সুকান্ত চৌধুরীর প্রদর্শনী প্রেম-প্রকৃতির খোদাইকাব্য

খালেদ হামিদী

শিল্পকলা একাডেমী, চট্টগ্রাম-এর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন গ্যালারিতে ৬ থেকে ১১ এপ্রিল ’১৭ পর্যন্ত ছ’দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় শিল্পী সুকান্ত চৌধুরীর ‘প্রেম-প্রকৃতির খোদাইকাব্য’ শীর্ষক কাঠ খোদাইয়ের শিল্প বা রিলিফ ভাস্কর্যের একক প্রদর্শনী। বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা অব্দি চলে এই এক্সিবিশন। উচ্চ মাধ্যমিক পর্ব থেকে চিত্রকলায় আগ্রহী, ১৯৭৩ সালের ১০ অক্টোবরে চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া সুকান্ত, অন্তর্গত চিরতারুণ্যের নৈমিত্তিক সজীবতাযোগে চারুকলায় শিক্ষার্জনের শেষ পর্বে ভাস্কর্যে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তাঁর সৃজনশীলতার মৌলিকত্বকে ত্বরান্বিত করে।
এই প্রদর্শনীতে তাঁর ৩০টি কাজ স্থান পায়। ৬ বছর ধরে সৃজন-নির্মাণকালে তিনি এই ভাস্কর্যগুলোয় নিজের মননশীলতারও প্রস্ফুটন ঘটান। সবকটিই কাঠখোদাই। তবে তাঁর কার্ভিং স্কাল্পচারের অভিনবত্ব এখানে যে তিনি, যতটুকু জানা যায়, দেশে এই প্রথমবারের মতো, এতে রং ব্যবহার করেন কিংবা চিত্রকলার প্রতি তাঁর প্রথম বয়সের আগ্রহ এবং এই পরিণত বয়সের শৈল্পিক ইচ্ছার সমন্বয় ঘটান। সঙ্গে জুড়ে দেন কাব্য ও সঙ্গীতের সুষমা ও সুরময়তা। তাছাড়া রিলিফ স্কাল্পচারগুলোর অধিকাংশেরই শিরোনাম তিনি নির্ধারণ করেন রবীন্দ্রনাথের অজর কবিতা, অজয় চক্রবর্তী ও মান্না দে’র অমর গানের সম্ভার থেকে পঙ্‌ক্তি চরণ ও কলি চয়নের মাধ্যমে। অবশিষ্টগুলোর নামকরণ করেন তিনি নিজেই। প্রেম-প্রকৃতির খোদাইকাব্যয় প্রদর্শিত প্রতিটি ছবির ইংরেজি শিরোনামের কৃতিত্ব অধ্যাপক এএমএম মুজিবুর রহমানের। স্মর্তব্য, দেশে কাঠখোদাই শিল্পের প্রায়-পথিকৃৎ রাশার ফ্রি স্ট্যান্ডিং স্কাল্পচারের পরে অনেকেই এ মাধ্যমে কাজ করেন। শৌখিন শিল্পী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর কিছু কাজও এ ধারায় যুক্ত হয়। কার্ভিং স্কাল্পচারে প্রথমবার সুকান্তর অ্যাক্রেলিক ও পলিশের কালার ব্যবহারের আগে, বর্তমানে প্রবাসী ভাস্কর লাভলুর কাজে, মেটালের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।
শিক্ষক অলক রায়ের মৃত্তিকায় নির্মিত ব্যতিক্রমী ভাস্কর্যও সুকান্তকে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু তাঁর শিল্পীত্ব কীভাবে মুদ্রিত হয় ভিন্ন পদ্ধতির এই ত্রিশ ভাস্কর্যে? কাঠের কাজ ও রঙের তথা চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের কিংবা পেইন্টিং ও স্কাল্পচারের এই অভিনতুন কিন্তু সার্থক সংবেদী সমন্বয়ের ফলে, দৃষ্টান্তস্বরূপ, তাঁর কোরক দ্যুতি শিরোনামের সরল কাজটিতেও, কিঞ্চিৎ শাদা এবং ঈষৎ লাল ও হলুদ রঙের ছড়ানো বিভায়, খোদাইকৃত কাঠ সপ্রাণ বৃক্ষের পুষ্পে পরিণত হয়। এ পর্যায়ে খোল অবগুণ্ঠন-এ বসন্তে; এ কী লাবণ্য পূর্ণ প্রাণে; তোমার হল শুরু আমার হল সারা; ভরা যৌবনে সুখের প্লাবন; দেবে কি আমায় অধর চুমিতে; শীতের পরশ লাগলো পত্রালীতে; যৌবন-উল্লাসে করি অবগাহন; ভাবি নি সাজাবে আমায়, তোমার শখের ফুলদানিতে; যদি মেলে কুঁড়ি, পরাগে জাগে সুগন্ধ/ঝরা পাতায় আসে যদি নবীন বসন্ত; সাঙ্গ হলে রঙ বাহারের মেলা; লাগলো কাঁপন নবীন সবুজে; নবীন মেঘ বৃষ্টি করে দান/ধরারে স্তন্য করায়েছে পান; যে কুসুম চুমিল ভূতল/তারি পাশে অলি জুটবে কি?; নব আনন্দে জাগো; একদা কী করিয়া মিলন হল দোঁহে,/কী ছিল বিধাতার মনে…; নবীনে করি অবগাহন শীর্ষক ১৬টি ভাস্কর্যের সব কটিতে বিভাময় বর্ণের উদ্ভাস ঘটেনি। কিন্তু প্রত্যেক ছবির প্রতিটি চরিত্র, উপকরণ কিংবা অনুষঙ্গ ছবির বাইরের সংশ্লিষ্ট বাস্তব অবস্থিতি ও সক্রিয়তাকে দ্যোতিত করে সুকান্তীয় শৈল্পিক ব্যঞ্জনায়। তবে এ ক্ষেত্রের কাজগুলোয় সেই কোরক দ্যুতির বর্ণবিভা, আলোর ক্রমাগত হ্রস্ব পরিস্ফুটনের মধ্যে, বুঝি প্রকৃতির প্রতি একই সঙ্গে শিল্পী ও দর্শকের কৈশোরিক মুগ্ধতা আস্তে আস্তে যৌবনের সপ্রেম বেদনায় উত্তীর্ণ হয়, যেখানে কবিতা ও গান এবং যুগপৎ শিল্পীমানস ও শিল্পমাধ্যম পরস্পরের দ্বারা স্পৃষ্ট, সচকিত ও মন্দ্রিত। ঠিক এ অংশে উল্লেখ্য এ কী লাবণ্য পূর্ণ প্রাণে; তোমার হল শুরু আমার হল সারা; ভরা যৌবনে সুখের প্লাবন; যৌবন-উল্লাসে করি অবগাহন; ভাবি নি সাজাবে আমায়, তোমার শখের ফুলদানিতে; সাঙ্গ হলে রঙ বাহারের মেলা শিরোনামের ৬টি কাজ। এখানে প্রথমটিতে প্রাণ লাবণ্যে পূর্ণ হলেও বেগুনি, নীল ও বাদামি রঙের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার লক্ষণীয়। দ্বিতীয়টিতে শুরু আর সারা বোঝাতে দুটি পাতার যথাক্রমে লাল উজ্জ্বলতা আর বাদামি বিবর্ণতা বিস্মরণযোগ্য হয়ে ওঠে না। আর, চতুর্থটিতেও যৌবনের উল্লাস, হালকা লাল ও বাদামি-খয়েরি রঙের উপরে, উত্তর-পশ্চিম কোণে, প্রজাপতির সবুজাভ ডানাসমেত মার্জিত প্রকাশযুক্ত উপস্থিতি সত্ত্বেও, যেন বিদীর্ণ। কেননা সারফেসে একটি সরু ও আরেকটি স্ফীত ফাটল প্রতিম বাদামি কৃষ্ণতার দুই আভাহীনতায় তা যেন খণ্ডিত হয়ে আছে। বৈষ্ণব পদাবলীর সেই দুঁহু কোরে দুঁহু কান্দে বিচ্ছেদ ভাবিয়ার মতো কিছুটা। পঞ্চমটিতে ফুলের জবানিতে প্রাণ ও প্রেমহীনতা কিংবা নিষ্প্রাণ প্রেমাভিনয়ের বিষয়টি চমৎকার শিল্পরূপ লাভ করে। আর, ষষ্ঠটিতে ঘটে যেন বিপরীত সংঘট্ট। রঙ বাহারের মেলা সাঙ্গ হলেও রঙের আলোকচ্ছটা সহজে ম্রিয়মাণ ঠেকে না।
