স্বপ্নযাত্রী

রুমানা নাওয়ার

শায়লা যথেষ্ট সুন্দরি হওয়া সত্ত্বেও তার বর আতিউর তাকে ভালোবাসে না। অথচ সুন্দরের কোন অভাব শায়লার ভিতর কমতি নেই। যে কোন পুরম্নষই শায়লার প্রেমে পড়বে। আতিউরের সমস্যা কোথায় শায়লা বুঝতে পারে না। অন্য কোথাও বাঁধা পড়ে আছে কিনা তাও জানে না। অথচ বিয়ের প্রথম রাতে এই আতিউর শায়লাকে বুকে টেনে বলেছিলো,

তোমার মতো মেয়েকে যে বিয়ের আসরে ফেলে চলে যায় সে আসলেই বোকা।আমি ধন্য তোমার মতো কাউকে পেয়ে।

শায়লা পরম সুখে চোখ বুজেছিলো সেদিন আতিউরের বুকে মাথা রেখে।

মনে মনে বিধাতাকে ধন্যবাদ দিলো আতিউরের মতো পুরম্নষ তার জীবনে যোগ করার জন্য।

শায়লার অন্য জায়গায় বিয়ে প্রায় ঠিকঠাক। ছেলে আমেরিকা প্রবাসী। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ বিয়ের।বর আসলেই আকদ সম্পন্ন হবে। শায়লা চলে যাবে শ্বশুরবাড়ি। কিন’ সেটা আর হলো না। বর আসার মুহূর্তে কে বা কারা পিসত্মল ঠেকিয়ে হুমকি দিলো শায়লাকে বিয়ে করতে গেলে লাশ হতে হবে। ছেলে তবুও এসব কথায় আমল না দিয়ে বিয়ের আসরে যেতে উদ্যত হলে মা বাধা দেয়।

দরকার নেই বাবা এমন মেয়েকে ঘরে তুলে। আমি তোমাকে হারাতে চাই না।

মায়ের কান্না বোনদের আহাজারিতে শেষ পর্যনত্ম পিছু হটে অনিক। মনের মধ্যে একটা অপরাধবোধ নিয়ে সে যাত্রায় আর বিয়ে না করে পাড়ি জমায় আমেরিকায়।

আর শায়লার অবস’া মরে যাওয়ার মতোই। সবাই দোষারোপ করতে লাগলো

অ্যাফেয়ার থাকলে বলতে পারতি আমাদের। ওখানেই বিয়ে দিতাম। এরকম নাক কেটে অপমানটা না করলে কি হতো না তোর?   বড় চাচার এ কথাতে ঝরঝর করে কেঁদে দিলো শায়লা।

কিছুড়্গণ আগেও যে বাড়িটা বিয়ের উৎসবে কলকল করে হাসছিলো। সে বাড়িটাকে এখন মনে হচ্ছে মৃত্যুপূরী। কান্নায় ঘৃণায় সবার বাকরোধ।

শায়লা বুঝে উঠতে পারলো না কে করলো তার এত বড় ড়্গতি। শাহিনের সাথে ওর লাস্ট সম্পর্কটা তো ও বাইরে পড়তে চলে যাওয়ায় আর এগোয়নি খুব। আর শাহিন কখনো এমন করবে না। আর তখন ও দেশের বাইরে।

সুন্দর হওয়ার সুবাদে শায়লাকে ছেলেরা প্রেম নিবেদন করতো হরহামেশা। একদম স্কুল পড়ার সময় থেকে। পড়ালেখায় যথেষ্ট ভালো এবং মেধাবী হওয়ার পরও শায়লা কোনমতে গ্রাজুয়েশনটা শেষ করছিল। অথচ শায়লা পড়াশোনা শেষ করে একটা ভালো অবস’ানে যাওয়ার ড়্গমতা ছিলো। কোনটাই হয়নি অবশেষে তার। এসব প্রেমঘটিত কারণগুলো তাকে অবসর দেয়নি একটুও। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনের প্রেমে আকুল হতে হতে শেষ পর্যনত্ম বিয়েটাও ভেঙে গেলো।

কেউ তার সাথে কথা বলে না। ফিরেও তাকায় না তার দিকে। বিয়ে ভাঙার পুরো দায়ভার ওর কাঁধে চাপালো সবাই। আত্মহননের সহজ উপায় জানা থাকলে বা পেলে ওটাই করতো সে। এ অবস’া তখন। চোখের নীচে কালি জমে জমে পুরো চেহারাটা বিবর্ণ হয়ে গেলো। চুল ও আঁচড়ায় না অনেকদিন। মনের কথা খুলে বলবে এরকম কাউকে ও পায়না শায়লা। নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ চলতে থাকে।

সপ্তাহ দুয়েক বাদে এক আত্মীয় আতিউরের সম্মন্ধটা  আনে। এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি। বড় চাচা আব্বা ছোট চাচা মা এবং চাচীরা স্বসিত্মর নি:শ্বাস ফেললো যেনো। ছেলে শিড়্গিত, ব্যবসায়ী। আর কোনকিছু জানার বা খোঁজ নেয়ার দৌড়ে না গিয়ে কথাবার্তা পাকা করে ফেললো। বিয়ের দিনড়্গণ দেনমোহর বরযাত্রী সব, সব।

আতিউর রহমান। নামের সাথে চেহারা ফিগার খুবই মানানসই। পছন্দ হলো সবার। শায়লা চোখ তুলেও তাকালো না। একটা অজানা আশংকা ভয় মনের ভিতর। সারাড়্গণ তাকে তাড়ায়। এই বুঝি কোন অঘটন ঘটলো আবার।

শায়লাকে দেখে আতিউরের চোখ ফেরে না যেনো। কত সুন্দর একটা মেয়ে। যেনো আকাশ থেকে কোন পরি নেমে আসলো। এরকম পরিটাকে বিয়ে না করতে পারলে তার পাপ হবে। ভীষণ রকম পাপ।

সাথে আসা বোন, বোন জামাইরা বুঝে গেলো আতিউরের মনোভাব। তারা আর দেরি করলো না মেয়েকে আংটি পরিয়ে বিয়ের দিনড়্গণ ঠিক করে ফেললো।

শায়লার সাথে কথা বলতে চাইলে সবাই দুজনকে আলাদা করে সরে পড়লো। শায়লা কোন কথাই বললো না। শুধু শুনলো আর মাথা নাড়ালো আতিউরের কথার উত্তরে। আর আতিউর কথা বলতে যেয়ে অনেক কথাই বলে ফেললো হরহর করে। এত দুঃখেও শায়লার হাসি পেলো। লোকটার হযবরল অবস’া দেখে।

অবশেষে একটা ভালো দিনে শায়লার বিবাহ কার্য সম্পন্ন হলো। কোন রূপ বিরূপ বিশৃঙ্খলা বাদে। আলস্নাহকে অশেষ ধন্যবাদ দিলো শায়লার পরিবারবর্গ।

আতিউরের খুশি আর ধরে না। এমন সুন্দর একটা মেয়ে তার বউ। আহা ভাবতেই মন পুলকিত হলো। ফুলশয্যার রাতটায় আতিউর শায়লাকে দেখলো দুচোখ ভরে।

কোন মানবীর এত রম্নপ থাকতে পারে জানতাম না আমি আগে আতিউর ঘোর লাগা গলায় উচ্চারণ করলো।

শায়লা কি বলবে কিছুই ভেবে পেলো না।

মানুষটার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠলো। পা ছুঁয়ে সালাম করতে যাবে এমন সময় হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলো শায়লাকে। শায়লা পরম আশ্রয় ভেবে আতিউরকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। আতিউর শায়লার চোখে খুঁজতে লাগলো তার অদেখা পৃথিবী।

দুজন ভাসতে লাগলো সুখের দোলায়। জীবনকে আবার ভালেবাসতে শুরম্ন করলো শায়লা। মায়া লেগে গেলো জীবনের প্রতি, আতিউরের প্রতি। আতিউরকে পেয়ে ধন্য মনে হলো নিজেকে। কিন’ বছর যেতে  না যেতেই  শায়লার আতিউরের ভালোবাসায় চিড় ধরলো। বদলে যেতে লাগলো প্রিয় মানুষটা। শায়লা কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। আতিউরকে কোন পাপে তাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে বুঝতে পারলো না ঘুণাড়্গরে। হয়তো তার অতীতের কোন উড়ো খবরে আতিউর এমন করছে না তো? শায়লার মাথায় কিছুই আসলো না। আতিউরকে কে বোঝাবে এসব

এগুলো সব তার অতীত। আর কারো সাথে তার এমন রিলেশন ছিলো না যে শায়লাকে খারাপ ভাববে। বিয়ের আগে ছেলে মেয়েদের এরকম থেকেই থাকে।

কিন’ না আতিউর কোন কথা শুনতে নারাজ। শায়লা কে ছেড়েও যাবে না আতিউর কথা দিয়েছে। কিন’ বাকি জীবনটা এভাবেই কাটাবে অবিশ্বাস আর প্রেমহীনতায়।

শায়লা উপয়ানত্মর না দেখে মার সাথে ভাইয়ের সাথে শেয়ার করলো। তারাও শায়লাকে বোঝালো ধৈর্য ধরতে। না হয় বদনাম হবে সমাজে। এমনিতে একটা বিয়ে ভাঙার পর সবাই যে ভাবে তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার উপর এসব জানলে ঢিঃঢিঃ পরে যাবে চারিদিকে। তাই শায়লা সহ্য করতে লাগলো আতিউরের অবজ্ঞা অবহেলা।

