স্বর্গীয় সুন্দর হোক পৃথিবীর সব বাবা-সন্তানের সম্পর্ক

প্রজ্ঞা আহম্মদ জ্যোতি

একবার বাবা ভারত থেকে ফেরার সময় ছোটবোনের জন্য টেডিবিয়ার এবং আমার জন্য একটা বই এনেছিলেন। সেবার খুব অপমানিত হয়েছিলাম এটা ভেবে যে,ওর জন্য টেডিবিয়ার! আমার জন্য কেন বই? রাগে ক্ষোভে আমি বইটা তখন ছুঁয়েও দেখিনি।
প্রায় বছরখানেক পর স্কুলে গ্রীস্মের ছুটি দিল। তখন আমি ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্সে। ওই সময়টায় আমার ধীরে ধীরে বই পড়ার প্রতি নেশা জন্মাতে থাকে। কিন’ সেই ছুটিতে আমার কাছে পড়ার মতো কোনো বই ছিলো না। তখন মনে হলো বাবার দেওয়া সেই বইটা পড়ে দেখলে কেমন হয়? অবশেষে আমি বইটা পড়া শুরু করলাম। এবং বইটার ভেতরে এতটাই ঢুকে গিয়েছিলাম, নাওয়া খাওয়াই ভুলে গেলাম। সত্যি কথা এই যে বইটা ছিল আমার জীবনে পড়া অন্যতম সেরা বই। আমার বাবার দেওয়া বই এর কথা বলি।
ঢুলুঢুলু হয়ে বরফ হাঁটা পেঙ্গুইনকে-তো সবাই চেনে। মজার ব্যাপার কি জানেন! মা পেঙ্গুইন যখন ডিম পাড়ে তখন তা আগলে রাখার দায়িত্ব পড়ে বাবা পেঙ্গুইনের। এমনকি ডিম্ ফুটে বাচ্চা বের হয়ে যাওয়ার পরও যদি মা পেঙ্গুইন না ফেরে, তখন বাবা পেঙ্গুইন নিজের খাদ্যনালী থেকে এক প্রকার বিশেষ পুষ্টিকর খাবার তার সন্তানকে খেতে দেন।
বাবাতো বাবাই, সে জন’ হোক বা মানুষ হোক। সারাদিন রিক্সা চালিয়ে, সব উপার্জনের টাকা শেষ করে রাতে খাবার কিনে আনা লোকটাও বাবা। ঘুমন্ত সন্তানের মুখ দেখে ভোর ছয়টা বাজে গার্মেন্টস বাসের জন্য কাজে গিয়ে, রাতে ফিরে আবার সন্তানের ঘুমন্ত মুখ দেখা লোকটাও বাবা। কারণ সে জানে প্রতিদিন সে সন্তানের ঘুমন্ত মুখ দেখলেও তার অন্তরালে জেগে থাকা যে মুখটা সন্তানের থাকে,তা রঙিন থাকতে পারে তার এই ত্যাগের মাধ্যমে।
কখনো কখনো মনে হয় বাবা মানেই বুঝি আতংক! এই বুঝি কোনো ভুল করলাম,এই বুঝি বাবার কাছে ধরা খেলাম। ছোটবেলায় দুষ্টামি বা পড়ালেখার কারণে বাবার কাছে মার খেলে মনে হতো বাবা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ। কিন’ সে খারাপ মানুষটাকেই যদি কেউ খারাপ কথা বলে তখন মনেহয় কয়েকশো টন ওজনের লোহা দিয়ে আমার মাথায় কেউ মারছে।
পুত্রকে স্কুলে ভর্তি করানোর সময় আব্রাহাম লিংকন প্রধান শিক্ষককে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লিখেছিলেন তার শেষ অংশে তিনি বলেছিলেন-‘আমার পুত্রের প্রতি সদয় আচরণ করবেন কিন’ সোহাগ করবেন না। কেননা আগুনে পুড়েই ইস্পাত খাঁটি হয়। আমার সন্তানের যেন অধৈর্য হওয়ার সাহস না থাকে, থাকে যেন সাহসী হওয়ার ধৈর্য। তাকে এ শিক্ষাও দেবেন- নিজের প্রতি তার যেন সুমহান আস’া থাকে আর তখনই তার সুমহান আস’া থাকবে মানবজাতির প্রতি। চিঠির এই অংশ থেকেই আমাদের প্রতি বাবার শাসনের মূল রহস্য জানতে পারি আমরা।
