উন্নয়ন ভোগান্তিতে নগরবাসী

সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় গ্যাস দুর্ভোগ

গতকাল রাত ১০টায় মেরামত হয়েছে গ্যাসের ফুটো আজ থেকে স্বাভাবিক থাকবে গ্যাস কৌশলে বন্ধ হলো গ্যাসের অপচয়

ভূঁইয়া নজরুল

উন্নয়ন ভোগান্তিতে নগরবাসী। উন্নয়ন করতে গিয়ে সেবা সংস’াগুলোর সমন্বয়হীনতায় চরম দুর্ভোগ পোহালো নগরবাসী। গত শনিবার বিকাল ৪টা থেকে আজ মঙ্গলবার ভোর (৪টা) পর্যন্ত প্রায় ৬০ ঘণ্টার গ্যাস দুর্ভোগে ছিল নগরবাসী। নগরজুড়ে চলমান উন্নয়ন মহাযজ্ঞে এধরনের দুর্ভোগ আরো হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) এর ব্যবস’াপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশন তাদের কাজের নজরদারি করেনি বলেই নগরবাসীকে এই দুর্ভোগে পড়তে হলো। একইসাথে আমাদেরও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তারা যদি কাজ করার আগে আমাদের জানাতো তাহলে আমরা বলে দিতাম কোথা দিয়ে গ্যাসের পাইপলাইন গিয়েছে। তারা একটিবার আমাদেরকে জানানোর প্রয়োজনও মনে করলো না। আর এরফলে বিশাল এক ক্ষতি হয়ে গেল।’
তিনি আরো বলেন, ‘আগামীতে যাতে এধরনের কোনো ঘটনা না ঘটে সেজন্য আমি বিষয়টি নিয়ে সরাসরি মেয়র মহোদয়ের সাথে দেখা করবো। সেবা ও উন্নয়ন সংস’াগুলোর মধ্যে সমন্বয়টা খুব জরুরি।’
এই সমন্বয়ের কথা বলেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনও। তিনি বলেন, অবশ্যই এসব কাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি। এজন্যই সেবা ও উন্নয়ন সংস’াগুলো নিয়ে আমি কো-অর্ডিনেশন মিটিং শুরু করেছিলাম। কিন’ প্রতিষ্ঠান প্রধানরা মিটিংএ উপসি’ত না হওয়ায় এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
কেজিডিসিএল এর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘আমার প্রকৌশল বিভাগ এই কাজটি দীর্ঘদিন ধরে করছে। কেজিডিসিএলের পাইপ যেভাবে খাল ক্রস করার কথা ছিল সেভাবে করেনি। এজন্য দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। তারপরও ঘটনার পর থেকে সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট আমরা দিয়ে আসছি।’
কেজিডিসিএলকে জানানোর বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদের সাথে। তিনি বলেন, ‘কর্ণফুলী গ্যাস
কোম্পানির এতো বড় একটি পাইপ লাইন গিয়েছে কিন’ সেখানে কোনো এয়ার মার্ক (নির্ধারিত চিহ্ন) ছিল না। তাই কাজ করার সময় তা চোখে পড়েনি এবং দুর্ঘটনা ঘটেছে।’
এয়ারমার্ক না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে কেজিডিসিএল এর ব্যবস’াপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘ঘটনাস’লে এয়ারমার্ক থাকার বিষয়টি সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলীদের ডেকে দেখানো হয়েছে। একইসাথে আন্তর্জাতিক বিধান অনুযায়ী মাটির ৫ থেকে ৬ ফুট নিচ দিয়ে পাইপলাইন নেয়ার কথা, আমরা নিয়েছি ১৬ ফুট নিচ দিয়ে। তারপরও দুর্ঘটনা ঘটলো। এক্ষেত্রে সেবা সংস’াগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি হয়ে পড়েছে।’
