‘স্বর্ণ পাতিলে’র লোভে…

মোহাম্মদ রফিক

গুপ্তধনের কথা উঠলেই চোখে ভেসে ওঠে সোনা, হীরা-জহরতসহ নগদ মুদ্রার সম্ভার। প্রাচীন আমলে মাটির নিচে এ অমূল্য সম্পদ লুকিয়ে রাখতো গৃহস’রা। গুপ্তধনের মোহ কাউকেই ছাড়ে না। অনেকে গুপ্তধনের খোঁজ পেয়ে তৃপ্তির হাসি হাসলেও মো. আলী নামের ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। প্রতারক এক নারীর ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন হাটহাজারী উপজেলার নতুনপাড়া এলাকার আবু সৈয়দ মিয়া বাড়ির এ বাসিন্দা। ‘জিন চালানের’ মাধ্যমে মো. আলীর বসতঘরের নিচে স্বর্ণভর্তি পাতিল পাইয়ে দেয়ার নামে ২৮ লাখ আত্মসাৎ করেছেন ওই নারী। শুধু তাই নয়, ওই নারীর কথায় স্বর্ণের পাতিল খুঁজতে গিয়ে তিনি নিজের বসতঘরটিও ভেঙে ফেলছেন। কিন’ দেখা পাননি সেই গুপ্তধনের। এখন পরিবার নিয়ে অন্যের ঘরে ভাড়ায় থাকছেন। বিষয়টি গড়িয়েছে হাটহাজারী থানা পুলিশ পর্যন্ত।
ভুক্তভোগী মো. আলীর লিখিত অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ২০-২২ বছর ধরে একই এলাকার এম আলীর মালিকানাধীন ভবনের তৃতীয় তলায় ভাড়ায় আছেন ফাতেমা বেগম ও তার পরিবার। স্বামী আবদুর রাজ্জাক চাকরি করেন সরকারি একটি সংস’ায়। কথিত আছে. ‘জিন চালানের’ মাধ্যমে ফাতেমা বেগম বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করেন। এ কারণে তার বাসা ঘিরে প্রতিদিন অসংখ্য নারী-পুরুষের ভিড় জমে।
২০১০ সালের কথা। একদিন ফাতেমা হাজির হন মো. আলীর বাড়িতে। বলেন, ‘আপনার (মো. আলী) ঘরের মাটির নিচে স্বর্ণভর্তি পাতিল আছে। এটি উদ্ধার না করলে আপনার সন্তানদের বড় ধরনের ক্ষতি হবে। সন্তানদের কথা চিন্তা করে ফাতেমার কথায় রাজি হন মো. আলী। ফাতেমা কথা দেন, ‘জিন চালানে’র মাধ্যমে স্বর্ণভর্তি পাতিলটি মাটির নিচ থেকে তোলা হবে। ওই স্বর্ণভর্তি পাতিল তুলতে আরেক দিন মো. আলীর বাড়িতে হাজির হন ফাতেমা। গভীর রাতে ‘জিন চালানে’র নামে নানা নাটক করতে থাকেন ফাতেমা। এক পর্যায়ে বলেন, ‘স্বর্ণভর্তি পাতিলটি উদ্ধার করতে হলে জিনদের ৬ লাখ টাকা দিতে হবে।’
একদিকে গুপ্তধন পাওয়ার আশা, অপর দিকে সন্তানদের কথা চিন্তা করে ফাতেমাকে টাকা দিতে রাজি হন মো. আলী। এরপর তিন দফায় দুই লাখ টাকা করে নগদ মোট ৬ লাখ টাকা ফাতেমাকে দেন আলী।
কিন’ দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। ‘স্বর্ণের পাতিল’ এর দেখা পান না মো. আলী। তবুও আশা ছাড়েন না। গুপ্তধনের দেখা পেতে তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। এভাবে চলে যায় ৮ বছর। ইতোমধ্যে স্বর্ণের পাতিল পাইয়ে দেয়ার কথা বলে মো. আলীর কাছ থেকে মোট ২৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন ফাতেমা।
সর্বশেষ ঘটনা গত বছরের নভেম্বর মাসে। এবার সেই স্বর্ণের পাতিল উদ্ধার করতে চূড়ান্ত ‘অভিযানের’ ঘোষণা দেন ফাতেমা। বলেন, ‘আপনার (মো. আলী) বাড়িটি ভেঙে ফেলুন। স্বর্ণের পাতিল পেলে সেগুলো বিক্রি করে আপনাকে ৬০ লাখ টাকা দেব। এ টাকা দিয়ে নতুন একটি বাড়ি নির্মাণ করতে পারবেন। এবার গুপ্তধনের টাকায় নতুন বাড়ি নির্মাণের আশায় বুক বাঁধেন মো. আলী। ভেঙে ফেলেন নিজের জম্মভিটার সেমিপাকা বাড়িটি। এর আগে পার্শ্ববর্তী আরেকটি বাড়ি পরিবারের জন্য ভাড়া নেন। দিনটি ছিল ২০ নভেম্বর ২০১৮। ফাতেমার কথায় শ্রমিক লাগিয়ে বসতঘরের মাটি খুঁড়ে ফেলেন আলী। গভীর রাতে খুঁজতে থাকেন সেই স্বর্ণভর্তি পাতিল। কিন’ বিধি বাম। দেখা পাননি সেই গুপ্তধনের। অবশেষে ৮ বছর পর আলী বুঝতে পারলেন গুপ্তধন নয়, ফাতেমা বেগম তার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। নিজের কষ্টার্জিত এবং সন্তানদের আয় থেকে সঞ্চয় করা ২৮ লাখ টাকা হারিয়ে এখন দিশেহারা তিনি। মো. আলী বলেন, ‘আমাকে সর্বস্বান্ত করেছে ফাতেমা। পুলিশকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আমার ২৮ লাখ টাকা উদ্ধারে পুলিশের সহযোগিতা চাই।’
ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা হাটহাজারী থানার ওসি (তদন্ত) শামীম আহমেদ গতকাল রাতে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ওই নারী মূলত প্রতারক। ভুক্তভোগী মো. আলী তার কাছ থেকে ২৮ লাখ টাকা আত্মসাতের দাবি করলেও অস্বীকার করছেন ফাতেমা বেগম। তবু ঘটনার তদন্ত চলছে। প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস’া নেয়া হবে।’