নিউইয়র্কের সাতকাহন

সেন্ট্রাল পার্কে শরতের এক বিকেলে

রিজওয়ানুল ইসলাম

পর্যটকরা নিউইয়র্ক গেলে দেখতে যাবেন এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, ৯/১১ মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, ফ্রিডম টাওয়ার, ইত্যাদি দ্রষ্টব্য স্থান/স্থাপনা। নিউইয়র্কের কথা লিখতে বসলেও এগুলোর কথা লেখাই হয়ত স্বাভাবিক । আমিও যখন প্রথম আমেরিকা যাই তখন নিউইয়র্কে গিয়ে এসব জায়গায়ই গিয়েছিলাম । উত্তর আমেরিকা ভ্রমণ করে অনেকেই এসব দ্রষ্টব্য স্থান সম্পর্কে লিখেছেন । নতুন করে এদের সম্পর্কে আর কী লেখা যেতে পারে ? তাছাড়া আমি ইদানিং যখন নিউইয়র্ক যাই তখন আর পর্যটক হিসেবে যাই না। তবে আমার কাছে শহরটি সব সময়ই আকর্ষণীয় এবং কৌতুহলোদ্দীপক একটি জায়গা । বাড়ি থেকে রাস্তায় বের হলেই চারদিকে তাকাই; দেখি শহরটির জীবনযাত্রা, আর মানুষের চলাফেরা । কত ধরনের মানুষ বাস করে সেখানে, আর কত বিচিত্র তাদের জীবনধারা !
সেন্ট্রাল পার্কে আমি সুযোগ পেলেই যাই। শেষবার যেদিন গিয়েছি সে দিনটি ছিল অক্টোবরের মাঝামাঝি।দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গিয়েছিল। শরতের বিকেল বলে সন্ধ্যে হয় গ্রীষ্মের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি। ছেলেমেয়েদের দেখতে গিয়েছি নিউইয়র্ক। বড় ছেলের বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তা পার হলেই সেন্ট্রাল পার্কে ঢোকার একটি প্রধান গেট। সে গেট দিয়ে ঢুকলেই সামনে পড়ে একটি বিশাল সবুজ মাঠ যার নাম শীপ মেডো। সঙ্গত কারণেই মাঠটির এই নাম; বিংশ শতকের প্রথমার্ধেও সেখানে ভেড়া চরতো। আর এখন ভারী সুন্দর বেড়ানোর জায়গা এটি। শরতের বিকেলের রোদ ছিল মিষ্টি, আর সেই রোদে সবুজের গায়ে নানা রঙের বিন্দুর মত দেখাচ্ছিল বসে থাকা অসংখ্য মানুষকে। কেউ চাদর পেতে, কেউ ঘাসের গালিচায়, কেউ একা আর কেউ ছোট বড় দলে। আবার কেউ কেউ ছোট শিশুদের সাথে মেতে ছিল নানা খেলায়। পার্কের দক্ষিণ প্রান্ত সেই মাঠ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মনে হচ্ছিল ম্যানহাটানের গগনচুম্বী দালানগুলো সেই মাঠ থেকেই উঠে গিয়েছে আকাশের দিকে।
আমি সেদিন একাই ছিলাম; বেরিয়েছি আমার দৈনিক হাঁটার অভ্যেস বজায় রাখতে। সুতরাং লোভ হলেও আমি গিয়ে শীপ মেডোর সবুজ গালিচায় বসলাম না। মাঠটিকে ডান দিকে রেখে হাঁটতে থাকলাম পূব দিকে। কয়েকশ’ ফুট যেতেই দেখলাম বাঁ দিকের একটি রাস্তার খানিকটা ঘেরাও করে কিছু তরুণ-তরুণী নৃত্য-গীতের সাথে আনন্দে মেতেছে; আর তা উপভোগ করছে চারদিকে জড়ো হওয়া অনেক মানুষ।
সেন্ট্রাল পার্ক আয়তনে বিশাল। রেকর্ড বইয়ে এর জায়গা কোথায় জানি না; তবে এর বিশালতা এবং ভেতরের বৈচিত্র আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। স্কাইস্ক্রেপারের এই শহরের মাঝখানের একটি জায়গায় প্রকৃতির এত কাছাকাছি যাওয়া যায়, তা এখানে না এলে বোঝা যায় না। আর প্রকৃতির সাথে সাথে এখানে রয়েছে নানা ধরনের আকর্ষণ। খেলাধুলার জায়গা থেকে শুরু করে সাইকেল, রিকশা এবং ঘোড়ার গাড়ির জন্য রাস্তা, লেকে নৌকা চালানোর ব্যবস্থা, কফি শপ আর রেস্তোরাঁ, কী নেই! বিভিন্ন জায়গায় আছে স্ন্যাক্স জাতীয় খাবার আর পানীয়ের ছোট ছোট ভ্রাম্যমাণ দোকান। স্বাস্থ্য রক্ষাই শুধু নয়, খাওয়া দাওয়া এবং আনন্দ করবারও প্রচুর সুযোগ সেখানে।নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার বিখ্যাত ভ্রমণ বিষয়ক কলাম “৩৬ ঘণ্টা”-য় একবার বিষয় ছিল সেন্ট্রাল পার্ক। এই কলামে কোনো একটি শহরে ৩৬ ঘণ্টায় কী কী করা যায় তার বর্ণনা থাকে। সেন্ট্রাল পার্কে ৩৬ ঘণ্টা মানে হচ্ছে পুরো দেড় দিন ধরে দেখা যায় এর বিভিন্ন দ্রষ্টব্য স্থান।
শনিবার বিকেল বলেই কিনা জানি না, আমার সংক্ষিপ্ত পথেই অন্তত চারটি জায়গায় গানের “অনুষ্ঠান” পেলাম। ঘেরাও দেওয়া রাস্তার নাচ-গানের পর খানিকটা সামনে যেতেই দেখলাম একটি রীতিমত মঞ্চের মত জায়গা, যেখানে কিছু অল্প বয়সের তরুণ-তরুণী সমবেত কণ্ঠে গান গাইছে। একটুখানি শুনেই বুঝতে পারলাম এরা ধর্ম ভিত্তিক কোন গোষ্ঠীর, এবং গাইছে ভক্তিমূলক গান। সেখানেও অনেকেই দাঁড়িয়ে “অনুষ্ঠান” উপভোগ করছিল। অন্য আরেক জায়গায় দুজন মাঝবয়সী লোক গান করছিল; আর দর্শক-শ্রোতারা একটু ঢালে সারি বেঁধে রীতিমত থিয়েটারের স্টাইলে বসে সে গান শুনছিল।
আমার পথে চতুর্থ অনুষ্ঠান ছিল একজনের একক বাদন। চেহারার দিক থেকে লোকটিকে পূর্ব এশিয়ার বলেই মনে হলো। তাঁর হাতে ছিল একতারা ধরনের একটি বাদ্যযন্ত্র। যন্ত্রটির স্বাতন্ত্র্য যেমন লক্ষ্য করার মত ছিল, তেমনি ছিল তাঁর বাজনার সুর। এত সুন্দর একটি বিকেল, চারদিকে সবাই এত আনন্দের মধ্যে, অথচ তিনি বাজাচ্ছিলেন বিষাদের এক সুর (অন্তত সুরটা শুনে আমার তাই মনে হলো)। তবে আমার কিন্তু ভালই লাগছিল শুনতে, আর শুনতে শুনতে মনে পড়ল কবি শেলীর সেই বিখ্যাত চরণ: ড়ঁৎ ংবিবঃবংঃ ংড়হমং ধৎব ঃযড়ংব ঃযধঃ ঃবষষ ড়ভ ংধফফবংঃ ঃযড়ঁমযঃ.
