সেশনজটের

হৃদয় ইসমাইল

দুইদিন পর রিশাদের প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একান্ন বছর পূর্তি। সারা ক্যাম্পাস সাজানো হচ্ছে অপরূপ সাজে। রাতের ক্যাম্পাস বাহারি লাইটের আলোয় দেখাচ্ছে তার আসল নৈসর্গিক সৌন্দর্য। অথচ এমন আনন্দমুখর সময়ে রিশাদের মন চেয়ে আছে বিষাদে। বাবাহীন সংসারে সে একমাত্র অবলম্বন। তাই রোজ মা দোয়া করেন এইবার যেনো ছেলের পরীক্ষাটা হয়ে যায়। নতুন টিউশনির ছাত্র দিগন্তের ডাক শুনে রিশাদের কল্পনা ছুটে যায়। তাকিয়ে দেখে চায়ে ঢোবানো বিস্কুটটি ততক্ষণে গায়েব। অথচ পেটভর্তি ভীষণ ক্ষুধা তার। বিরক্ত-মুখে চায়ের কাপ ঠোঁটের কাছে নিতেই দিগন্ত বললো- ভাইয়া, জানেন, আমিও যখন অন্যমনস্ক থাকি তখন এমন হয়।
-এমন কি হয়?
-চায়ের কাপ থেকে ভেজা বিস্কুট আস্ত তুলে খেতে পারিনা।
রিশাদ বিষণ্নমনে হাসে, পৃথিবীর সবকিছুই নির্দিষ্ট একটি টাইমিং এর ওপর নির্ভর করে। সঠিক সময়ে তুমি তুলতে না পারলে বিস্কুটও ভ্যানিশ হয়ে যাবে।
-আপনাকে একটা চামচ এনে দিই? বলেই দিগন্ত ফিক করে হেসে দিলো।
রিশাদ এক ঢোকে ঠাণ্ডা চা খেয়ে বললো- আমি যাওয়ার পরে তুমি চামচ এনে খেয়ে নিও। এখন অংকটা শেষ করো।
-ভাইয়া, আপনি কি কিছু নিয়ে ভাবছেন? আমার অংকতো অনেক আগেই শেষ!
রিশাদ লজ্জা পায় এতোটা অন্যমনস্কতায়। যদিও তার চলে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। অথচ পা যাচ্ছে না প্রিয় ক্যাম্পাসে। সে পকেটে থাকা আজকের দৈনিক পেপারটি খুলে প্রথম পৃষ্ঠার একটি খবর দেখিয়ে বললো- এই নিউজটি পড়ো। দিগন্ত জোরে জোরে পড়ে- পরীক্ষা দিতে না পারায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা। তারপর সে সংশ্লিষ্ট ছবির ক্যাপশন পড়ে- মৃত্যুর আগে শিক্ষার্থী প্রিয় মাতৃভূমির কাছে লিখে যায় সুইসাইডাল নোট (ইনসেটে শিক্ষার্থীর ছবি)। দিগন্ত আগ্রহ সহকারে পুরো নিউজটি পড়ে। অনেক কিছুই তার ছোট মাথায় ঢোকে না। সে বললো ভাইয়া, সেশনজট কি?
রিশাদ খুব সুন্দর করে সেশনজট বোঝায়। পুরোটা শুনে দিগন্ত বললো- বাহ! সেশনজটতো তাহলে খুব মজার!
-তোমার কাছে কেনো মনে হলো মজার?
-ধরুন, আমাদের স্কুলের একাদশ শ্রেণীর পরীক্ষা হলো না সঠিক সময়ে। তাহলে আমরা আস্তে আস্তে পরীক্ষার জন্য ভালো প্রিপারেশন নিতে পারবো। তারপর ধরুন, একই ক্লাসের সবাই পরীক্ষা দিতে পারলাম না, ব্যাপারটা মজার না? একজন আরেকজনকে ডিঙ্গিয়ে কেউ তো উপরের ক্লাসে যাচ্ছে না তাহলে আমার মন খারাপ কেনো হবে?
