স্টেশনে বাড়ি স্টেশনে ঘর

বটতলী স্টেশন রোড। ভোরের আলো ফুটেছে মাত্র। মসজিদের মুসল্লীরা ঘরের দিকে পা ফেলছে। ফলের আড়ত আর বাস স্টেশন বলে কথা। তেমন একটা চীৎকার চেঁচামেচি হই হল্লা শুরু হয়নি তখনো। সারি সারি ভ্যানগাড়ি আর ঠেলাগাড়ি পড়ে আছে। সেই ভ্যানগাড়িতে একখানে গাদাগাদি করে শুয়ে আছে দুই বন্ধু সুজন আর বেলাল। যেনো যমজ ভাইয়ের মতোই। সঙ্গে আছে অন্যান্য শ্রমিকেরা। সারাদিন কামলা খেটে রাতে আধপেটা কিছু খেয়েছে না খেয়েছে সে ব্যাপারে তাদের কোন খেয়াল থাকার কথা নয়। সময়ের সাথে সাথে ওরা দুইবন্ধুর দিন এভাবেই পার হয়ে যায়। আজকের সকালটা তেমনই শুরু হয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।
বছর খানেক হলো, সুজন হঠাৎ নতুন স্টেশনের প্ল্যাটফরমের বেঞ্চিতে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিচ্ছিল। বেলাল নিয়মমতো মাল টানাটানিতে ব্যস্ত, হঠাৎ চোখ যায় সুজনের কান্নাজড়িত মুখে। দৌড়ে এসে মাথায় রাখে হাত।
কী হয়েছে রে ভাই ? কাঁদছিস কেন ?
কোন শব্দ তো করছেই না বরং কাঁন্না আরো বাড়ছিলো। বেলালের সান্ত্বনা কোন কাজে লাগছিলো না। হঠাৎ এক পুলিশের লোক এসে তাড়া দিতেই সুজনের কান্না থামে।
এবার সুজন ধীরে ধীরে বলতে শুরু করে। সৎ মায়ের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাপের ভিটা ছেড়ে পালিয়েছে সে। মা মারা যাবার পর পরই সুজনের বাপ বিয়ে করে ফেলে। বাবাও হয়ে যায় অচেনা। বড়ো একা ও অসহায় হয়ে যায় সে। দিন দিন সৎ মায়ের অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যাওয়াতে স্টেশনে এসে তুর্ণা নিশীথা ট্রেনে চেপে বসে। আজ সকালেই ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফরমে ঠাঁই নেয়। সুজনের কথা শেষ হতে না হতেই বেলালের প্রশ্ন কোত্থেকে এসেছো জিজ্ঞেস করতেই সে নিশ্চুপ হয়ে যায়।
বলতে চায়নি কোনোদিন কোন জায়গা থেকে এসেছে সুজন। এটা শুনলেই সে আনমনা হয়ে যায় আজো। এভাবেই দিনগুলো পার করে একে একে কীভাবে যে অনেকটা বছর পার করে ফেলেছে নিজেই জানে না। ওপরওয়ালার ইচ্ছায় ভাগ্য সহায় হয়েছে বলেই রক্ষা। পাশে বেলালের মতো বন্ধু ভাই পেয়ে আজও জীবনে বেঁচে থাকাটা সম্ভব হয়েছে। শুধু বেঁচে থাকাটাই নয় একটা আনন্দময় পরিবেশের জায়গা ধীরে ধীরে খুঁজে পেয়েছে ওরা দু’বন্ধু। সকালের আলো ধীরে ধীরে আরো তীব্র হতে শুরু করেছে। হঠাৎ ভ্যানগাড়ি থেকে লাফ দিয়ে ওঠে বেলাল। সজোরে ধাক্কা দেয় সুজনকে, কী রে উঠবি না ঘুম থাইক্যা ? চোখ কাচুমাচু করে সুজন বলে, স্বপ্নে আমাগো গ্রামের নদী, শাপলা ফুল ও মাঠের শিউলী ফুল দেখতাছিলাম। কী সোন্দর জানোস, তুই তো দেহোস নাই কুনুদিন?
