সিরিয়া নিয়ে তুরস্ক-রাশিয়া-ইরান আঁতাত

রায়হান আহমেদ তপাদার

রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের কারণে তুরস্কের পররাষ্ট্র নীতির ড়্গেত্রেও পরিবর্তন আসছে। তুরস্কের সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। পশ্চিমা দেশ ও রাশিয়ার মধ্যে এই স্বার্থের দ্বন্দ্বে মাঝখান থেকে বলকানের গ্যাস বাজারের কৌশলগত গুরম্নত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। আলবেনিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাসকল মিলো এএফপিকে জানান, পূর্ব ও পশ্চিমকে সংযুক্ত করা জ্বালানি করিডোরের ক্রসরোডে দড়্গিণপূর্ব ইউরোপ অবসি’ত। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুব আকর্ষণীয় না হলেও ইউরোপের অন্যান্য কৌশলগত বাজারের ট্রানজিট টেরিটোরি ও গ্যাস মজুদের দিক থেকে এ অঞ্চলের গুরম্নত্ব অনেক। এ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিসত্মারে জ্বালানিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে রাশিয়া। যার সুবাদে বেশ কয়েক বছর দখলদারিত্বের এই খেলায় জয়লাভ করেছে রাশিয়া; এবার এ পথে এগিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। এরই মধ্যে এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি গ্যাস সরবরাহ প্রকল্প চালু করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য এ অঞ্চলের মস্কো নির্ভরশীলতা কমে আসবে। রাশিয়ার সোচিতে ১৭ সেপ্টেম্বর রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান ও ভস্নাদিমির পুতিনের মধ্যে সিরিয়া নিয়ে, বিশেষ করে ইদলিব নিয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। দুই নেতা ঐকমত্যে পৌঁছেন।
কিন’ তাঁদের সমঝোতার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর সিরিয়ার লাতাকিয়ায় হামলা চালায় ফ্রান্স ও ইসরায়েল। ওই অভিযানে সৃষ্ট পরিসি’তিতে একটি রম্নশ যুদ্ধবিমান ভূপতিত হয় আর বিশ্ব এগিয়ে যায় পরমাণুযুদ্ধের দিকে। এরদোয়ান ও পুতিন ইদলিবের ব্যাপারে যে ঐকমত্যে পৌঁছেন, সে ব্যাপারে রম্নশ সংবাদমাধ্যম আরটি জানায়, ইদলিবে ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার চওড়া বেসামরিক এলাকা প্রতিষ্ঠা করা হবে; কোন জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরম্নদ্ধে অভিযান চালানো হবে, তা নির্দিষ্ট করা হবে; ইদলিব সীমানেত্ম তুর্কি ও রম্নশ বাহিনীর যৌথ টহলের ব্যবস’া করা হবে এবং হামা, দামেস্ক ও আলেপ্পোর মধ্যকার প্রধান সড়ক খুলে দেওয়া হবে।
এরদোয়ান-পুতিন আলোচনার অনেক দিক ছিল। এসবের একটি হলো, ইদলিব ইস্যুতে পশ্চিমাদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে উভয় পড়্গের উদ্বেগ। তুরস্ক এবং রাশিয়া এখন তাদের কৌশলগত সম্পর্ককে আরো জোরদার করছে। ভবিষ্যতে তাদের এ সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা গুরম্নত্বপূর্ণ। তুরস্ক রাশিয়ান এস-৪০০ ড়্গেপণাস্ত্র প্রতিরড়্গা ব্যবস’া ক্রয় করার মাধ্যমে উভয় দেশের রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্কের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী এপ্রিল মাসে আক্কু ইউ পরমাণু শক্তি পস্ন্যান্ট প্রকল্প শুরম্ন করা এবং টার্কস্ট্রিম প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপ লাইনের অগ্রগতি উপলড়্গে সমপ্রতি যে গ্রাউন্ড ব্রেকিং অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তাতেই উভয় দেশের সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আক্কু ইউ হবে তুরস্কের প্রথম পারমাণবিক পস্ন্যান্ট। জ্বালানি ড়্গেত্রে এটা হবে তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার নিদর্শন। আঙ্কারা এ প্রকল্পটিকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়েছে।
