সুউচ্চ শিল্পাচার্য : কাছে থেকে দেখা

আখতার হোসেন খান

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের সাথে আমার সৌভাগ্যপ্রসূত অনেকগুলো সাক্ষাতের প্রথমটি হয় ১৯৭৫ সনের শুরুতে। ওই সময়ে তিনি ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে আসতেন ঘন ঘন: ব্রহ্মপুত্রের দিকে মুখ করা তাঁর জন্য জেলা প্রশাসন-কর্তৃক প্রস্তাবিত সংগ্রহশালার ভবনের সংস্কার কাজ দেখার জন্য। জেলা শাসক একেএম জালালউদ্দীনের দিন-রাত পরিশ্রমে কাজটি নির্ধারিত পরবর্তী পহেলা বৈশাখের শুভপ্রভাতে উদ্বোধনের জন্য এগোচ্ছিল।
শিল্পাচার্য তখন নতুন রাষ্ট্রে অল্প কিছুদিন আগে নিযুক্ত তিনজন জাতীয় অধ্যাপকের একজন। জেলা প্রশাসনের নবীন কর্মচারীদের একজন হিসেবে আমি তাঁর প্র্রোটোকল দায়িত্ব পালন করতাম অনেকটা স্বেচ্ছায়ই। বাংলা ১৩৮২-র পহেলা বৈশাখে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম যখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন সংগ্রহশালার শুভ উদ্বোধনের, শিল্পাচার্যের মুখে একটা তৃপ্তি ও সাফল্যের স্মিত হাসি যেন ছড়িয়ে পড়ে। বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবারই দৃষ্টি তখন তাঁর মুখের দিকেই গিয়ে ঠেকে।
এর পরে তিনি নিয়মিত আসতেন ময়মনসিংহে। আর আমিও সুযোগ করে নিতাম তাঁর সাহচর্যের। যেটুকু সময় ও সুযোগ পেতাম, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে সেসব কথা গিলতাম। কিন্তু চিত্রকলা-সংক্রান্ত তাঁর কথাগুলো হতো উলুবনে মুক্তা ছড়ানোর মতো; সেসব ব্যাসকুট বোঝা ছিল আমার অসাধ্য। দেশে-বিদেশে তাঁর লেখা-পড়া ও ভ্রমণ নিয়ে অনেক মজার কথাও তাতে আসতো। কীভাবে বিরূপ পরিস্থিতিতে তিনি সামাল দিতেন, তা বলতেন; আর আমি মুগ্ধ নয়নে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম এই মাপের একজন মানুষের সান্নিধ্য পাচ্ছি নিঃসন্দেহে পূর্ব জনমের কোনো সুকৃতির জন্য।
তাঁর চলাফেরার সাবলীল সারল্য মনে রাখার মতোন। ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজে যেমন তাঁর কক্ষে যেতাম নির্দ্বিধায়, তেমনি আমার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে সহজেই আসতেন জেলা পরিষদ ডাক বাংলার যে-কক্ষে আমি থাকতাম সেখানে। আমার অনুরোধে সাদা-মাটা রেস্টুরেন্টেও দু একবার তিনি গেছেন অবলীলায়।
ময়মনসিংহের সংগ্রহশালার উদ্বোধনের পরে বা এর আগে থেকেও তাঁর আরেক দায়িত্ব ছিল সোনারগাঁওয়ের লোক ও চারুকলা ফাউন্ডেশন জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা করার। ১৯৭৫ এর মার্চেই এর কাজ শুরু হয়েছিল। জাদুঘরের গঠন পর্বের অনেক কথাই তাঁর মুখ থেকে তখন শুনেছি। ব্যুরোক্রেসি কীভাবে কাজ ব্যাহত করে, তার ফিরিস্তি পেতাম তাঁর মুখ থেকে। সোনারগাঁওয়ের কাজের সহকর্মীরাও দুএকজন তাঁর সাথে ময়মনসিংহ আসতেন মাঝে-মধ্যে।
ওই যাদুঘরের জন্য স্থান হিসেবে সোনারগাঁও নির্বাচন ছিল তাঁর গভীর চিন্তাভাবনা-প্রসূত। রাজধানীর ঢাকার নৈকট্য, আবার একই সাথে মধ্যযুগের বাংলার একটা প্রাণকেন্দ্র হিসেবে সোনারগাঁওয়ের সুনিশ্চিত অবস্থান তাঁকে ওই জায়গা নির্বাচনে উৎসাহ যুগিয়ে থাকবে। তবে আমি এও মনে করি, অঞ্চলটিতে নদী ও জলরাশির প্রাচুর্যও তাঁকে এই পছন্দের দিকে ঠেলে দেয়।
নদী তাঁর জীবনের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়ানো। ভাটির দেশ কিশোরগঞ্জে তিনি নদী আর পানিতেই মানুষ হন। বৃহত্তর ময়মনসিংহের বুক চিড়ে বওয়া ব্রহ্মপুত্র অল্প বয়স থেকেই তাঁকে টেনে থাকবে। ওই ব্রহ্মপুত্রে একবার নৌভ্রমণে তাঁর একটা পেইন্টিং দেখে এক মাঝির মন্তব্য তাঁর সব সময়ে মনে আসতো: ‘স্যার, আসমান থেকে নীল রঙটা এনে যেন ছবিতে লাগিয়ে দিয়েছেন।”