রিশাদ বললো- কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয় মানে হলো বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে তোমার পড়াশোনা। যেখান থেকে পড়লে পৃথিবীর সবদেশেই তোমাকে যোগ্য শিক্ষার্থী ভাবতে বাধ্য। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েই গ্রাজুয়েটরা নিজ নিজ স্বপ্ন ছুঁতে দৌড়ে যায়। অথচ দেখা গেলো তোমার বিশ্ববিদ্যালয় অহেতুক তোমাকে ছুটতে দিচ্ছে না। চায়ের কাপে বিস্কুটকে যেভাবে আমরা ভুল টাইমিং-এ ডুবিয়ে নিঃশেষ করে দেই, সেশনজট ঠিক সেইভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে নিঃশেষ করে দেয়।
কথাটা শুনেই দিগন্তের মন খারাপ হয়ে আসে। পত্রিকার সুইসাইড করা ছেলেটির কথা ভেবে তার কান্না আসে ভীষণ!
এলোমেলো পায়ে নিষাদ সোহরাওর্দি হলে ফিরে আসে। তার কিছু ভালো লাগছে না। হলের জুনিয়ার ভাইরা ছোট এক আবদার নিয়ে এলো- ভাইয়া, একান্ন বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে আমরা একটা ম্যাগাজিন বের করবো। আপনি প্লিজ আমাদেরকে একটা কিছু লিখে দিন। নিশাদ সম্মতি দিতেই জুনিয়াররা হৈ হৈ করে খুশিতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মা ফোন দেয় গ্রাম থেকে- বাবা, কেমন আছিস?
-এইতো মা। রাহাতের কি অবস্থা?
-হে তো এইবার নাইনে উঠবো। হের শখ বিজ্ঞান পড়ার। আমি কইলাম, অন্য কিছু নিতে। না জানি টাকার কারণে তোর মত মেডিক্যালে পড়ার ইচ্ছা বাদ দেয়। তোর চাকরিটা হইয়া গেলেও একটা শান্তি পাইতাম।
-আরে পড়াও, পড়াও। ব্যবস্থা একটা হবে।
-বাপ, বেতন টেতন কিছু পাইলি? রাহাতের নতুন ক্লাসের ভর্তি ফি দেওন লাগবো।
-ধুর চিন্তা করো নাতো মা। ১০ তারিখ পাঠিয়ে দেবো।
নিশাদ নিজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে এখন পড়ছে আর্টসের একটি বিষয়ে। টাকার অভাবে ভালো প্রস্তুতি নিতে না পারার ভয়ে স্বেচ্ছায় এসেছে এই ডিপার্টমেন্টে। তবুও ছোট ভাইকে বিজ্ঞান পড়ানোর সাহস দেয় নিশাদ। ফোন কেটে দিয়ে সে লিখতে বসে যায়। আজ তার কলম দিয়ে গল্প কবিতা বেরুচ্ছে না। শেষ দুইটি বছর সে অসংখ্য ক্লাস ফাঁকি দিয়েছে। ফাঁকি দিয়ে টিউশনির পরিমাণ বাড়িয়েছে। এতে লাভও হয়েছে সাময়িক, বাড়িতে ছোট ভাইয়ের জন্য আর মায়ের জন্য কিছু টাকা পাঠানো যায়। কিন্তু এইভাবে টিউশনি করে কি জীবন যাবে? রিশাদের চোখে পানি চলে আসে। দুইদিন পরপর মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভালো চিকিৎসা না পেয়ে না পেয়ে বেচারী দুর্বল হয়ে পড়ছে। সঠিক সময়ে চাকরি না পেলে, নিজের কামানো টাকায় মায়ের চিকিৎসা করাতে না পারলে যে ছেলে হিসেবে জীবন বৃথা!