প্রেম-প্রকৃতির মাধুর্য ও সৌন্দর্যকে নানাভাবে আক্রান্ত দেখা যায় সুকান্তর বাকি ১৪টি (একটি ব্যতিক্রম বাদে) ভাস্কর্যে। বিশ্বপুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের জয়জয়কারের এই যুগে ধনবাদী সমাজভুক্ত চতুর্দিকের ধ্বংস, সৃষ্টির অবক্ষয় আর শিল্পীর রাগানুরাগ প্রাকৃতিক-নৈসর্গিক অনুষঙ্গের প্রতীকে বাঙ্‌ময় হয় এই ধারার কাজগুলোয়। অভিমন্যুকে ঘিরলো কি আজ শঠের সপ্তরথী; অশনি সংকেত; চন্দ্রকিরণে ঢেকে থাক যত অশুভ ছায়া; রিপু ভ্রমে মরীচিকায়; সঙ-এর সংলাপ; কুহেলিকার প্রণয়গীত; মরীচিকা; পুরোহিত বেশে শ্যেন-শ্বাপদ ঘিরে আছে ওই অগ্নি চোখের আলোতে; ঝরা ফুলে হয় না মালা গাঁথা; নিশিকুটুম্ব; যে কুসুম চুমিল ভূতল/তারি পাশে অলি জুটবে কি?; নিরুপায় তস্কর তপস্বী; কি করে বাঁচাই লালিমা/ঘিরে আছে দেখো দুঃশাসন! শিরোনামের ১৩টি ভাস্কর্য তাই প্রেম-প্রকৃতির অনুষঙ্গেই, প্রথমোক্ত ১৬টির সমান্তরালে, পৃথকতামণ্ডিত হয়ে আছে। উপর্যুক্ত প্রথম ছবিতে মহাভারতে বর্ণিত ঘটনা স্মরণে ঝরে-পড়া ফুল এবং একে তিনটি পাখি ও তিন প্রজাপতির কিছুটা অস্বাভাবিক অভিব্যক্তিযোগে আগ্রাসনের রূপকে, সুকান্ত চৌধুরী, অসৎ মানবশক্তির আক্রমণে সৎ ও নিরীহ মানবিকতার অসহায়ত্ব পরিস্ফুটিত করেন। অশনি সংকেত ছবিতে কর্তিত বৃক্ষের নিচে মাটিতে বসে থাকে পেঁচা। শিল্পী পাখিটির দৃষ্টির দুর্দান্ত প্রাখর্যযোগে এরই অসহায় সংক্ষোভকে প্রতিষ্ঠা দান করেন। তৃতীয় ছবিতে এক ভয়ংকর মনুষ্যমুখ আর উড়ন্ত অলক্ষুণে পেঁচার উপস্থিতি সত্ত্বেও ফুল ও চাঁদের অবস্থানযোগে অশুভ ছায়াকে জ্যোৎস্নায় ঢেকে দেয়ার আশা ব্যক্ত হয়। চতুর্থ ছবিতে অসম্ভব স্ফীতোদর একটি টিকটিকি, কিছুটা ব্যাঙের মতো দেখতে, পাতার ওপরে বসা পোকা শিকারে ছুটে চলে। সুকান্ত এতে মনে করিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথের ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি’র মতো অবিস্মরণীয় কাব্যচরণ। মরীচিকা ছবিতে প্রায় অস্বাভাবিক নারীমুখ এবং তার দীর্ঘ খোলা চুলের ওপর প্রজাপতি ও ফুলের কিছুটা জটিল সচলতা মায়ার পরিবর্তে সত্যিই মরীচিকা তৈরি করে। পুরোহিত বেশে শ্যেন-শ্বাপদ ঘিরে আছে ওই অগ্নি চোখের আলোতে ছবিতে মাছ শিকারে প্রস্তুত