দিলি তো মজার ঘুমটা ভাইঙ্গা?
আর কতোক্ষণ ঘুমাইবি দোস্ত? কাজে যাইতে অইবো না, না অইলে খামু কী? বেলাল তাৎক্ষণিক জবাব দেয়।
– চল ল যাই। সুজন বলে।
– আমাগো আবার কিসের স্বপ্ন-টপ্ন! কামলা খাটুম। যা আয় রোজগার অইবো তাই দিয়া খামু। আর সুযোগ কিচু পাইছি বইলা ইস্টিশান রোডের স্কুলটাতে পড়বার পারতাছি। না অইলে তো আমাগো জীবনডা যে কতো কঠিন হইয়া যাইতো তা কেডা কইবো ?
চল, আবার বইসা পড়লি ক্যান, অনেক গল্প টল্প তো বইলা ফেললি।
না রে দোস্ত শতেক কষ্টের মইধ্যেও আমাগোরেও আল্লাহ বাঁচাই রাখছে।
কী কইলি তুই?
হ, ঠিকই কইছি…।
এভাবে রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠবার সময় দুই বন্ধুর কথাবার্তা যেন শেষ হতে চায় না। আজও এমন একটা পরিসি’তির মধ্যে দিয়ে সকাল শুরু হয়ে যায় তাদের। বেলাল যেমন মা বাপ ছাড়া এতিম স্টেশনের পাশেই বড় হয়ে ওঠে। সুজনকেও তার সঙ্গী করে বাকি জীবনের উদ্দেশ্যহীন যাত্রায় পা বাড়ায় বেলাল। প্রতিদিন স্টেশনে এসে কুলিগিরি করে যা পায় তা দিয়ে কোনোমতে পেটে ভাতে পার করে দেয়। কুলির সর্দারকে দিয়ে ফেলতে হয় অর্ধেক টাকা। তার মধ্যেও আবার মাস্তানদের দিয়ে দিতে হয় ট্যাক্স। মারধর খাওয়া তো আছেই, ফাই ফরমায়েশ খাটা সবই করতে হয়। নাহলে তো জীবন রাখাটাই দায় হয়ে যায় এই সব কিশোরদের। নাম সমাজহীন বলেই বেলাল সুজন একেবারে আলাদা ভাবে বসতি স’াপন করে ভ্যানগাড়িতে। নইলে স্টেশন রোডের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকার সুযোগ পাওয়া যায় মাঝে মাঝে। পড়ালেখাটাও যে এক আধটু যে হচ্ছে না, তা না। যা শহরের ইট পাথরের দেওয়ালে আবদ্ধ বড়লোকদের জানার কথা নয়। এই শহরেও অনেক বেলাল সুজন কতো কষ্টে যন্ত্রণায় দিন পার করছে ধীরে অতি ধীরে। কেউ জানে না। কেউ তার খবর রাখে না। কখনো গল্প । কখনো স্বপ্ন । কখনো কষ্টের সহজ চিত্রই স্পষ্ট করে ধরা দেয় বেলাল সুজনরা। এতো কষ্ট সইবার পড়েও আশেপাশের অশুভ চিন্তা তাদের ছায়া ফেলতে পারেনি।
বিকেলের আলো কমে এসেছে। সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে আসে। বেলাল সুজন এগিয়ে যেতে থাকে রেল লাইনের পথ ধরে। ১০/১২ বছর বয়সী এ সাহসী কিশোর দু’জন হাঁটতেই থাকে অজানা গন্তব্যে। যেখানে অন্য ছেলেরা হয়তো ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যাবার কথা। রেল লাইনে কাটা পড়বে, না অন্ধকারে কোন বিপদ ঘনিয়ে আসবে কোনো খেয়ালই তারা করছে না। ছুটছে বাঁধনহারা হয়ে। তাদের গতি যেনো থামছেই না। অদ্ভুত সুন্দরভাবে বেলাল সুজন হাত ধরাধরি করে ছুটেই যাচ্ছে। তাদের বলার বা রুখে দেয়ার কেউ নেই। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে ওরা পাহাড়তলী স্টেশন পেরিয়ে যায়। খানিকটা পথ এগোলেই কৈবল্য ধাম স্টেশন এসে পা পড়বে। কোনদিকে যাচ্ছে কী উদ্দেশ্যে তারা ছুটছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এভাবে আলো আঁধারির মধ্যে পথ চলতে চলতেই হঠাৎ দু’বন্ধুকে দেখা গেলো পাহাড়ের পথ ধরে ছুটে যেতে। এইভাবে অজানা গন্তব্যে ছুটে চলাটা আজকাল তাদের খেলায় পরিণত হয়েছে।
পরদিন সকাল সকাল। আবারো স্টেশনে তড়িঘড়ি দুইবন্ধুর আনাগোনা শুরু হয়ে গেলো। গতরাতের উদ্দেশ্যবিহীন যাত্রা আর ক্লান্তির ছায়া পড়ে আছে দু’জনেরই চোখে মুখে। এদিকে স্টেশনে কুলিগিরি করে অভিভাবকহীন যাত্রায় নানা সময় তারা শহরের নানা প্রান্তে দিক বিদিক ছুটেছে। কখনো রেলওয়ে সিআরবি, আমবাগান, স্টেডিয়াম পাড়া, ব্যস্ততম ন্যূমার্কেট, আন্দরকিল্লা মোড়, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা বিচ বাদ যায়নি কিছুই। বয়েস অল্প। তাতে কী হয়েছে, স্টেশন রোডের আশেপাশের বস্তি এলাকা মাদকের আখড়া, সন্ত্রাসীদের আখড়া সবকিছুতে নজর পড়েছে দুই বন্ধুরই। অগণিত শিশু কিশোরর ওইসব সন্ত্রাসী মাদকসেবীদের কবলে পড়ে যে ক্ষতির সামনে পড়ছে। তা দেখে ওরা ভয়ে ভয়ে থাকে। নিজেদের বাঁচানোর জন্যই দুই বন্ধু প্রতিদিন দিক বিদিক ছুটে যায়। না হলে বেসরকারি সংস’ার পুনর্বাসন কেন্দ্রে ঠাঁই নেয়। এইসব সমস্যার মধ্যে পড়ে সুজন বেলাল চিন্তার মধ্যে পড়ে যায়। ভাবতে থাকে কী করে বাকি দিনগুলো ওরা পার করবে? সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সুজন মাথায় হাত দিয়ে বসে প্ল্যাটফরমে শুয়ে আছে।
কী রে দোস্ত কী ভাবতাছোস? বাপ মায়ের কথা মনে করতাছোস বুঝি ? বেলাল প্রশ্ন করতে থাকে,
না রে কিছুই ভালা লাগতাছে না, কই যামু, কী করমু কিছুই বুঝবার পারতাছি না।
অহন আবার তর কী অইছে, কী সব আবোল তাবোল ভাবতাছিস,
না দোস্ত সেই যে মা মইরা গেলো, আর মাইয়েরে দেহি নাই ম্যালাদিন, না জানি মাই কব্বরে কী করতাছে ?
কী আর করবো শুইয়া আছে, তোরে দেখতাছে,
না দোস্ত আমার আর কিচ্ছু ভালা লাগে না, এই কাম কাইজ কইরা কী অইবো, আমগো তো বাঁচতে অইবো, অই সন্ত্রাসী মাস্তানগো দৌড়ানি থাইক্যা আমাগো বাঁচতে অইবো। আর কতোদিন অগো থাইক্যা পালাইয়া থাকুম? ক’দিন পর পরই তো ওরা আমাগো দুইজনরে টারগেট কইরা মাদক বিক্রি বেচায় লাগাইবার চাইতাছে। তয় তুই বইলা ফেলা ক্যামনে বাঁচুম ওগো থাইক্যা আমরা? এইসব বলতে প্ল্যাটফরমেই সুজন ঘুমিয়ে পড়ে। আর বেলাল বন্ধুর মাথায় চুলে বিলি কাটতে কাটতে নিজেই ওর পাশে ঘুমিয়ে পড়ে অজানা আশংকায়। ছোট্ট দুই কিশোর জানে না ওরা সুন্দর জীবনের পথে পা বাড়াতে পারবে কি না ?