গত ছয়টি বছর সে একই ডিপার্টমেন্টে, এখনো তার ফাইনাল পরীক্ষা হওয়ার নাম নেই। মেয়ে সহপাঠীদের অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে এসেছিলো পড়তে, তাদের ইচ্ছে ছিলো অনার্স কোর্স শেষ করেই মাস্টার্স শেষ করে ফেলবে। বিয়ের আগেই যদি কোনোভাবে পড়ালেখাটা গোছানো যায় তাহলে ক্যারিয়ার গড়াও সহজ হবে। বিধিবাম, একে একে প্রায় সবার বিয়ে হয়ে এখন তারা দিব্যি অন্যের সংসার করছে। তাদেরই বা কি দোষ, ক্লাস পরিক্ষাহীনতায় বেকার মেয়েকে তাই সুযোগ বুঝে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে বাবা মায়েরা। আর ছেলেগুলো যে যার মতো পলিটিক্স, টিউশনি, বাটা এপেক্সের দোকানে সেলসম্যানি করে কাটাচ্ছে দিন। নিষাদের মত দুই একজন পরীক্ষার আবদার নিয়ে ডিপার্টমেন্টে গেলে, উলটো ঝাড়ি খেয়ে আসতে হয় টিচারদের। সামগ্রিক কষ্ট বোঝার মত এই সংসারে কেউ নেই। নিশাদ অশ্রুভেজা চোখে নিজের ভাষায় লিখতে শুরু করে-
“সেশনজট শুধুমাত্র আমাদের একাডেমিক ক্যারিয়ারকে হয়রানির মুখে ফেলে না, আমাদের ভবিষ্যৎকেও করে তোলে অনিশ্চিত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সেশনজট সম্পর্কে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা হলো শুধুমাত্র সেশনজটের কারণেই বছরে বছরে অনেক মেধা খুব দ্রুত রূরুপান্তরিত হচ্ছে হতাশাগ্রস্ত দুর্বল মেধায়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে মেধা দিয়ে শিক্ষার্থীরা সুযোগ পায় পড়াশোনা করতে, সেই মেধা নিয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা বের হতে পারে না। কচি কচি সতেজ মেধাগুলো ডিপার্টমেন্ট এর অনিয়মিত ক্লাস আর ১৮ মাসের এক বছর পার করতে করতে হতাশায় নুয়ে পড়ে। একজন শিক্ষার্থী হয়ে আমি কখনোই শিক্ষকদের দোষ ধরার ক্ষমতা রাখি না। এহেন কাজ যেনো কোনো শিক্ষার্থী দ্বারা হোক তাও চাইনা। কিন্তু অন্তত এইটুকু বলতে পারি, সারা বছর শিক্ষার্থীদেরকে সুনজর ও ভালোবাসার বলয়ে শিক্ষাদান না করে ১৮ মাস পর শিক্ষার্থীদের চাপে পড়ে পরীক্ষার ডেট যেনতেনভাবে দিয়ে যারা সারা বছরের অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করে পরীক্ষায় বসতে বাধাগ্রস্ত করেন, তারাও যেনো বছরশেষে নিজেদের একটা তালিকা তৈরি করেন। ডিপার্টমেন্ট এর চেয়ারম্যান যেনো তদারকি করেন তার ডিপার্টমেন্টের প্রতি সেশানে সারা সপ্তাহে কয়টা ক্লাস হয়েছে। সারা সপ্তাহে রুটিনে প্রায় ২০টা ক্লাস থাকলে হয় না ১০টা। কেনো?
