স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিনে শ্রদ্ধা

ড. উজ্জ্বল কুমার দেব

নোবেল বিজয়ী ফরাসি ঔপন্যাসিক রোঁমা রোঁলা স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে মজা করে লিখেছিলেন, বিবেকানন্দ দারুণ ব্যাধিতে ভুগছিলেন- ঐ ব্যাধি ছিল শক্তির আধিক্য। তাঁর ভিতর দিবারাত্র দাউ দাউ করে জ্বলছিল দুনিয়াকে আমূল বদলে দেবার জ্বালাময়ী ঐশীশক্তি। আর তিনি ছিলেন আত্মশক্তিতে ভরপুর একজন যুবক। আজ ১২ জানুয়ারি এ যুবনায়কের জন্মদিন। আজ হতে প্রায় ১৫৬ বছর আগে ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিবেকানন্দের জন্ম। তাঁর আসল নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। সন্ন্যাস গ্রহণ করার পরেই তিনি বিবেকানন্দ নামে পরিচিত হন। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন।
প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, সমাজ বিজ্ঞান, পাশ্চাত্য সাহিত্য, পাশ্চাত্য দর্শন এবং ইউরোপের ইতিহাসসহ প্রায় সব বিষয়েই তাঁর সমান আগ্রহ ছিল। পাশাপাশি হিন্দু ধর্ম তথা হিন্দু পুরাণ-বেদ, উপনিষদ, ভাগবত গীতা, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদিও তাঁর আকর্ষণের বিষয়বস্তু ছিল। তিনি শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিকতা এই দুইয়ের মেলবন্ধনে বড় হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু তার মনে এক সময় ঈশ্বরের স্বরূপ নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয় যখন তিনি কেশব চন্দ্র সেনের ব্রাহ্ম সমাজের সংস্পর্শে আসেন। পরবর্তীতে সবাইকে ক্রমাগত প্রায় একই প্রশ্ন করতেন- মশাই আপনি কি ঈশ্বরকে দেখেছেন? কিন্তু সেখানেও তিনি তার মনকে শান্ত করতে পারলেন না। কোনো জায়গায় সদুত্তর না পেয়ে তিনি দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর রামকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসেন এবং সরাসরি জিজ্ঞেস করেন তিনি ভগবানকে দেখেছেন কিনা। এই প্রশ্নের উত্তরে ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলেন, যেমনভাবে তিনি তার সামনে বিবেকানন্দকে দেখছেন তেমনভাবেই তিনি ভগবানকেও দেখেছেন। এই উত্তর পেয়ে তিনি শান্ত হন এবং রামকৃষ্ণ দেবের সান্নিধ্যে আসেন। এরপর থেকে আমরা এক অন্য বিবেকানন্দকে পাই কারণ রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বিবেকানন্দকে দীক্ষার সাথে সাথে মানবতার শিক্ষাও দিয়েছিলেন।
১৮৯৩ সালে তিনি শিকাগো ধর্মসভায় যোগদান করার উদ্দেশ্যে রওনা হন। হাজার বাধার সম্মুখীন হয়েও তিনি এই সভায় যোগদান করেন এবং ভারতবর্ষের সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সনাতন ধর্মকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেন। আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে তিনি সনাতন ধর্মের উদারতা, আধ্যাত্মিকতা, পরমতসহিষ্ণুতা প্রচার করে অনেক অনুগামী তৈরি করেন। পরবর্তীতে ১৮৯৪ সালে তিনি নিউইয়র্কে বেদান্ত সোসাইটি অফ নিউইয়র্ক প্রতিষ্ঠা করেন।
বিবেকানন্দ সারা জীবন ধরে মানবধর্মের উন্নতি ও উত্তরণের জন্য কাজ করেছেন। মানুষের সেবা করা তাঁর মূল ধর্ম ছিল। তিনি বার বার বলেছেন “আমি সেই ভগবানের পূজা করি, যাকে তোমরা ভুল করে মানুষ বলে ডাকো”। তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ধর্ম বা যে ঈশ্বর বিধবার অশ্রুমোচন করিতে পারে না অথবা অনাথ শিশুর মুখে একমুঠো খাবার দিতে পারে না, আমি সে ধর্মে বা সে ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। যত উচ্চ মতবাদ হউক, যত সুবিন্যস্ত দার্শনিক তত্ত্বই উহাতে থাকুক, যতক্ষণ উহা মত বা পুস্তকেই আবদ্ধ, ততক্ষণ উহাকে আমি ধর্ম নাম দিই না। চক্ষু আমাদের পৃষ্ঠের দিকে নয়, সামনের দিকে-অতএব সম্মুখে অগ্রসর হও, আর যে ধর্মকে তোমরা নিজের ধর্ম বলিয়া গৌরব কর, তাহার উপদেশগুলো কার্যে পরিণত কর-ঈশ্বর তোমাদিগের সাহায্য করুন’। তাঁর জ্ঞানের কোনো সীমা ছিলো না। তিনি ধর্মের ভেদাভেদ মানতেন না। তিনি মুক্ত চিন্তাধারার মানুষ ছিলেন এবং জীব সেবার মধ্যে দিয়েই তিনি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলতেন, জীব হচ্ছে স্বয়ং শিব। স্বামী বিবেকানন্দ রচিত ‘সখার প্রতি’ কবিতাটি ছিল একটি জীবন্ত বেদ। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছিলেন, তা হলো ‘যত মত তত পথ’। তিনি বলতেন কোন ধর্মের সাথে আমাদের বিবাদ নাই। তিনি পৃথিবীর সকল মানুষের মুক্তির মধ্য দিয়ে নিজের মুক্তির কথা ভাবতেন। যুবকদের প্রতি নিজে জেগে অপরকে জাগ্রত করার কথা বলতেন। অনেকেই আজকাল হিন্দুধর্ম সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জ্ঞান বিবেকানন্দের রচনা থেকেই আহরণ করেন। তিনি ছিলেন পথদ্রষ্টা, পুরো বিশ্বের পথপ্রদর্শক, সকলের গুরু তাঁর ভাবাদর্শে চলতে শিখতে চায় যুবসমাজ। আজকের এই দিনে এ মহান যুবনায়কের প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: অধ্যাপক, চট্টগ্রাম প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়