ভালোবাসার প্রকাশ কতভাবে হতে পারে তার কোন সংখ্যা কি কারো জানা আছে? আমার মনে আছে তরুণ বয়সে প্রথম বিলেতে গিয়ে জনসমক্ষে ভালোবাসার প্রকাশ দেখে আমি বেশ বিস্মিত হয়েছিলাম। রাস্তায়, গণপরিবহনে, রেস্তোরাঁয়, যে কোন জায়গায়ই নারী পুরুষ একে অপরকে চুমু খাচ্ছে। আর হালে নিউইয়র্কের রাস্তায় সমকামিদেরও দেখা যায় তাদের ভালবাসা প্রকাশ করতে।
সেন্ট্রাল পার্কের একটি লেকে দেখলাম নৌ বিহারের ব্যবস্থা বৈঠা দিয়ে নিজেদের নৌকা নিজেদেরই চালাতে হবে। আর শনিবারের এমন সুন্দর বিকেল বলে প্রায় কোন নৌকাই ঘাটে বাঁধা ছিল না।
কেউ কেউ জোড়ে, কেউ শিশুদের নিয়ে, আবার কেউ বা বন্ধুদের সাথে নৌকায় বেড়াচ্ছিল।
আমার হাঁটার পথটি এঁকে বেঁকে লেকের একটি ছোট্ট শাখার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। যেতে যেতে দেখলাম একটি নৌকায় এক জোড়া তরুণ-তরুণী, অথবা কিশোর কিশোরী বললেই বোধ হয় যথার্থ হবে। নৌকাটি এতই কোনার দিকে এসে গিয়েছিল যে আমার মনে হচ্ছিল ওরা ঠিকমত চালাতে পারছেনা বলেই হয়ত এই কোনায় এসে ঠেকে গিয়েছে। কিন্ত আমার ভুল ভাঙলো, যখন দেখলাম ছেলেটি বৈঠা তুলে নৌকার ওপর রেখে মেয়েটিকে চুমু খেতে থাকলো আর পকেট থেকে ফোন-ক্যামেরা বার করে সেলফি তোলার প্রস্তুতি নিল।
ভালোবাসার প্রকাশ দেখা যায় সেন্ট্রাল পার্কের বসবার বেঞ্চগুলোতেও। প্রায় সব বেঞ্চই কারো না কারো নামে উৎসর্গীকৃত, প্রয়াত (অথবা বর্তমান) ভালোবাসার পাত্র বা পাত্রীর নামে, তা মা, বাবা, স্বামী, স্ত্রী, প্রেমিক, প্রেমিকা যে-ই হোক না কেন। বেঞ্চের হেলান দেয়ার জায়গায় দাতা এবং যার স্মরণে দান করা হচ্ছে এই দুজনেরই নাম উল্লেখ করা আছে।
একদিকে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটছে আর অন্যদিকে পার্কে বসবার ব্যবস্থার ব্যয় জনসাধারণের কাছ থেকেই তুলে নেওয়া যাচ্ছে। এমন বাস্তব ব্যবস্থা আমি আর কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। (এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে সেন্ট্রাল পাকোর রক্ষণাবেক্ষণের খরচের তিন-চতুর্থাংশ আসে জনগনের দান থেকে।) তবে আমার নজর বিশেষভাবে কেড়েছে একটি স্মৃতিফলক যা কোন বেঞ্চে বা দেয়ালে স্থাপিত ছিল না, ছিল মাটিতে, ঘাসের ওপর। তাতে লেখা ছিল “অহফু-র জন্য, যাকে আমি অনেক ভালোবাসতাম”। পাশে পড়েছিল শরতের কিছু ঝরাপাতা। বেঞ্চের জন্য খরচ কি বেশি, এবং এই প্রেমিকের সে টাকা খরচ করবার সামর্থ্য ছিল না? না কি সে চেয়েছে তার বার্তাটি মাটিতে স্থাপিত হোক এবং ঝরাপাতারা ঘিরে রাখুক তার কথাকে? সেন্ট্রাল পার্কের যে অঞ্চলটিতে আমি হেঁটেছি সেখানে এরকম স্মৃতিফলক আমি একটিই দেখেছি।