শিক্ষার্থী অনুপস্থিতির কারণে? না”।
এতোটুকু লেখার পর নিশাদ ভাবে, কোনোভাবে কি শিক্ষকদেরকে অবমাননা করা হল? তা সে চায় না। সে চায় অন্তত সঠিক সময়ে একাডেমিক বর্ষ শেষ করতে শিক্ষকরা যেন শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক থাকেন। সে কিছু ভালো আইডিয়া তুলে ধরতে চায়-
“ডিপার্টমেন্টে নিয়মিত পরীক্ষা হলে ছাত্রছাত্রীরা ভালো রেজাল্টের আশায় নিয়মিত আসবেই। ক্লাস নোট, লেকচার কালেকশানে তারা প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকবে। অথচ সর্বোচ্চ দুইটা ক্লাস হয় না, সেখানে শিক্ষার্থীদের থেকে কি করে নিয়মিত উপস্থিতি আশা করেন তারা? উপায় না পেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেদিন অতিরিক্ত ক্লাসের রুটিন থাকে সেইদিন উপস্থিত হয়, ভাগ্যক্রমে যদি একটিও ক্লাস পাওয়া যায়।
সেদিন অন্য ডিপার্টমেন্টের আমার এক জুনিয়ার ট্রেনে যেতে যেতে তার সহপাঠির সাথে বাজি ধরলো। বাজির বিষয়বস্তু, আজ ক্লাস কয়টা হবে? একটা নাকি হবে না। ম্যাম আসবে নাকি আসবে না। অপরজন তখন তার খাতা খুলে হিসেব কষলো, সে বললো আজ ভাগ্য ভালো- আস্ত দুইটা ক্লাস হবে। অপরজন বললো- লজিক দে?
সে খাতা খুলে দেখালো গত তিন সপ্তায় ুসোমবারচ এমন একটি দিন যেদিন অন্য টিচাররা না এলেও অমুক দুজন টিচার ক্লাস নেন। আজ সোমবার তারা অন্তত ক্লাসে আসবেন। ব্যাপারটা আমার বেশ ভালো লেগেছে। বাসায় এসে আমিও খাতা কলম নিয়ে বসে দেখি, আমার হিসেবে এইরকম সুপ্রসন্ন সোমবার নেই। যে যার মত ক্লাস মনিটরের সাথে কথা বলে ক্লাসের গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করেন। আমিও তাই, রুটিনে একাধিক ক্লাস আছে এমন দিনে যাই, ভাগ্যক্রমে যদি একটা পাওয়া যায়!
শিক্ষক যদি ক্লাসরুমে অধিক শিক্ষার্থী না দেখে পড়াতে না চান তবে ক্লাসে শিক্ষার্থী যেনো আসে সেই ব্যবস্থা করুক। প্রতিনিয়ত ক্লাস টেস্ট, প্রেজেন্টেশন কিংবা টিউটোরিয়াল দিয়ে আটকান। বছর শেষে যারা এইসবে এটেন্ড করে নাই, তাদেরকে তালিকা করে ঝুলিয়ে দেন। এতোকিছু করেও যদি পারেন, অনুগ্রহ করে চার বছরের শিক্ষাবর্ষ চার বছরেই শেষ করার ব্যবস্থা নিন। অথচ আপনারা মজা পান, ১৮ মাস পরে ভালো খারাপ সবাইকে একসাথে বোলাতে!”