তুরস্কের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ককে বিশেস্নষণ করতে গিয়ে তুরস্কের ন্যাটো সদস্য হওয়ার বিষয়টি সব সময় একটি প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হয়। আঙ্কারা এস-৩০০ সিস্টেম ক্রয় করার কারণে ওয়াশিংটন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং তুরস্কের কাছে আমেরিকার এফ-৩৫ ফাইটার জেট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে।২০১৫ সালে রাশিয়ার একটি যুদ্ধ বিমান আকাশসীমা লঙ্ঘন করলে তুরস্ক বিমানটিকে গুলি করে ভূপাতিত করে। এরপরই দু’দেশের মধ্যে দ্রম্নত রাজনৈতিক ও কূটনেতিক সম্পর্কের ড়্গেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়। প্রথমে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলেও পরে এ উত্তেজনা হ্রাস পায় এবং সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়।
সিরিয়ার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে উভয় দেশ কাছাকাছি আসে এবং দ্বিপড়্গীয় পর্যায়ে তাদের মধ্যকার যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। তুরস্ক, ইরান এবং রাশিয়ার নেতারা সিরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করার জন্য আশতানায় শানিত্ম আলোচনায় মিলিত হন। সিরিয়ার ইদলিব সঙ্কট নিয়ে আলোচনার পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান ও রম্নশ প্রেসিডেন্ট ভস্নাদিমির পুতিন প্রকাশ্যে করমর্দন করেন। এরপর সিরিয়া থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যাপারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধানেত্মর পর তুরস্ক ও রাশিয়ার কর্মকর্তা সমপ্রতি মস্কোতে একটি বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে তারা সিরিয়া নিয়ে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়। তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক এখন পর্যনত্ম কূটনৈতিক ড়্গেত্রে ওঠানামা এবং উত্তেজনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
অতীতে রাশিয়ার প্রতি তুরস্কের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রথাগতভাবে ন্যাটো জোটের মতোই। তুরস্ক ন্যাটোর বাইরের দেশ হিসেবে রাশিয়ার ব্যাপারে ছিল সতর্ক। এখন আনত্মর্জাতিক ড়্গেত্রে তুরস্কের ইতিবাচক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর সাথে অন্যান্য দেশের সাথে তুরস্কের দ্বিপড়্গীয় সম্পর্কের ড়্গেত্রে বহুমাত্রিকতা আনা প্রয়োজন। আনত্মর্জাতিক পর্যায়ে ভবিষ্যতে ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করতে হলে তুরস্ককে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও নমনীয় অবস’ান গ্রহণ করতে হবে। তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটার পরিপ্রেড়্গিতে মস্কো-আঙ্কারা সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের অবনতি রাশিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্কের দাবি অনুযায়ী ফতুলস্নাহ গুলেনকে তুরস্কে প্রেরণে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে এবং মার্কিন ধর্মযাজক অ্যান্ড্রো ব্রম্ননসেনকে কারারম্নদ্ধ করার পরিপ্রেড়্গিতে দু’দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্কের বিরম্নদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে তুর্কি অর্থনীতিতে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। সিরিয়ায় কুর্দি