কিছু দুঃখও ছিল তাঁর মনে। স্বদেশের কিছু মানুষের হীনমন্যতা তাঁকে ব্যথিত করতো। আবার এসবের ব্যাখ্যাও ছিল তাঁর কাছে। তিনি প্রায়ই বলতেন, বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে হীনমন্যতা ছড়ানো-ছিটানো থাকা অবধারিত। প্রথিতযশা শিল্পী ও সমালোচক মোস্তফা জামান মন্তব্য করেছেন, প্রচার মাধ্যমের স্বার্থসাধন বা সব ধরনের রাজনৈতিক নিচুতার মধ্যেও জয়নুল আবেদীন ছিলেন উচ্চতার সুনিদর্শন। স্বদেশবাসীর অনেকের নিচুতা নিয়ে দুঃখী আবেদীনের প্রতি এই হয়তো সেরা সম্মান।
তাঁর আরেকটা সুমিষ্ট দুঃখের কথাও বলতেন মাঝে-মধ্যে। তাঁর তিন পুত্র-সন্তান শুধুই তাঁদের মা জাহানারা আবেদীনকে ঘিরে থাকতেন। একজন কন্যা-সন্তানের অভাব তিনি সারাক্ষণ অনুভব করতেন। তিনি নির্যাতিত হতেন নিঃসঙ্গতা দিয়ে। তিনি বলতে পছন্দ করতেন: ‘‘তিন পুত্র-সন্তান নিয়ে আমি নিঃসন্তান।” ১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যুর আগের কয়েক মাস তাঁর সান্নিধ্য আমি পাইনি। তাঁর ব্যাধির কথাও আমি জানতাম না; এবং মে মাসে তাঁর অন্তর্ধানের পরেই জানতে পারি তিনি অনেক দিক ধরে দুরারোগ্য ক্যান্সারে ভুগছিলেন।

১৯১৪ সালে কিশোরগঞ্জে জন্ম নেয়া জয়নুল আবেদীন কেন অন্য পথে না যেয়ে ১৯৩৩ সালে কোলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন, তার ব্যাখ্যা মেলা ভার। তবে মহৎ লোকেদের জীবনের যাত্রাতো এমনই। রবীন্দ্রনাথ বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে যেয়ে তা অসমাপ্ত রেখে সরস্বতীর সাধনায় নামেন: এতেতো আমাদের লাভই হয়েছে। জয়নুল আবেদীন যে ব্যবসা-বাণিজ্যে বা প্রথাগত সরকারি চাকুরিতে ঢোকেননি, তা-ওতো আমাদেরকে সমৃদ্ধ করেছে।
কোলকাতা আর্ট স্কুলে পাঁচ বছরের লেখাপড়ার পরে তিনি সেখানেই শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর খ্যাতি এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্রহ্মপুত্র নিয়ে তাঁর প্রেম একাধিক পেইন্টিংয়ে প্রকাশ পায়; এবং ১৯৩৮ সালে চব্বিশ বছর বয়সে তিনি এক প্রদর্শনীতে এজাতীয় ছবি নিয়ে সবার নজর কেড়ে গভর্নরের স্বর্ণপদক পান। তবে তাঁর সবচেয়ে বড়ো খ্যাতি আসে ১৯৪৩ এর মন্বন্তরের ভিত্তিতে আঁকা ছবিগুলো থেকে। যামিনী রায়কে নিয়ে লেখা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধে পড়েছি টাকার অভাবে আলমারি থেকে বের করা শাড়িতে তিনি ছবি আঁকতেন। জয়নুল আবেদীন কাঠকয়লা পুড়িয়ে কালি তৈরি করে সাধারণ মানের সস্তা প্যাকিং কাগজে ওই সময়ের ছবিগুলো আঁকেন। মন্বন্তরের ছবিগুলো তাঁর সমাজ-সচেতনতা প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। এই সব অমর রেখাচিত্রে তিনি জীবনের কতো যে কাছে, তাঁর প্রমাণ দিয়েই ইতি টানেননি, প্রচলিত পরিস্থিতিতে বিদেশী শাসন ও শুধুই লাভ গুনতে অভ্যস্ত রাজব্যবস্থা ও বণিকদের বিরুদ্ধেও একটা অবস্থান নেন। কম্যুনিস্টদের একটা প্রকাশনায় দুর্ভিক্ষের চিত্রগুলি প্রকাশিত হলে রাজকর্তারা ওই বইটিকে বেআইনি ঘোষণা করেন।
এর আগে অগ্রজদের প্রভাবে তিনি সাঁওতালদের নিয়ে ছবি এঁকে এদের মাধ্যমে বিদেশী শাসকের হৃদয়হীনতার বিরুদ্ধে তাঁর নিজের অবস্থানের এক ধরনের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। কোলকাতায় থাকার সময়েই তিনি প্রগতিশীল লেখকদের সংস্পর্শে আসেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী শহীদ সোহরাওয়ার্দী। একই সময়ে তিনি পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীন ও গায়ক আব্বাসউদ্দীনের সাথে এক ধরণের সখ্য গড়ে তোলেন।