এতোটুকু লিখে নিষাদ কয়েকটি লাইন লালকালি দিয়ে কেটে দেয়। এই লাইনগুলো কেমন যেনো তিতা সত্যের মত লাগছে তার কাছে। তার মনে আজ গত ছয় বছরের অভিমান ছটফট করছে-
“শিক্ষার্থীরা ক্লাসে কেনো যায় না তার সহজ একটা উত্তর অনিয়মিত ক্লাস! আমার বিস্ববিদ্যালয়ের কিছু ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা একটা কিংবা দুইটা ক্লাসের আশায় ২২ কিলোমিটার ট্রেন পথ পেরিয়ে ক্লাসে গিয়ে, অধিকাংশ সময় ক্লাসশুন্যতায় ফিরতে হয়। কথা বলতে গেলেই শিক্ষার্থীর কম উপস্থিতি! এর দায়ভার শিক্ষকরা কস্মিনকালেও নেননি।
আমার মত বোকারা তাই প্রথম বর্ষে লাফিয়ে লাফিয়ে ক্লাস করে ঠিকই। তবে পরের বছর থেকে শিখে যায় সব, কীভাবে খাপ খাওয়াতে হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সাথে। আরো অনেক কিছুই বলবো, তবে আগে একটি চিঠি পড়বো। ক্লাসে উপস্থিতির পারসেন্টেজ পূরণ না হওয়ার কারণে, পরীক্ষা দিতে না দেওয়ায় বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র অর্ঘ্য বিশ্বাস আত্মহত্যা করেছে। আজ ভোরে মৃত্যুর আগে সে মাতৃভূমিকে একটা চিঠি লিখে গেছে। দেখুন অর্ঘ্য চিঠিটা :
প্রিয় বাংলাদেশ,
আশা করি ভালো আছো। তোমার মেরুদণ্ডহীন সিস্টেমের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানলাম। বোকার মতো শিরদাঁডাটা সোজা রেখে জীবনটা পার করার যে জেদ ছিল সেটা তোমার মেরুদণ্ডহীনতার তন্ত্রে হার মেনে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি থেকে এবং সিজিপিএ’র জন্য পড়াশোনা করে মেধাবী তকমা পাওয়া কিংবা দুর্ঘটনায় বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর পর মিডিয়ার প্রচারের স্বার্থে মেধাবী খেতাব নেওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না। শুধু শুধু গাধার মতো কোন ইস্যু পেলে চেঁচিয়ে বারবার তোমার মেরুদণ্ডহীনতা বোঝানো ছাড়া বোধ হয় আমি আর কিছু পারতাম না।
তোমার মেধাবী সূর্য সন্তানদের দেখে আমার বড় আফসোস হয়। দেখ, কীভাবে তারা তাদের মেধাগত যোগ্যতাবলে তোমার সিস্টেমের সাথে সুন্দরভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। তারা আমাদের কী বলে জানো? যুক্তিবাদী বেয়াদব। আমরা ডিপার্টমেন্ট-এর বদনাম করি, দল করে সুন্দর সাজানো একটা ডিপার্টমেন্টকে নষ্ট করি। সিনিয়র ভাইদের সাথে ঘুরে ঘুরে স্যারদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করি।
কাল সারা রাত অনেক ভাবলাম বুঝলে। সত্যি বলতে কী, আমার এখন মনে হচ্ছে আমরা এই “যুক্তিবাদী বেয়াদবেরা” আসলেই তোমার ক্ষতি করছি। পদ্মা ব্রীজ হচ্ছে, দেশে কর্মসংস্থান বাড়ছে, আধুনিকায়ন হচ্ছে। সুশাসন এবং আইন ব্যবস্থায় গুম, হত্যা, সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে, কোটি কোটি টাকা লোপাট হওয়ার পরও মন্ত্রী মহোদয় সেটা হাতের ময়লার মতো উড়িয়ে দেন। প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। দলীয় এবং নিয়োগ বাণিজ্যের কল্যাণে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা বিশাল সংখ্যাক ডিপ্রেসড শিক্ষার্থী তৈরি করছেন। গর্ব করার জন্য বহিঃবিশ্বে তোমার বংশোদ্ভূত সন্তানেরা রয়েছেন যারা নিজেদের উন্নতির স্বার্থে তোমাকে ত্যাগ করে অন্য দেশকে আপন করে নিয়েছে।