বাবারা ঠিক ওয়াল্ট ডিজনি পিকচারের অ্যানিমেশন মুভি ফাইন্ডিং নেমো-র বাবার মতো। মাতৃহারা শিশু ক্লাউনফিশ নেমো। নেমোর বাবা তাকে সাগরের নানা বিপদ থেকে আগলে রাখতে চায়, কিন’ একসময় মৎস্য শিকারিদের হাতে ধরা পরে নেমো। এরপর শুরু হয় বাবার নেমোকে উদ্ধারের সংগ্রাম।
একমাত্র মানসিক বিকারগ্রস’ বাবা ছাড়া সব বাবাই তার সন্তানকে আগলে রাখতে চায় নেমোর বাবার মতো। বাবার শাসনের মধ্যে লুকিয়ে আছে স্বর্গীয় ভালোবাসা। এই ভালোবাসা যদি সকল সন্তান বুঝতো তাহলে বৃদ্ধাশ্রম তৈরি হতো না। বৃদ্ধ বাবাকে যে সন্তান বোঝা মনে করে, সে সন্তানের হয়তো মানসিক ভারসাম্য ঠিক ভাবে গড়ে উঠেনি। কারণ এই সে বাবা যার কারণে আজ সে পৃথিবীতে,এই সে বাবা যার সাহায্যে সে হাঁটতে এবং কথা বলতে শিখেছে, এই সে বাবা যে সন্তানকে বিভিন্ন ত্যাগের মাধ্যমে নানা বিপদ থেকে রক্ষা করে বড় করেছে।
জানা যায় ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই, আমেরিকার পশ্চিম ভার্জেনিয়ার ফেয়ারমন্টের এক গির্জায় বাবা দিবস প্রথম পালিত হয়। একটা সময় বাবা দিবসকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। বাবা দিবস বললেই মানুষের কাছে হাস্যকর মনে হতো। ১৯১৩ সালে আমেরিকান সংসদে বাবা দিবসকে ছুটির দিন ঘোষণা করার জন্য একটা বিল উত্থাপন করা হয়। তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজও এই বিলটির প্রতি সমর্থন জানান। ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন বাবা দিবসকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বাবা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
প্রিয় বর্তমান বাবারা,আমরা সকলেই জানি একজন সন্তান তার বাবার কাছে কতটা ভালোবাসার। প্রত্যেক বাবা চায় তাদের শিশু ভালোভাবে গড়ে উঠুক। কিন’ তাই বলে শিশু কী চায় তা না বুঝলে চলবে না। সন্তানকে গোল্ডেন এ প্লাস বা দামি স্কুলের দাঁড়িপাল্লায় না মেপে,তার স্বপ্ন নিয়ে ভাবুন। এই বলে ভালোবাসার নামে আপনার শিশুর অন্যায় দাবি পূরণ করতে হবে তা কিন’ নয়। শিশুর অন্যায় চাহিদাগুলোকেও তাদের যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে রোধ করতে হবে। বাস্তবতার অর্থ শিশুকে বোঝাতে হবে।
সকল সন্তান তার পিতাকে অনুকরণ করে গড়ে উঠে। তাই এমন কোনো আচরণ করবেন না,যা থেকে সন্তানরা আপনার থেকে খারাপটা শেখে। বাবারা যেন সন্তানের কাছে আতংক না হয়ে বরং বন্ধু হয়। স্বর্গীয় সুন্দর হোক পৃথিবীর সব বাবা-সন্তানের সম্পর্ক।
লেখক : শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়