বলেন, “শুধু সৃষ্টিকর্তা জানেন যে, এটি আমাদের শিশুদের মস্তিষ্কের সঙ্গে কী করছে?” খুব বেশি সময় ব্যয় হওয়ায় তিনি নিজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন না। নিউইয়র্ক টাইমস-এ শিষ্টাচার বিষয়ে মাসিক কলাম লেখক আলফোর্ড-এর মতে, ফোনের চেয়ে কারও সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে কম প্রাধান্য দেওয়া প্রচলিত নিয়মে কিছুটা আগ্রাসী মনোভাবের পরিচয় দেয়। কোনো আড্ডায় বা কারও সঙ্গে অবস্থানকালে স্মার্টফোনের অহেতুক ব্যবহার করা উচিত না। অন্যের সঙ্গ উপভোগ এবং অন্যের কথা শোনার ক্ষেত্রে ধৈর্য শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা ঠিক না একেবারেই।
স্মার্টফোন, ফেইসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সর্তকতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি এর প্রতি অধিক মাত্রায় আসক্ত না হয়ে সামাজিক, পারিবারিক, নৈতিক, মানবিক বিষয়গুলোর চর্চায় মনোনিবেশ করা জরুরি। কারণ স্মার্টফোন, ফেইসবুকসহ সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অধিক ব্যবহার মূলত আমাদের মানবিকতাকে নির্বাসিত করছে আমাদের আগোচরে এবং সচেতন বা অসচেতন ভাবেই হোক না কেন। এ থেকে বিরত হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই আমাদের।
লেখক : কলাম লেখক