স্বেচ্ছাচারিতা কী করে হল, প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রীর

সুপ্রভাত ডেস্ক

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশে গত দশ বছরে ‘কল্পনাতীত স্বেচ্ছাচারিতার’ যে অভিযোগ করা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খবর বিডিনিউজ।
গতকাল সোমবার সকালে ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর বিকালে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দশ বছরে আমরা যে পরিবর্তনটা এনেছি, সেই পরিবর্তনটা অনেকের চোখে পড়ে না। যখন মানুষ ভালো থাকে, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়, তখন তারা বলে এটা নাকি স্বেচ্ছাচারিতা। স্বেচ্ছাচারিতা কী করে হল-এটা আমার প্রশ্ন। কী দেখতে পেল তারা?’
ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা কামাল হোসেনের উপসি’তিতে গতকাল সোমবার ঢাকার হোটেল পূর্বাণীতে ৩৫ দফা প্রতিশ্রম্নতি রেখে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়, যেখানে ড়্গমতায় গেলে ‘রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া’, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চালিয়ে যাওয়ার মতো প্রতিশ্রম্নতিও এসেছে।
বঙ্গবন্ধু আনত্মর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিজয় দিবস উপলড়্গে আয়োজিত আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেখলাম, তারা ঘোষণা করেছে-স্বেচ্ছাচারিতাকে নাকি পরিবর্তন করবে।
‘এ পরিবর্তন কী জঙ্গিবাদ সৃষ্টি, বাংলা ভাই সৃষ্টি, মানি লন্ডারিং, দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, আবার সন্ত্রাস, আবার ভুয়া ভোটার দিয়ে ভোটার তালিকা, আবার নির্বাচনের নামে প্রহসন, দেশের সমসত্ম উন্নয় ধ্বংস করে দিয়ে দেশকে সম্পূর্ণভাবে আবার অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়া? এই পরিবর্তন তারা আনতে চান? ছিল তো ড়্গমতায়। ৪৭ বছর তো দেশ স্বাধীন হয়েছে। এই ৪৭ বছরের মধ্যে ৩৯ বছর তো এরা ড়্গমতায় ছিল। কী দিয়েছিল মানুষকে? কী পেয়েছে মানুষ?’
মানুষ কিছু না পেলেও বিএনপি-জামায়াত জোটের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে বলে উলেস্নখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যাদের কথা শুনেছি, ভাঙা স্যুটকেস ছাড়া কিছুই নাই, তারা কত সম্পদের মালিক। সম্পদ শুধু দেশে নয়, দেশে আবার বিদেশে তাদের সম্পদের মালিকানার বিরাট হিসাব চলে আসছে। ঘুষ-দুর্নীতি করে তারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে।
‘আর আমদের ওপর দুর্নীতির অভিযোগ যখন এনেছিল ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আমি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক দুর্নীতি পায়নি। কানাডার ফেডারেল কোর্ট স্পষ্ট বলে দিয়েছিল, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সব অভিযোগ ভুয়া, বানোয়াট, মিথ্যা। বাংলাদেশের কোনো মানুষের মাথা হেঁট হোক-সেটা করি নাই কখনও। বরং বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে গেলে সম্মান, মর্যাদা পাচ্ছে, সেইটুকু করতে সড়্গম হয়েছি। তাহলে স্বেচ্ছাচারিতা কোথায়?’
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কী পরিবর্তন করে ফেলবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা।
‘ওনারা কী পরিবর্তন করে ফেলবে? আজকে যারা এক হয়েছে তারা কারা? একদিকে স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, সে যুদ্ধাপরাধীরা কীভাবে নমিনেশন পায়, যারা বাংলাদেশই চায়নি। আমি আর কারো নাম নিতে চাই না। মনে হয়, যেন নামটাই নেওয়া উচিত না।
‘আমার তাদের জন্য করম্নণা হয়, কারণ তারা দিকভ্রষ্ট। তাদের আর কোনো নীতি নাই। নীতিভ্রষ্ট, আদর্শহীনরা কখনও মানুষকে কিছু দিতে পারে নাই এবং দিতেও পারবে না। আমি বলব এরা বাংলাদেশের আদর্শে বিশ্বাস করে না।’
টানা দুই মেয়াদ সরকারের নেতৃত্ব দেওয়া শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের কী দুর্ভাগ্য, যারা জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দেন, যুক্তি দেখান, বুদ্ধি দেন, বড় বড় কথা বলে, আদর্শের বুলি আওড়ায়-আজকে তাদের সব ধরনের উচ্চবাচ্য কোথায় হারিয়ে গিয়ে হাত মিলিয়েছে খুনিদের সাথে, দুর্নীতিবাজ অস্ত্র চোরাকারবারিদের সাথে। কীসের স্বার্থে কেন-এটাই প্রশ্ন।’
আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, ‘আর এই দুর্নীতিবাজদের সাথে, দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাকারবারীতে যারা সাজাপ্রাপ্ত, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সাজাপ্রাপ্ত, তাদের উদ্ধার করতে নেমেছে আমাদের কিছু জ্ঞানী-গুণী এবং স্বনামধন্য, যাকে আমরা বলি একবারে আনত্মর্জাতিভাবে খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী।
‘তারা উদ্ধারকাজে নেমেছে কাদের? দুর্নীতিবাজ, খুনি, মামলার আসামী, সাজাপ্রাপ্ত এবং যুদ্ধাপরাধীদের। যে যুদ্ধাপরাধীদের আমারা বিচার করেছি, যারা সাজাপ্রাপ্ত তাদেরই ছেলেরা নমিনেশন পায় এদের হাত থেকে।’ ঐক্যফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রী কে হবে তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সরকারপ্রধান।