তোমার মেরুদণ্ডহীন বিদ্বান সূর্য সন্তানেরা তোমার এত উন্নতি করছে সেখানে আমি তোমার কি উপকার করছি বল? তোমার টাকায় পরে, খেয়ে তোমার সিস্টেমের বিরোধিতা করছি, তোমার সাথে বেঈমানী করছি। দেখে নিও, আর করব না। সেদিন ভিসি স্যার এবং চেয়ারম্যান স্যারের কাছে মাফ চাইনি। আজ তোমার কাছে মাফ চাইছি। তোমার আর কোন ক্ষতি করব না। আর তোমার বিরোধিতা করব না। সোজা হওয়া এই মেরুদণ্ড ভেঙে নোয়াতে পারব না। সেটা আমার দাঁড়া হবে না। সেজন্য অন্য পথটা বেছে নিলাম।
ভয় পেয় না। ধর্মান্ধতায় অন্ধ, ক্ষমতাবলে ভীত, অর্থ মোহে ঘুমন্ত এই বালির নিচে মাথা ঢুকিয়ে থাকা উটপাখি সদৃশ জাতি কোনদিনও তোমার ভেঙে পড়ে থাকা মেরুদণ্ড সোজা করার চেষ্টা করে তোমাকে যন্ত্রণা দিবে না। আমার মতো যেসব “বেয়াদবেরা” তোমার সিস্টেম বাগের কারনে ভুল করে জন্মেছে তারাও আস্তে আস্তে তোমার সিস্টেমের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। আশাকরি পৃথিবীতে তুমি তোমার উন্নতির ধারা বজায়ে রাখবে। ভাল থেক।

ইতি
যুক্তিবাদী বেয়াদব
জানি, চিঠিটা পড়ে অনেকেই ছেলেটা সম্পর্কে খারাপ ধারণা নিচ্ছেন- কেনোনা ছেলেটির চিঠিতে এইটুকুও ছিলো- ুআমরা ডিপার্টমেন্ট-এর বদনাম করি, দল করে সুন্দর সাজানো একটা ডিপার্টমেন্টকে নষ্ট করি। সিনিয়র ভাইদের সাথে ঘুরে ঘুরে স্যারদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করি।চ
এইবার ভেবে দেখুন তো, আমার সাথে মিলে কিনা। আমিও তো ডিপার্টমেন্ট এর বদনাম করলাম, পরীক্ষা হওয়ার জন্য সিনিয়ার ভাইদের নিয়ে দফায় দফায় চেয়ারম্যান রুমে যাই। আমার বন্ধুরা বছর শেষে পরীক্ষার হলে বসার অনুমতি না পেলে আবার আপনাদের কাছেই যাই। এর পা ওর পা ধরি।
আমাদের অভিভাবক আপনারা, আপনাদের কি একবারো মনে হয়না- বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে নেওয়ার পর আমাদেরকে নিয়ে আপনাদের ভাবার? আমরা ক্রমশ আমাদের ট্র্যাক থেকে সটকে যাচ্ছি। সেশনজট আমাদের দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি হাসছে প্রতিনিয়ত। আমরা প্রতিনিয়ত পরিণত হচ্ছি ডিপ্রেসড একটা প্রজন্মে! এর দায়ভার শুধু আমাদের, এর ভুক্তভোগী শুধু আমরা। এই অপূরণীয় ক্ষতি এতো বড় বিশ্ববিদ্যালয় কখনো ধরতে পারবেনা। কেনোনা, ৫% শিক্ষার্থীর জয়জয়কারের কাছে ধামাচাপা পড়ে যায় ৯৫% শিক্ষার্থীর কান্না। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫% শিক্ষার্থী মানেই হাজারখানেক শিক্ষার্থী!
প্রিয় একান্ন অবতীর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়,
তোমার আশ্রয়ে এসে আজ আমরা কাঁদছি। আমাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই। আমাদের সেশনজটময় ব্যাচ থেকে সফল হয়ে যারা বেরুবে তুমি তাদেরকে মনে রেখো বিজয়ির খাতায়। আমরা পরাজিতরা হার মেনে নিলাম, আমরা আজ অর্ঘ্য বিশ্বাসের দলে। তুমি ভালো থেকো। তোমার ভবিষ্যতকে ভালো রেখো, সুখে থেকো ৫% বিজয়ী নিয়ে।