সুধীন দত্ত ও যামিনী রায়

আখতার হোসেন খান
শিল্পী : যামিনী রায়
শিল্পী : যামিনী রায়

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের যামিনী রায় সম্পর্কিত প্রথম লেখা ’যামিনী রয় এন্ড দি ট্রাডিশন অফ পেইন্টিং ইন বেংগল’ ইংরেজি প্রবন্ধটি ১৯৩৯ সনের। তাঁর বেশ কিছু ইংরেজি লেখার এটি অন্যতম। এর প্রথম প্রকাশ ১৯৪৩ সনে ’লংম্যান্স মিস্‌সেলানি’তে সংক্ষিপ্তাকারে। সুধীন দত্তের মৃত্যুর দশ বছর পরে পুরো প্রবন্ধটির স্থান হয় এডওয়ার্ড শিল্‌স সম্পাদিত ১৯৭০ সনে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশিত ‘দি ওয়ার্ল্ড অফ টোয়াইলাইট’ গ্রন্থে।
সুধীন দত্ত যে চিত্রকলার উপরে খুব বেশি লিখেছেন, তা নয়। এটি বাদে যামিনী রায় ও অতুল ঘোষের কাজের উপর লেখা তাঁর আরও দুটি প্রবন্ধ ২০১০ সনে প্রকাশিত এবং সুকান্ত চৌধুরী- সম্পাদিত ও অমিয় দেবের ভূমিকা-সংবলিত ’দি আনকালেক্টেড ইংলিশ রাইটিংস অফ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত’ বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় বইটির বেশির ভাগ লেখাই কোলকাতার স্টেটস্‌ম্যান পত্রিকার বা বেতার কথিকা হিসেবে প্রচারের জন্য। তিন-চার বছরের ওই পত্রিকায় চাকুরিকালে সুধীন দত্তের ছোটো-বড়ো অনেকগুলো লেখা রাজনীতিসহ বিচিত্র সব বিষয়ের উপর।
সুধীন দত্ত চিত্রকলার উপর নিয়মিত লেখক না হলেও তাঁর ভাষাগোষ্ঠীর একজন অগ্রগণ্যতম বুদ্ধিজীবী ও বাচস্পতি; এবং এজন্য স্বভাবতই তাঁর এসব প্রবন্ধ বিষয়জ্ঞানে ও তাৎপর্যে ভরা।
যামিনী রায়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রথমোক্ত লেখায় তিনি বাংলার চিত্রকলার ঐতিহ্যকেই টেনে আনেননি, একই সাথে সারা দুনিয়ার চিত্রকলার সর্বশেষ বিবর্তন সম্পর্কেও পাঠককে জানিয়েছেন। এই লেখার পরে সুধীন দত্ত আরও একুশ বছর আর যামিনী রায় আরও তেত্রিশ বছর বেঁচে ছিলেন। বর্ণিত দুটি লেখার মধ্যে প্রথমটির ব্যাপ্তি দৃশ্যতই অভিনব ও ধরন সুধীন দত্তের একান্ত নিজস্ব, তা সে বাক্যগঠন বা ইংগিতময়তা, যাই হোক না কেন।
জীবনের একটা পর্বে যামিনী রায়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সময় কাটিয়েছেন সুধীন দত্ত। শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষের ’পরিচয়ের আড্ডা’-র দিনপঞ্জী থেকে জানা যায় যামিনী রায় একটা সময় ওই সভার নিয়মিত অংশগ্রহণকারী ছিলেন। সেখানে চিত্রকলা সম্পর্কিত অনেক আলোচনায় ও বিতর্কে তিনি ও সুধীন দত্ত একমত হতেন।
‘পরিচয়’ পত্রিকার অষ্টম বর্ষের কয়েকটি সংখ্যার প্রচ্ছদও আঁকেন যামিনী রায়। ঘনিষ্ঠতার সূত্রেই সুধীন দত্ত যামিনী রায়ের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক খবর জানতে পারেন: এর একটি এমনভাবে স্থান পেয়েছে পূর্বোক্ত প্রথম প্রবন্ধে: ’অর্থাভাব এমন হয়ে দাঁড়ায় যে প্রায়ই পারিবারিক আলমারি হতে ধুতি-শাড়ি দিয়ে ক্যানভাসের কাজ চলতো আর রাতের খাবার নিয়মিতভাবে বাদ দিয়ে রঙের পয়সা জমাতে হতো’ (অনুবাদ বর্তমান নিবন্ধকারের)।
’পরিচয়ের আড্ডা’ বইতে ১৯৩৮ সনের ১২ আগস্টের দিনলিপিতে একথাটি সুধীন দত্তের মুখ থেকে আরও সরাসরি জানাচ্ছেন শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষ: ‘‘সুধীন্দ্র উত্তেজিত হয়ে বললেন: ’যামিনীদা পনর বছর ধরে পেট ভরে খেতে পাননি। শরীর ঢাকার মতো কাপড় যোগাড় করতে পারেননি। য়ুরোপে থাকতে আমাকে টাকার অভাবে তিন মাস এক রকম অভুক্ত থাকতে হয়’।”।

যামিনী রায় প্রসংগে সুধীন দত্তের একই প্রবন্ধ থেকে জানতে পারি, গ্রামের কুমারদের সাথে তাঁর বাল্যকালে সময় কাটত। সুধীন দত্ত উল্লেখ করেছেন, তাঁর শক্তহসত পিতাই তাঁেক সেখানে পাঠিয়েছিলেন।
চৈতন্য-সম্পর্কিত যে-অংশ, তাতে তাঁকে মনে হয় জয়েসের ‘এপিফেনি’ বা রবীন্দ্রনাথের ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর, কেমনে পশিল গুহার পর….’ এর মতোন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কৃষ্ণ নামে চৈতন্যদেবের যে হার্দ্যিক উল্লাস আর উচ্ছ্বাস আসত, তা এমনকী সুফিদের ট্র্যান্সের মধ্যে ‘আল্লাহ’ নাম-কীর্তনের সাথেই তুলনীয়। চৈতন্যের এই বৈশিষ্ট্য জানার পরে যামিনী রায় এক অমীমাংসিত শিল্প-সমস্যার সমাধান পেলেন; ক্রমে তা তাঁর জন্যও এক নতুন শিল্পসম্ভার নিয়ে আসে।
সুধীন দত্ত যামিনী রায়ের সাথে পিকাসো, মানে প্রমুখের তুলনা টেনেছেন। শিল্পতত্ত্বের গভীরে না যেয়েও বলা যায় ১৯৩৯ সনে লেখা এই প্রবন্ধের বর্ননার পরেও যামিনী রায় আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি জনতার আরও কাছে সরে এসেছিলেন। সুধীন দত্ত শ্রমিকদের শোভাযাত্রা দেখে সন্ত্রস্ত না হতে যে-পরামর্শ রেখেছিলেন, তা কি তার কানে পৌছেছিল।
পাল আমলের চিত্রকর্ম, যা ‘পাল মিনিয়েচার’ নামে পরিচিত, বাংলাভাষীদের অঞ্চলের জানামতে প্রথম সুজটিল (সফিস্টিকেটেড) চিত্রকর্ম হিসেবে খ্যাত হয়ে আছে। তবে এগুলো যেহেতু ‘অষ্টসহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’ আর ‘পঞ্চরক্ষা’ নামের বা অন্যান্য পাণ্ডুলিপির মার্জিন অলঙ্করণের জন্য করা, তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশুদ্ধ চিত্রকর্মের ঐতিহ্য কি এর বাইরে আর কোথাও বঙ্গদেশে ছিল না ? তবে অন্যান্য বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ এই সাক্ষ্য দেয় যে পালদের অনেক আগেও এভূখণ্ডে উন্নত চিত্রকলার প্রথা বর্তমান ছিল।