আশ্চর্য আলোকময় চোখের বিড়ালের দুর্ধর্ষ আক্রমণাত্মক ভঙ্গি পরিস্ফুটনের কৃতিত্ব সুকান্তকে অবশ্যই দিতে হয়। কি করে বাঁচাই লালিমা/ঘিরে আছে দেখো দুঃশাসন! শীর্ষক ভাস্কর্যটি অভিমন্যুকে ঘিরলো কি আজ শঠের সপ্তরথীর প্রায়-অনুরূপ হলেও নিরুপায় তস্কর তপস্বী ছবির প্রায়-কালো বিড়ালটি জীবন্তই ঠেকে। কাষ্ঠদেহে প্রাণ ফুটিয়ে তোলার এই সাফল্য সামান্য নয় মোটেও। এ পর্যায়ে হারানোর যত ব্যথা… পাওয়ার যে আকুলতা শীর্ষক ব্যতিক্রমী ভাস্কর্যটি, এক কথায়, দুর্দান্ত। ফুল থেকে ফল হওয়ার প্রক্রিয়ায় মিষ্টিকুমড়া হয়ে ওঠার বাস্তবতাটি শিল্পীর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের ফলে কাঠের শরীরে অনুসৃজিত হয়।
সিকি শতাব্দী ধরে বুঝিবা নতুন করে চর্চিত ইমপ্রেশনিস্ট ধারার চারুকৃতির সঙ্গে স্বাতন্ত্র্যযোগেই যুক্ত থাকেন সুকান্ত চৌধুরী। তাহলে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ চট্টগ্রাম-এর পরিচালক র‌্যাফঁল জ্যেগার, প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত ক্যাটালগে শুভেচ্ছা বাণীতে, কীভাবে সুকান্তর কাজে কম খ্যাতিসম্পন্ন ফরাসী পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকর হেনরি রুসোর, যিনি লে ডোয়ানিয়ের রুসো নামে অধিকতর পরিচিত, সাদৃশ্য আবিষ্কার করেন? প্রথমত রুসো পেইন্টার, সুকান্তর মতো ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্যের নির্মাতা নন। দ্বিতীয়ত, রুসোর তৈলচিত্রের পুরো সারফেস ছেয়ে থাকে গাছপালায়, তার চেয়ে বেশি পত্রপল্লবে। সেখানে ফুল কম। একটিতে নগ্নিকাকে পেছন থেকে উঁকি দেয় দুটি বাঘ। আরেকটিতে বাঘের পিঠে বসে, ওই পুষ্পিত-পল্লবিত পটভূমিকায়, হ্যাট-পরিহিত স্যুটেড এক বয়স্ক পুরুষ ম্যান্ডোলিন বাজায়। আরো একাধিক ছবিতে ওই আরণ্যক পরিবেশে, বাঘ, ঘোড়া ও অন্য নিরীহ প্রাণীদের শিকার করে। তাই সুকান্তর কাজের সঙ্গে বিষয়গত কোনো তুলনা এ ক্ষেত্রে চলে না। জ্যেগার কি তবে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকাশ করেন নিজের অজান্তে, কেবল সুকান্তর ফুল-পাতা-পাখি-প্রজাপতি দেখে? প্যারিস শিল্পকলার ঐতিহাসিক রাজধানী হলেও ফ্রান্সেরও বহু আগে ইটালি বা রোম প্রভাবক ও প্রেরণাদায়ক ভূমিকা রাখে বিশ্বশিল্পবোধে ও চৈতন্যে। তাছাড়া একটা নাটকীয় বা ট্যালিপ্যাথিক আন্তর-যোগাযোগ সারা পৃথিবীর শিল্পী-কবিদের মধ্যে থাকেই। তা অনুকরণ-অনুসরণের ফল নয় মোটেও। তাই গগাঁর তাহিতি দ্বীপের রমণীদের সাথে কি সুলতানের কৃষিজীবী নারীকুলের সাযুজ্য দাবি করা যায়?