সিদ্দিক আহমেদ : জীবন ও শিল্পের গাঢ় অনুভব

সুভাষ দে
siddique-bhai---Copy

খুব অল্পেতে সন’ষ্ট থাকতেন সিদ্দিক ভাই। জীবনযাপন, খাওয়া-দাওয়া, বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা, শিল্পবোধ, রুচি-সবকিছুতে তাঁর পরিমিতি ছিল। তাঁকে আমি উচ্চস্বরে কিংবা হো হো করে, তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মতো হাসতে দেখিনি কখনো। মুচকি হাসি, প্রশংসায় আনত। একেবারে সরল, শব্দহীন পথচলা।
বইপড়া কিংবা কোনো একটি সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা হতো, একটু এগুলে রাজনীতি, এর বাইরে নয়, তাও অল্পসময়ের জন্য কিন’ তার ঐ রকম একটি আদল গেঁথে থাকত।
ইংরেজিতে একটি কথা আছে ‘ঝসধষষ রং নবধঁঃরভঁষ’ ছোটই সুন্দর, সিদ্দিক ভাইও তাই। তাঁর বইগুলির নামও অনেকটা এই রকমই, ‘ছিটেফোঁটা’, ‘জল ও তৃষ্ণা’, ‘প্রভৃতি’-এসব। আমরা যে সব বিষয় জানি না কিংবা কম জানি সে সব বিষয়ে ছোট ছোট লেখা, দীপ্তিময়, পাঠককে ধাক্কা দেওয়ার মতো, পাঠক গভীরে যেতে চাইলে তাকে আরও কাঠখড় পোড়াতে হবে অর্থাৎ পরিশ্রম করে আরও বইয়ের সন্ধান নিতে হবে, তার পরে তো পড়া।
তাঁর সাথে আমার আফ্রিকান সাহিত্য, ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হতো, এটি নিয়ে সমপ্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে-ল্যাটিন আমেরিকার প্রতি তাঁর দুর্বলতা ছিল। থাকবেই তো, সেখানে নেরুদা আছেন, মার্কেজ আছেন, আছেন চে, ক্যাস্ট্রোর মতো বিপ্লবীরা। আছেন সান্দানিস্ত বিপ্লবীরা কিংবা হাল আমলের স্যাভেজ কিংবা ব্রাজিল-মেক্সিকোর সমাজবাদী রাষ্ট্রনেতারা। তিনি আমাদের ঐ সব দেশের কবিদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন লেখায়।
খুবই সাদাসিধে জীবন তাঁর। মাস্টারি, সাংবাদিকতা, পড়াশোনা, লেখালেখি-এসবের কি আমাদের সমাজে অর্থকরী মূল্য আছে? বোধ হয় না, অথচ সিদ্দিক ভাই এসব আবর্তেই সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন।
তরুণ বয়সে ষাটের দশকে তিনি দুজন কমিউনিস্ট নেতার সান্নিধ্যে এসেছিলেন। একজন সেই সময় নিষিদ্ধঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সম্পাদক কমরেড অমর সেন, অন্যজন দেশের বিখ্যাত কৃষক নেতা কমরেড আবদুস সাত্তার। দু’জনেই মাস্টারদা সূর্য সেনের কিশোর সাথী ছিলেন।
অমর সেন ডিস্টিংশান নিয়ে জেল থেকে বিএ পাশ করেছিলেন। আবদুস সাত্তারও মেধাবী ছাত্র ছিলেন, শিক্ষকতাও করেছেন। সিদ্দিক ভাইয়ের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। ঢাকায় গিয়ে পেলেন সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্তকে। এর ফলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির হিরন্ময় বাতায়ন খুলে গেল। তাঁর বোধিতে প্রবিষ্ট হলো জীবন ও সংস্কৃতি বিকাশের অনির্বাণ সব উপাদান যা মার্কসবাদের বিশ্ববীক্ষা থেকে উৎসারিত।
সিদ্দিক ভাই ‘মানবফুল’-এ রূপান্তরিত হলেন, তাঁর সৌরভে আমরা মুগ্ধ হলাম। একেবারে শেষ দিকে এসে ‘চধংঃড়ৎধষ ষরভব’-এর প্রতি আকর্ষিত হলেন। আমাদের সবাইকে এই জীবন টানে যেমন ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর ‘সলিটারি রিপার,’ মানুষের জীবনে একটা সময় আসে যখন সে প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি সমর্পিত হয়।
সিদ্দিক ভাইকে নিয়ে যে এত আয়োজন তরুণদের, সংস্কৃতিকর্মীদের, তাতে মনে হয়, প্রজ্ঞা, রুচির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। আমরা কর্পোরেট অর্থনীতিকে কর্পোরেট সংস্কৃতিতে নিয়ে যাচ্ছি, এখানে প্রকৃতি-সময়-জীবন অনেকটা শেকলে বাঁধা। তবু কিছু মানুষ সতেজ নিঃশ্বাস নেবার কথা বলেন, সিদ্দিক ভাই তাঁদের একজন।

সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