এই সমন্বয়কে জরুরি উল্লেখ করে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস’াপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘সামান্য একটি পাইপ ফুটো হয়ে যাওয়ায় গত দুই দিন ধরে নগরীতে গ্যাস নেই। তাহলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতে যাচ্ছে সেখানে কী ঘটবে? শেখ মুজিব রোডের নিচ দিয়ে বক্সকালভার্ট, ওয়াসার কয়েকটি মেইন লাইন, টিএন্ডটি লাইনসহ অনেকগুলো সার্ভিস লাইন রয়েছে। আগামীতে এসব লাইনের অবস’া কী হবে? তাই সমন্বয় ছাড়া কোনো গতি নেই। অন্যথায় দুর্ভোগে পড়তে হবে নগরবাসীকে।’
বর্তমানে নগরজুড়ে চলমান সিডিএ ও ওয়াসার পাইপ লাইনের কাজের কারণে কোথাও টিএন্ডটির লাইন আবার কোথাও গ্যাসের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। আবার অনেক জায়গায় সিডিএর কাজের কারণে ওয়াসার পাইপও ফেটে গেছে। তবে তা গ্যাসের মতো বিপর্যয় ডেকে আনেনি।
উন্নয়ন ভোগান্তি নিয়ে জানতে চাইলে সিডিএ’র চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘অবশ্যই কাজ শুরুর আগে ওয়াসা ও কর্ণফুলী গ্যাসকে আমরা অবহিত করবো। তাদেরকে জানানো ছাড়া আমরা কোনো ডিজাইন করি না। তাদের কাছ থেকে নকশাও নিয়ে থাকি। আর এজন্যই সিডিএর কাজে কোনো দুর্ঘটনা হয়নি।’
সমন্বয় প্রশ্নে তিনি বলেন, অবশ্যই উন্নয়ন নিয়ে সংস’াগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। অন্যথায় নাগরিক দুর্ভোগ বাড়বে এতে সন্দেহ নেই।
আজ থেকে নগরীতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে
শনিবার বিকেলে ইপিজেডের পেছনে মাইট্টা খালে কাজ করতে গিয়ে সিটি কর্পোরেশনের ঠিকাদার গ্যাসের ২৪ ইঞ্চি পাইপ ফুটো করে ফেলে। এতে গতকাল পর্যন্ত গ্যাস ছিল না। এতে নগরবাসীর চুলা যেমন জ্বলেনি তেমনিভাবে গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাও সচল ছিল না। মেরামত বিষয়ে কেজিডিসিএল‘র ব্যবস’াপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘গতকাল রাত ১০টায় আমরা মেরামতের কাজ শেষ করেছি। তারপর থেকে গ্যাস চালু করতে স্বাভাবিক হতে হতে আজ ভোর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’
একটি পাইপের ফুটো মেরামত করতে এতো সময় লাগলো কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, লাইনটি খালের ভেতরে হওয়ায় প্রতিবন্ধকতা ছিল। আর সিটি কর্পোরেশন প্রথমে শোর পাইলিং করে কাজ না করায় দুপাশ থেকে মাটি ভেঙ্গে পড়ে এবং কাজ পিছিয়ে যায়। গতকাল সকালে শোর পাইলিং শেষ করার পর আমরা কাজ শুরু করেছি।
কৌশলে বন্ধ হলো গ্যাসের অপচয়
দুর্ঘটনার পরপরই গ্যাস পুরোদমে বন্ধ করা হয়নি। বিভিন্ন এলাকায় মিটি মিটি আকারে গ্যাসের চুলা জ্বলেছে। এর কারণ বিষয়ে প্রকৌশলী খায়েজ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘২০ ইঞ্চি পাইপের প্রধান লাইনটির মধ্যে অনেক গ্যাস ছিল। তাই এই গ্যাসটি ধীরে ধীরে ব্যবহার করেছি। ধীরে ধীরে ব্যবহারের সুযোগ না দিলে তা বিস্ফোরণ হতে পারতো এবং গ্যাসের অপচয় হতো। আমরা সেই অপচয় ও দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করতে গ্যাসের লাইন চালু রেখেছি। এতে পুরো নগরীতে পুরোদমে গ্যাস বন্ধ হয়নি।
উল্লেখ্য, গত শনিবার বিকেল ৪টায় দুর্ঘটনার পর থেকে নগরীতে গ্যাস ছিল না বললেই চলে। অনেক এলাকার মানুষ হোটেলে গিয়ে দীর্ঘ লাইন ধরে খাবার সংগ্রহ করে। বন্ধ করে দেয়া হয় গ্যাসভিত্তিক বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানও।