সিদ্দিক আহমেদের লেখালিখি এবং তাঁর দায়বদ্ধতা

আবু সাঈদ
siddik-bhai_rajesh-(6)1

মৃত্যুরে কে মনে রাখে?
মৃত্যু সে তো মুছে যায়।
যে-তারা জাগিয়া থাকে তারে লয়ে
জীবনের খেলা……
( মৃত্যুরে কে মনে রাখে; প্রেমেন্দ্র মিত্র)

সিদ্দিক আহমেদ পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। তারচেয়ে বড় পরিচয় তিনি লেখক। তাঁর লেখায় জীবনের প্রতি একটা প্রবল আকর্ষণবোধ পাঠকরা লক্ষ্য করে থাকবেন। জীবনবাদী তিনি এই অর্থে যে, মৃত্যুকে তিনি অস্বীকার করেননি। আর করেননি বলে জীবনকে ভালোবাসতে পেরেছেন। তাঁর মৃত্যু ভাবনাও তাই দার্শনিক ন্তরে উন্নীত হয়েছে। এজন্য ‘বেলা বয়ে যায়’ নামে দ্বীজেন্দ্রলাল রায়ের গানটি তাঁর এত প্রিয়। প্রিয় এ কারনে যে, এখানে জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগ আছে। মৃত্যু এ জীবন-বন্ধনকে ছিন্ন করতে পারে না। আর পারে না বলেই জীবনের কাছে মৃত্যু শেষ পর্যন্ত পরাস্ত হয়। তাঁর এ জীবন ভাবনাটি এসেছে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। তিনি নিজের কথা ভাবতেন না, ভাবতেন সবার কথা। ব্যক্তির কথা ভাবতেন না, ভাবতেন সমাজের কথা।
সিদ্দিক আহমেদ বাঙালির সম্মিলনের কথা বলতেন। আর এ সম্মিলন ঘটাতে পারে কেবল সংস্কৃতিই। এজন্য বৈশাখ তাঁর এত প্রিয়। যে বৈশাখ বাঙালিকে এক করে। শুধু এক নয়, করে ঐক্যও। এ ঐক্যের সাধনাই ছিল তার সারা জীবনের অন্বিষ্ট। তবে মাঝে মাঝে আতঙ্কিত হতেন এই ভেবে যে, সে ঐক্যে ফাটল ধরে কি-না। ধরার আশঙ্কাকেও তিনি উড়িয়ে দেননি। এর দুটো কারণ তিনি স্পষ্ট করে বলে গেছেন তাঁর ‘দৃষ্টি আমার চোখের পাতা খোলে না’ প্রবন্ধে। এ দুটোর একটি ‘মধ্যবিত্তের মানসিকতা’ এবং অন্যটি ‘ মূল্যবোধের সংকট’। এবং এ দুটোই আজ বাঙালি সত্তাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। প্রথমটির কারণে তিনি মনে করেন, বাঙালি হারাবে তার সূক্ষ্ম অনুভূতি, আবেগের স্বচ্ছন্দ প্রকাশ, বোধের গভীরতা, আর লোপ পাবে কল্পনার বিস্তারণ। বাঙালি শিকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, হারাবে তার সংস্কৃতি, ভুলে যাবে তার ঐতিহ্য আর গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে ইতিহাস-দর্শন-সমাজ। জটিল আকার ধারণ করবে সমাজ এবং সমাজ-জীবন । অবশেষে এ জাতি প্রবিষ্ট হবে এক আবেগ-অনুভূতিহীন নগরত্বময় জীবনে। আর ‘তখন পদাবলি কীর্তন শুনতে শুনতে কিংবা রামলীলা দেখতে দেখতে চোখের পানিতে স্নিগ্ধ হবার মানসিকতা বাঙলি জীবন থেকে হারিয়ে যাবে।’ আর অন্যদিকে মূল্যবোধের সংকটে বাঙালি প্রবেশ করবে এক ‘কানাগলিতে।’ এর ফলে মানুষের বোধ ক্রমেই রূপান্তরিত হবে মমতাহীন আচার অনুষ্ঠানে। পুরানো প্রতিকৃতিগুলো ঙাংচুর হবে। মানুষ ব্যঙ্গ করবে পুরানো মূল্যবোধকে। এ বড় অশনিসংকেত। শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, সমাজের জন্য তো অবশ্যই, জাতির জন্যও। এর থেকে পরিত্রাণের উপায কী? উপায় তিনিই বলে দিচ্ছেন। বলছেন, তিনি পুরানো মূল্যবোধকে নিয়েই বাঁচবেন। এবং বাঁচতেই হবে। পুরানো মানে নতুনের বিপরীত নয়, পরাতন মানে সনাতন, মানে শাশ্বত। এ বিষয়গুলোকে তিনি সাংস্কৃতিকভাবে দেখেননি, দেখেছেন রাজনৈতিকভাবেও। এজন্য তাঁর লেখা রাজনীতি নিরেপক্ষ নয়। তিনি নিজেও প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
সিদ্দিক আহমেদ লেখেন পাঠকের জন্য, বৃহত্তর অর্থে সামাজিক প্রয়োজনে। সামাজিক দায়বদ্ধ লেখক তিনি। যদি না লেখেন তবে এমনও হয়েছে যে, পাঠকরাই তাকে দিয়ে জোর করে লিখিয়ে নিচ্ছেন। কারণ পাঠকরা তাঁর লেখার মধ্যে তাদের কথাই পান। তাঁর লেখালেখি অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। দার্শনিক দেকার্তের মতে “আমি চিন্তা করি তাই আমি অস্তিত্বমান”, সিদ্দিক আহমেদ একে আরো সংহত এবং সৃষ্টিশীল করে বলেছেন, “আমি লেখালেখি করি, তাই আমি অস্তিত্বমান।” এ অস্তিত্বটা ব্যক্তির নয় শুধু, সবার। সত্যি করে বললে বলতে হয় সামগ্রিকতার। এ সামগ্রিকতার জন্য তিনি একা একা বাঁচতে চাননি। তিনি বাঁচতে চান সবাইকে নিয়ে। তবে তিনি চাইতেন তাঁর অস্তিত্বকে আরো অস্তিত্বমান করে তুলতে। ড. আহমদ শরীফ সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন, তা তাঁর নিজের সম্পর্কেও বলা যায়। তিনি বলেছেন,“ পৃথিবীতে কত মানুষ আসল, কত মানুষ গেল। মানুষ কয়জনকে মনে রাখে। ইতিহাস তার বুকে কয়জনকে ঠাঁই দিয়েছে। নিজ অস্তিত্বের প্রকাশে যিনি যত মৌলিক ও বিদ্রোহী ইতিহাস তাঁকে তত জায়গা ছেড়ে দিয়েছে।”( সেই মানুষটি নেই)। সিদ্দিক আহমেদও সেই মানুষ যিনি নিজেও ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছেন।
আহমদ শরীফ যেমন মার্কসবাদকে যান্ত্রিকভাবে গ্রহণ করেননি, তেমনি সিদ্দিক আহমেদও জীবনকে গতানুগতিকভাবে যাপন করতে চাননি। এ ধরনের যাপন তাঁর জীবন দর্শনের পরিপন্থী। তিনি মনে করেন, বাঁচতে হবে নিজের প্রয়োজনে শুধু নয়, সামাজিক প্রয়োজনে। সমাজে তিনি আলোড়ন তুলতে চাইতেন; যে রকম সমাজকে আলোড়িত করে গেছেন ড. আহমদ শরীফ।
লেখক এবং সাংবাদিক হিসেবে সিদ্দিক আহমেদ বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখেছেন। তাঁর লেখার মধ্যেও রয়েছে বিচিত্রতা। রাজনীতি করেছেন, করেছেন মানুষের জন্য। এ রাজনীতিই তাঁকে দায়বদ্ধ করেছে। এ তাঁর রাজনীতির শিক্ষা। রাজনীতির কারণে পলাতক ছিলেন কিন্তু দার্শনিকভাবে তিনি পলায়ন প্রবৃত্তি নন। তিনি সৃষ্টিশীল। সৃষ্টিশীল বলেই স্বাভাবিকভাবে স্থিতির সঙ্গে তিনি সংঘাতে ছিলেন। যে নদীর স্রোত নেই তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। যার সময় স্থির তার মরণও অনিবার্য। বস্তুর সঙ্গে বস্তুর সংঘর্ষই নতুন বস্তুর উৎপত্তি। তেমনি চিন্তার সঙ্গে চিন্তনের সংঘর্ষে