‘কোয়েস্ট’ পত্রিকার জন্য দুনিয়ার শহরাবলী সিরিজে কোলকাতা শহরের উপরের এক লেখায় সুধীন দত্ত ১৯৫৭ সনে শহরের উল্লেখ্য বিষয় লিখতে যেয়ে যামিনী রায়ের কথা না এনে পারেননি: ‘‘কপালগুণে এই শহরেই যামিনী রায়ের চিত্রশালা; সেখানে এক মহান শিল্পী নিতান্ত নিজস্ব ভাষায় তাঁর উত্তরাধিকারকে বিশ্লেষণ করে চলেছেন; এবং তাঁর কথোপকথনে যদি যথাযথ মনোয়োগ দেয়া হয়, তবে জাদুঘরের জাঁকালো ভাস্কর্য-সংগ্রহের চেয়ে তাঁর কাছ থেকেই ভারতীয় আত্নার পরিচয় বেশী জানা যাবে।’’ (‘ক্যালকাটা’ নামের ইংরেজি নিবন্ধ দ্রষ্টব্য: (অনুবাদ বর্তমান নিবন্ধকারের)।)।
জাদুঘরের জাঁকালো সংগ্রহের প্রতি এই অনাকর্ষণ সুধীন দত্তই শুধু নন, বিশ শতকের কলাসেবীদের শীর্ষ সারির ক্লাইভ বেল তাঁর ‘আর্ট’ নামের বইতে শিল্পকর্মকে জাদুঘরীয় আবহ থেকে মুক্ত করার কথা বলেছিলেন : ওই মতকে একটু ঘুরিয়ে বলা যায় এমন করে, জাদুঘরের দরোজার মধ্যেই শিল্পের সমাধি।
সুধীন দত্তের আরেক আদর্শ শিল্পজ্ঞানী রজার ফ্রাইও কি ক্লাইভ বেলের এই ধারণার অনুবর্তী নন? এই দুজনই বিষয়-বিচ্ছিন্ন বিশুদ্ধ চিত্রকলার সমর্থক। এ যেন কবিতায় মালার্মে বা ভ্যালেরির দেখানো পথ: এঁরা সবাই কবিতার বা চিত্রের ভাবার্থ বা বাণীতে মোটেই উৎসাহী নন, তাঁরা বিশুদ্ধ কাব্য বা বিষয়মুক্ত চিত্রকলাতেই আগ্রহী।
‘ক্যালকাটা’ প্রবন্ধের অনেক আগে ১৯৩৯ সনের শুরুতে বর্ণিত ওই লেখায় সুধীন দত্ত খুঁজে পান তাঁর নিজের সাথে যামিনী রায়ের সাযুজ্য-বিষয়ক কথা: ‘‘ আমার জানা শিল্পীদের মধ্যে তিনিই সব চেয়ে বেশি তৃপ্তিদায়ক: আমরা দুজনে একই ইতিহাসের ধারক এবং আমাদের ভবিষ্যৎ অভিন্ন। ’’ (অনুবাদ বর্তমান নিবন্ধকারের)।
এসব প্রবন্থের বাইরে দুজনের সম্পর্ক বিষয়ক কথা আছে ’পরিচয়ের আড্ডা’ আর ’পরিচয়ের কুডি বছর’ বইতে। এদুই মহান বাংলাভাষী পরবর্তীদের জন্য যে মহান ঐতিহ্য রেখে গেছেন, তা অন্যান্য মহীরূহদের গড়ে-তোলা সম্ভারের সাথে অবশ্যই স্মরণযোগ্য, পূজনীয়।
তবে আড্ডা-বিষয়ক ও আড্ডাজাত ঐতিহ্য-তৈরি বঙ্গদেশে খুব একটা নেই।
তাই ‘পরিচয়’ পত্রিকা থেকে এই দুই মহতের যে-সম্পর্ক শুরু হয়, তা বঙ্গীয় গোত্রের বুদ্ধিবৃত্তিতে আসমান্য অবদান রাখে। সুধীন দত্ত যেমন যামিনী রায় নিয়ে লিখেছেন, যামিনী রায়ও তেমনি সুধীন দত্তের প্রতিকৃতি এঁকেছেন।