আর মৃত্যুর দ্বারা ব্যথিত হওয়ার এই বিশেষ দিকটি তাঁকে কোনোদিন ছাড়েনি। তিনি নিজেই বলতেন, ‘মৃত্যুই আমাদেরকে একত্রিত করে’। সংখ্যায় ১৯৪৩ সালের মতো না হলেও আকস্মিকতা আর দুর্বিপাকে ১৯৭০ সালের সাইক্লোন জয়নুল আবেদীনকে সমভাবে বিচলিত করে। তাঁর আঁকা সাইক্লোন ছবিটিও ক্লাসিকের পর্যায়ভুক্ত হয়েছে। তিনি নবান্ন নিয়ে এঁকে বাংলার সংস্কৃতির মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন , মওলানা ভাসনীর কৃষক সমাবেশে যোগ দিয়েছেন, তাঁকে নিয়ে অনবদ্য ছবি এঁকেছেন, সিরিয়া-জর্ডানে ফিলিস্তিনী শরণার্থী শিবির পরিভ্রমণ করে মানুষের দুর্দশাকে চিত্রিত করেছেন।
১৯৪৭ সালে বিশ শতকের দ্বিতীয় বংগভঙ্গের অল্প পরে তিনি কোলকাতা আর্ট স্কুলের পাঠ চুকিয়ে ঢাকায় আসেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ হন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এই ইনস্টিটিউটের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে বলে থাকেন প্রতিষ্ঠান তৈরিতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত ও মহা উদ্যোগী। এর একটা কারণ হয়তো এই হবে যে অতি অল্প বয়সেই তিনি কোলকাতা আর্ট স্কুলের গুণ-মাহাত্ম্য টের পান। বিলেতে বছর দুয়েকের লেখাপড়ার সুযোগও আসে ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে। বিলেতে লেখাপড়ার পরে তাঁর হাত ধরেই পূর্ব বাংলার ‘আধুনিক চিত্রকলা’র যাত্রা শুরু হয়।
তবে তাঁর শিল্পী জীবনকে অনেকেই বস্তুনিষ্ঠ ভাষা বা মুখ্য ভাব ও আধুনিক শৈলীর মধ্যেকার নাগড়দোলায় চড়া বলে অভিহিত করেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি লোকশিল্পের দিকে বেশি সময় দেন এবং সবাইকে এই বোধ দিতে সচেষ্ট হন যে তিনি এখন লোকশিল্প ও গ্রামের কারুপণ্যকে গ্রহণ করেছেন । উল্লেখ্য তাঁর এই রূপান্তরেরই ফলশ্রুতি সোনারগাঁওয়ের লোকশিল্প ফাউন্ডেশন।
তাঁর পরিপ্রেক্ষিত জ্ঞান বা পার্স্‌পেক্টিভ নিয়ে অনেকে কথা বলেন। কিন্তু সে আলোচনাতো চিত্রী-সুধীদের। আমাদের মতো ব্রাত্যজনেরা মনে রাখবে তাঁর আঁকা মাঝিদের গুণ-টানা, ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে আঁকা রেখাচিত্রগুলো, ১৯৭০- এর সাইক্লোন, মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১, স্ট্রাগল এসব সহজবোধ্য ছবি। তিনি কঠিন পথেও গেছেন; কিন্তু সেখান থেকে ফিরেও এসেছেন।
বিশ শতকের চিত্রকলা বিশারদেরা, যেমন ক্লাইভ বেল ও রজার ফ্রাই, যেসব নতুন ধারণা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন, তাঁদের তাত্ত্বিক বিচারে জয়নুল আবেদীন কোথায় অবস্থান নেবেন? আমরাতো বেল-ফ্রাই যেমন বলতেন, রেখা ও রঙের সম্পর্ক ও সমবায়ের সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক গুণাগুণই আমাদের মধ্যে নান্দনিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তা-ই আর্টের মুখ্য বিচার্য, তার বিষয়বস্তু নয়, এমন শক্ত তত্ত্বে অভ্যস্ত হইনি। আর ব্রাত্যদের তার প্রয়োজনও নেই। জয়নুল আবেদীনও আমাদেরকে সে-শিক্ষা দেননি। তাঁর সব জনপ্রিয় চিত্রকর্ম ও বিষয়বস্তুর সুমহান চিত্রায়ন; পশ্চাতে বেল-ফ্রাই-কথিত ‘সিগনিফিক্যান্ট ফর্ম’ থাকলেও থাকতে পারে। আমাদের তাতে ক্ষতি নেই।