নতুন চিন্তার উৎপত্তি। সৃষ্টি হয় ‘বোধের জাগরণ”। এভাবে অগ্রসর হয় সমাজ, সভ্যতার। এগিয়ে যায় মানবপ্রবাহ। এ বিষয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ,“নিজ পরিবেশের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করে বোধের জাগরণ ঘটানোর কাজে ব্রতী হন। জীবন, সমাজ-সংলগ্নতাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” (কবির জলপান, কবির জলপান)। এ জীবন সংলগ্নতার জন্য তিনি অত্যধিক শিকড়সংলগ্ন হয়েছেন। এজন্য তিনি আইডেনটিফিকেশন নিয়ে কোন আপোসরফায় যেতে চাননি। যাওয়ার প্রয়োজনবোধও করতেন না।
তাঁর লেখার মধ্যে অকারণ উচ্ছ্বাস নেই। আবেগকে তিনি পরিশীলিত করে সত্যকে উদঘাটন করেছেন। ভালোবাসেন কবিতা। তাঁর লেখার মধ্যে প্রায়ই কবিতার উল্লেখ পাই। কবিতা তিনি ভালবাসেন আর ভালবাসেন গান। সভ্যতার ঊষালগ্নে কবিতা ও গানই ছিল মানুষের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম। পাস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনে এ দুটির মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য শুধু নয়, শাশ্বত এবং চিরন্তনও। মনে হয় এজন্যই তিনি লেখায় এ দুটি উদাহরণ প্রায়ই দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এ উদাহরণ তিনি দিতেন প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এর ফলে তাঁর লেখা শুধু স্বাতন্ত্র্য হয়নি, ওজস্বীও হয়েছে।
নিজের চারপাশের জীবন ও সমাজকে তিনি গভীর পর্যবেক্ষণে রাখতেন। লেখার মধ্যে আন্তরিকতার অভাব ছিল না। বাক্য ছোট ছোট করে লিখতেন। বক্তব্যকে সহজ-সরলভাবে প্রকাশ করতেন। তিনি নিজেকে সংযত রাখতন কিন্তু কথা বলতেন সংগতভাবে। পাঠককে বলতে হয় না, “তোমার ভাষা বোঝার আশায় দিয়েছি জলাঞ্জলি।” উপলদ্ধির সূক্ষ্মতায়, ভাবের গভীরতায়, বিষয়বস্তুর ব্যাপকতায় এবং চেতনার নব নব উন্মেষে তাঁর লেখা অনেকদিন ভাবাবে পাঠক সমাজকে।
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পারিপার্শ্বিকতা, অব্যক্ত কথা, অপ্রকাশ্য ভাব তাঁর লেখায় দেখে আমরা চমৎকৃত হয়ে ওঠি, বাঙ্ময় হয়ে ওঠি, হয়ে ওঠি আরো বেশি সচেতন। আর অনুভব করতে থাকি আমাদের অুভূতিগুলো, মুক্ত হই অপ্রকাশের ভার থেকে। সিদ্দিক আহমেদ আর পাঠক এখানে একাকার হয়ে যায়। এজন্য তাঁর নীরবতাকে পাঠক সহ্য করতে পারতেন না। লেখার জন্য বার বার তাগাদা আসতো সেই পাঠকের কাছ থেকেই। বলতেন, “ কিছু লেখার জন্য।” তাঁর ঋজু এবং স্পষ্ট বক্তব্য পাঠককে শুধু মুগ্ধ নয়, ভাবনায় তাড়িতও করে। তিনি পাঠকের চাহিদাকে মূল্য দিতেন, সম্মান দিতেন। চাহিদা না বলে বলা দরকার ভালোবাসা। এ ভালোবাসার জন্য তিনি আবার নিয়মিত হতেন তাঁর নির্ধারিত কলামে। পাঠক- লেখক এই ধরনের সম্পর্ক স্থাপনে তিনি উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। এবং এখানেই তিনি অনন্য।