সারাড়্গণ কাজ ব্যবসা নিয়ে ব্যসত্ম থাকে আতিউর। শায়লার সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথাই বলেনা তেমন। রাতে বিশেষ প্রয়োজনে শায়লাকে কাছে টানে। শায়লাও দম দেয়া পুতুল যেন। আতিউরের ভোগে কামে সাহচর্য দেয়। প্রয়োজনে তাড়িত হয়। আকুল হয়। এর বাইরে আতিউরের সাথে শায়লার কোন সম্পর্ক থাকে না। ভালোবাসার হৃদয় দেয়া নেয়ার কোন সম্পর্ক অবশিষ্ট থাকেনা ওদের মাঝে। অদৃশ্য এক দেয়াল দুজনের মাঝে। চাইলেও বের হতে পারে না ওরা।

শায়লা হাঁপিয়ে ওঠে যেনো। এরকম জীবনযাপন চায়নি তো সে। কি নেই তার। রম্নপ যৌবন শিড়্গা দীড়্গায় পরিপূর্ণ একজন মেয়ে। তবুও এ কেমন বিচার বিধাতার। আতিউরকে দিল তার জীবন সঙী রম্নপে। তবে আবার মাঝখানে অবিশ্বাসের দেয়াল কেন তুলে দিলো দুজনের ভিতর। বাকী জীবনটা এরকম রঙহীন সং সেজে কাটাতে হবে?

শায়লার ধৈর্যের বাঁধ একসময় ভেঙে যায়। ইন্টারনেটের স্বর্ণযুগে বাস করা শায়লার বেগ পেতে হয়না আতিউরের অবহেলার সমুচিত জবাব দিতে। শাফকাত নামের এক বিবাহিত পুরম্নষের সাথে ভালোবাসার দৌড়ে নামে শায়লা। দিনের বেশির ভাগ সময় শাফকাতের সাথে কাটায়। কখনও ফোনে কখনও ইমু হোয়াটস আপে। ম্যাসেন্‌জার বঙটা ও শাফকাতের প্রেমের রাজসাড়্গী হয়ে থাকে। সবসময় বিচরণ চলে এতে দুজনের।আতিউর বুঝলেও কি না বুঝলেও কি। ওর বিশ্বাস তো কবেই ভেঙে গেছে শায়লার প্রতি। নতুন করে বিশ্বাস ভঙের আর কিই বা আছে।

শায়লা জানে না এ প্রেমের পরিণতি কী? শাফকাতের সাথে যেটা চলতেছে ওটা কে কি প্রেম বলে। নাকি ড়্গণিকের মোহ। আতিউরের অবহেলার প্রতিশোধ। এ নিরেট প্রেমহীন ভালোবাসাহীন জীবন ছেড়ে শাফকাতের কাছে চলে যাবে কি কখনো শায়লা? আবার সংশয় কাজ করে বুকের ভিতর। শাফকাত ও কি ড়্গণিকের মোহ। কেটে গেলে তো ভালোবাসাও ফুরিয়ে গেলো?

শায়লার এ দোদুল্যমানতায়  শাফকাত নিশ্চয়তার আভাস দিতে পারেনা। কারণ তার ও  যে পিছুটান আছে। ঘর আছে সংসার আছে।

আতিউরকে দেখাতে চায় শায়লা তাকেও ভালোবাসার মানুষ আছে। তার প্রেমে আকুল হয় কেউ। রূপে মুগ্ধ হয় কোন এক অচিন পুরম্নষ। যাকে ভর করে শায়লার ভালোবাসায় অবগাহন। শাফকাতকে কাছে পাওয়ার লোভ হয় শায়লার। ভীষণ লোভ। শাফকাতকে বাহু ডোড়ে বেঁধে হাঁটতে ইচ্ছে করে মধ্য নিশিতে।শিশিরে পা ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনেক দূর হেঁটে যেতে। অদূরে ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুজন মুখোমুখি।

অথবা শেষ বিকালে রিকশায় হুড তুলে সারা শহর চষে বেড়ানো। খুব রাত করে বাসায় ফেরা।জানালার গরাদ ছুঁয়ে জোছনার গলে পড়া দেখা।

অবসর যাপনে সমুদ্রকে বেছে নেওয়া। কতবার যে আতিউরকে বলেছে শায়লা।

চলো একটু সমুদ্র স্নানে।

কখনো রাখেনি শায়লার এ আবদার অনুরোধ। তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিয়েছে এসব।

শায়লা রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে সমুদ্রের ডাকে।জানালার গরাদ ছুঁয়ে জোছনা ধরার লোভে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে তারা দেখা চুপেচুপে।  তার একারই। আতিউরকে দেখাতে পারেনি কখনো। সময় কই তার।

শায়লার এ জীবনতো চাওয়ার ছিলো না। নিরেট আড়ম্বরহীন ম্যারম্যারে ভাতুরে জীবন তো শায়লার নয়। আদিগনত্ম আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন যে তার। আতিউর তো নয়ই শাফকাত ও  কি পারবে শায়লার এ স্বপ্নের সহযাত্রী হতে?