নেতৃত্বাধীন পিওয়াইডি কিংবা ওয়াইসি জিকে আমেরিকা সমর্থন দেয়ায় তুরস্ক উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। এটাও যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্ক সম্পর্কের ড়্গেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্ক শীতল সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া-তুরস্কের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সতর্কতার সাথে এগিয়ে আসে। তুরস্কের জ্বালানি ও প্রতিরড়্গা খাতে রাশিয়ার কৌশলগত সমর্থন এবং সিরিয়ার ইদলিবে একটি অসামরিক অঞ্চল গড়ে তুলতে দু’দেশের যৌথ সিদ্ধানত্ম এসব কিছু মস্কোকে আঙ্কারার একটি লাভজনক অংশীদারে পরিণত করেছে। সামপ্রতিক বছরগুলোতে, এরদোগান ও পুতিনের মধ্যে প্রায়ই বৈঠক হয়েছে। এতে এটা স্পষ্ট হয়েছে, রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ থেকে দূরে সরে গিয়ে তুরস্কের সাথে সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করেছে। অবশ্য এখনো দু’দেশের মধ্যকার গভীর সম্পর্কের বিষয়টি অলাভজনক বা অসুবিধাজনক এবং এর জন্য অনেক মূল্যও দিতে হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখলকে আঙ্কারা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কিন’ তখন থেকে এ পর্যনত্ম তুরস্ক ওই বিষয় নিয়ে রাশিয়ার সাথে যেকোনো বিতর্ক এড়িয়ে গেছে। কিন’ ইদলিব ইস্যুতে রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের ঐকমত্যে পৌঁছানোর কারণ এরদোয়ানের দুর্বল অবস’ান। ইউরোপ-আমেরিকার মিত্রদের খেপিয়ে দেওয়ার পর রাশিয়া, ইরান ও কাতার ছাড়া আর কারো ওপর ভরসা করার সুযোগ তাঁর নেই। সমঝোতা না হলে তুরস্কের সঙ্গে রাশিয়া ও সিরিয়ার যুদ্ধ বেঁধে যেত আর তুরস্কের জন্য সেটা ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে আনত।
উলেস্নখ্য, যুদ্ধ বাধলে ইদলিব থেকে লাখ লাখ শরণার্থীর তুরস্কে ধেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, পরিণতিতে তুরস্কে চাড়া দিয়ে উঠত গৃহযুদ্ধ। সর্বোপরি মস্কো-আংকারা মুখোমুখি হলে সেই দ্বন্দ্ব সামরিক প্রেড়্গাপট ছাড়িয়ে তুরস্কের উচ্চাকাঙড়্গী অভিলাষ পূরণে ব্যাপক বাধা সৃষ্টি করত। এতে তুরস্কের অভ্যনত্মরীণ সি’তিশীলতা রড়্গা ও আঞ্চলিক নেতৃত্ব অর্জন, উভয় লড়্গ্যই বাধার মুখে পড়ত। তুরস্ক-রাশিয়ার এ মতৈক্যে নাখোশ যুদ্ধবাজ পশ্চিমের তৎপরতা দেখার জন্য কয়েক ঘণ্টাই যথেষ্ট ছিল। সিরিয়ায় হামলা করে বসল ইসরায়েল ও ফ্রান্স। যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণও হয়তো ছিল। এবার তারা আগের মতো কোনো অজুহাতও দেখায়নি। তুরস্ক-রাশিয়ার চুক্তির ফলে পুরো সিরিয়ায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হবে সেটা কিছুতেই মানতে পারেনি শত্রম্নপড়্গ। তাই তারা সিরিয়ায় হামলা চালায়।আগেরবার তুরস্ক, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে অস্ত্রবিরতি চুক্তির আওতায় সিরিয়ায় যে বিমান হামলামুক্ত আকাশসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। সেবার সিরিয়ার শত্রম্নপড়্গ ধরে নিয়েছিল, সিরিয়া দুই টুকরা হয়ে যাবে। কিন’ আজকের বাসত্মবতা একদম আলাদা। ইদলিব ছাড়া অন্য কোথাও সেই আকাশসীমার প্রয়োজন পড়ছে না। চীন, রাশিয়া, ইরান ও সিরিয়ার কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক দড়্গতায় ইদলিবও একদিন জিহাদি উপদ্রবমুক্ত হবে। সিরিয়ায় পশ্চিমা গোষ্ঠী ও ইসরায়েল মুখোশের আড়ালে থেকে হসত্মড়্গেপের যত অপচেষ্টাই চালাক, তাতে ইদলিবের এ নিয়তি ঠেকানো যাবে না।