স্বাধীনতা ও সোনার বাংলার কবি বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথ

এমরান চৌধুরী
Untitled-1

ইংরেজি বারো মাসের মধ্যে অষ্টম মাসের নাম আগষ্ট। এ মাস শোকের মাস। নিরন্তর কান্নার মাস। কষ্টের মাস। যাপিত জীবনের অনেক কিছু বদলে দেওয়ার মাস। বাঙালির জাতীয় জীবনে শেকড় ধরে নাড়া দেওয়ার মাস। কারণ এ মাসের প্রথম অর্ধে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন দু’ দু’জন মহোত্তম মানুষ, যাঁদের একজন হাজার বছরের শেকড়হীন একটি জাতিকে দিয়েছেন শেকড়ের সন্ধান। অন্যজন সে জাতির মাতৃভাষাকে উন্নীত করেছেন এমন এক উচ্চতায় যার কোনো তুলনা হয় না। হাজার বছরের বাংলার এ শ্রেষ্ঠ দু’ সন্তান হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
আমাদের ইতিহাসের সবচাইতে উজ্জ্বল, দামি, স্বমহিমায় ভাস্বর এ দুটো মানুষ সম্পর্কে জীবনের শুরুতেই আমাদের জানা প্রয়োজন । বলা যায় এটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। খাবার যেমন আমাদের ক্ষুধা নিবারণ করে, ফুল যেমন মনও চোখকে বিমুগ্ধ করে, তেমনি দেশ ও জাতি বিনির্মাণে যাঁদের রয়েছে অসীম ত্যাগ ও সাধনা তাঁদের এ অনন্য অবদানের কথা প্রত্যকেরই জানা প্রয়োজন। আমরা যদি দেশ সম্পর্কে না জানি, দেশের মাটি ও তার সৌন্দর্য সম্পর্কে না জানি, এ দেশের পেছনে কার কী অবদান তা না জানি তাহলে তো আমরা তিমিরেই থেকে যাবো। আমাদের মহোত্তম মানুষ, মহোত্তম অর্জন সম্পর্কে যদি আমাদের অজানা, অদেখা থেকে যায় তাহলে আমাদের মতো দুর্ভাগা আর কেউ হতে পারে না।
এক অজপাড়াগাঁর খোকা থেকে যিনি শেখ মুজিব, শেখ মুজিবুর রহমান থেকে বঙ্গবন্ধুর অভিধায় অভিসিক্ত হয়েছিলেন তিনি তো আর সাধারণ মানুষ হতে পারেন না। সাড়ে সাত কোটি মানুষের অন্তরে লালিত অথচ অপ্রকাশিত স্বপ্নকে তিনি উসকে দিয়েছিলেন। যিনি নিজ সম্মোহিত শক্তির বলে হ্যামিলনের বংশিবাদকের মতো জড়ো করেছিলেন সমগ্র বাঙালিকে । তাঁদের ভেতরের সুপ্ত স্বপ্নকে প্রজ্বলিত করে এক অসম সমরে শুধুমাত্র অদম্য আকাংখাকে পুঁজি করে ছিনিয়ে এনেছিলেন বহু কাংখিত স্বাধীনতা। এ দেশ, এ মাটি, এ জাতির শিয়রে পরিয়ে দিয়েছিলেন জয়টীকা। এ জয়টীকা ছিনিয়ে আনতে তাঁকে লড়তে হয়েছে সেই কৈশোর থেকে। স্কুলের ছাদ মেরামতের দাবি নিয়ে যে কিশোরটি মুখ্যমন্ত্রীর পথ আগলে দাড়িঁয়ে জীবনের প্রথম দাবি আদায় করে তাঁদের নজর কেড়েছিলেন তিনিই পরবর্তীকালে হয়েছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। তারপরের ইতিহাস পাড় ভাঙার ইতিহাস। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে একের পর এক ইতিহাস সৃষ্টি করে পৃথিবীর মানচিত্রে সংযোজিত হয় একটি দেশ, যার নাম বাংলাদেশ।
এই সে বঙ্গবন্ধু, যিনি পলাশীর আম্রকাননে অস্তমিত সূর্যকে নতুন করে উপহার দিয়েছেন বাঙালি জাতিকে। দিয়েছেন একটি লালসবুজের পতাকা, একটি মানচিত্র আর একটি নাম বাংলাদেশ। দেশের প্রতি ভালোবাসা, দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছিল তাঁর তুলনাহীন। এমন মানুষের পক্ষেই তাই মানায় এমন স্পর্ধিত উচ্চারণঃ ুফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা।চ
বিদেশের মাটিতে মৃত্যুর মুখোমখি হয়েও তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। স্বদেশের মাটিতে ফিরে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় দেশের মাটিতে কিছু কুলাঙ্গারের হাতে তিনি নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। পিতৃহত্যার এ জঘন্যতম গ্লানি আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
আরেক বাঙালি বাংলা সাহিত্যর বটবৃক্ষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ বটবৃক্ষের শাখা প্রশাখা এতই বিস্তৃত যে এক জনমে তার রস আস্বাদন মোটেই সম্ভব নয়। তিনি বিশ্বকবি। তাঁর নামের আগে বিশেষণই বলে দেয় বিশ্বব্যাপী তার পরিচিতির ব্যাপকতা। তিনি তাঁর কবিতায় সব সুন্দরের সমাবেশ ঘটিয়ে সাজিয়েছেন সোনার তরী। তাঁর লেখা গান আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। তাঁর নাটক নির্মল বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক অসংগতি থেকে মুক্তির পথ উন্মোচন করে। তাঁর প্রবন্ধের স্বদেশ ভাবনা আমাদের মেধা ও মননে পুষ্টি যোগায়। তিনি চিত্রশিল্পী। ষাটোত্তর বয়সেও তাঁরর আঁকা চিত্রকর্মগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রশংসিত হয়।
তিনি দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক। তিনি বিজ্ঞানমনস্ক লেখায়ও মনোনিবেশ করেছিলেন। তাঁর শেয় দিককার লেখায় বিজ্ঞানের জটিল বিষয় নিয়ে নিরন্তর ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। ইউরোপ ভ্রমণকালে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ তাঁর বিজ্ঞান চেতনাকে শানিত করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন কালজয়ী প্রতিভা। কালজয়ী প্রতিভা মাত্রই দেশকালের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। ১৯১৩ সালে তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি এ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। আমরা যতই রবিঠাকুর পাঠ করবো ততই বেরিয়ে আসবে তাঁর নতুন নতুন পরিচয়। তাঁর গান, চিঠিপত্র, ডায়েরি আর ছোটগল্প পাঠে বার বার নতুনভাবে আবিস্কার করবো আমাদের এ প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশকে। আর প্রাণ খুলে গাইবো-‘ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে। ’
শোকের মাস আগষ্টে হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। সে সাথে স্মরণ করছি তাঁর পরিবারের কনিষ্ঠতম সদস্য রাসেলসহ সকল শহীদদের। এসো আমরা সবাই বেশি বেশি করে বঙ্গবন্ধুর ওপর পড়াশোনা করি। সে সাথে বহু বর্ণিল রবীন্দ্রনাথ পাঠ করে জেনে নিই স্বাধীনতার কবি ও সোনার বাংলার কবির সাধনার কথা।এটাই হবে দু’কবির প্রতি সর্বোত্তম শ্রদ্ধা।