‘ঐক্যফ্রন্ট হয়েছে। তারা নাকী সরকার গঠন করবে। তো সরকারের প্রধান কে হবে সেটা কিন’ আজ পর্যনত্ম জাতির সামনে দেখাতে পারে নাই।
‘একটা প্রশ্ন উঠে যায় তাহলে সরকারপ্রধান কে হবে? এতিমের অর্থ আত্মসাৎকারী সে হবে? না ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানের হত্যাকারী সাজাপ্রাপ্ত সে হবে? না যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাজা দিয়েছি তাদের কেউ হবে, সেটা তো স্পষ্ট করে তারা জানায়নি। দেশবাসীকেও সেই সিদ্ধানত্ম নিতে হবে, দেশবাসীকেও বেছে নিতে হবে তারা কাকে চায়? দেশের জনগণের ওপরই এ দায়িত্ব ছেড়ে দিলাম।
টানা দুই মেয়াদে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘১০ বছর আগে আমরা দিনবদলের সনদ দিয়েছিলাম। আজকে মানুষের ঠিকই দিন বদলেছে। আজকে যারা একেবারেই হতদরিদ্র ছিল তারাও দুমুঠো খেতে পারছে। যারা গৃহহারা তাদের ঘর তৈরি করে দিচ্ছি। বিনা পয়সা ওষুধ, বই দিচ্ছি, বৃত্তি দিচ্ছি। উচ্চ শিড়্গার সুযোগ করে দিচ্ছি।’
এছাড়া প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির কথা উলেস্নখ করে তিনি বলেন, ‘মানুষের ভেতর পরিবর্তন নিয়ে এসেছি। আমরা ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। এরফলে মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে।’
২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়নত্মী পালন করা হবে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সুবর্ণজয়নত্মী যখন পালন করব তখন দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ ইনশালস্নাহ গড়ে তুলব।
‘সেজন্য আরও পাঁচটি বছর সরকারে থাকা একানত্মভাবে প্রয়োজন। সেজন্য নৌকা মার্কায় ভোট চাই। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা যেন কেউ কেড়ে নিতে না পারে। স্বাধীনতাবিরোধী, খুনি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী, গ্রেনেড হামলাকারী, দুর্নীতিবাজ, অস্ত্র চোরাকারবারি, সাজাপ্রাপ্ত খুনি আসামি এরা এদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দেবে না।’
বাংলাদেশকে কেউ আর পেছনে ফেলতে পারবে না মনত্মব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে যচ্ছে। আর কেউ বাংলাদেশকে পেছনে ফেলতে পারবে না।’
দেশের জনগণ নৌকা মার্কায় ভোট দেবে বলে বিশ্বাস শেখ হাসিনার।
‘৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের ওপর আমার আস’া আছে। বিশ্বাস আছে, বাংলাদেশের জনগণ কখনও ভুল করে না। তাদের সাংবিধানিক অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। সে সাহসও পাবে না। বাংলাদেশের জনগণ আমাদের ভোট দেবে সেটা আমি বিশ্বাস করি।’
আবার ড়্গমতায় এলে দারিদ্র্যের হার আরও ৫ থেকে ৬ শতাংশ কমিয়ে আনার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘দারিদ্র্যের হার ২১ ভাগে নেমে এসেছে। আগামী ৫ বছর ড়্গমতায় থাকলে দারিদ্র্য ৫/৬ ভাগে কমিয়ে আনতে সড়্গম হব। সেজন্যই দেশের সেবা করার জন্য আমাদের সরকারে থাকা একানত্ম প্রয়োজন।’
আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, ওবায়দুল কাদের, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আবদুর রহমান, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, লেখক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন প্রমুখ।