আজ রামগড়মুক্ত দিবস

সাড়ে চার দশকেও গড়ে ওঠেনি যুদ্ধস্মৃতির সংগ্রহশালা

নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি
Untitled-1

২৫ মার্চের কালরাত্রির পর চট্টগ্রাম অঞ্চলে তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বৃহত্তর চট্টগ্রামে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। পাকিস্তানি হায়েনাদের আক্রমণের মুখে কৌশলগত কারণে রামগড় হয়ে ওঠে নির্ভরযোগ্য প্রতিরোধব্যুহ। ২ মে রামগড়ের পতন ঘটলে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সামরিক কর্মকর্তা এবং বেসামরিক যোদ্ধারা ভারতে পাড়ি জমান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাই সীমান্ত শহর রামগড়ের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের কাছাকাছি সময় ৮ ডিসেম্বর রামগড়কে হানাদারমুক্ত করেন অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
কিন্তু সেই ইতিহাসমণ্ডিত জনপদে গড়ে ওঠেনি আজও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনীয় সংগ্রহশালা। সংরক্ষণ করা হয়নি স্মৃতিচিহ্নগুলোও। যা কিছু ভাস্কর্য গড়ে তোলা হয়েছে তাও এখন অরক্ষিত এবং অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলের মহকুমা শহর রামগড়ের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সীমান্ত নদী ফেনী। অবস্থানগত কারণে শহরটি তৎকালীন ভারত এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভূরাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে রামগড় হয়ে ওঠে ট্রানজিট পয়েন্ট। বৃহত্তর চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ পাকিস্তানি হায়েনার হাত থেকে বাঁচতে এ পথেই শরণার্থী হয়েছিলেন ভারতে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম পরিকল্পনা কেন্দ্র হিসেবেও রামগড়ের স্থান ইতিহাস স্বীকৃত। ১ নম্বর সেক্টরের অনেক রাজনৈতিক এবং সামরিক সংগঠক রামগড় হয়ে ভারতে পাড়ি জমান।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, রামগড় উপজেলা পরিষদের প্রবেশমুখে হ্রদের পাড়ে শহীদ মিনার এলাকায় ভাস্কর মৃণাল হক নির্মিত ‘বিজয়’ নামের একটি ভাস্কর্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম ৭ বছর আগে এটি উদ্বোধন করেন। কিন্তু ভাস্কর্যটির ওপরের অংশ এখনো অসম্পূর্ণ। উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, এই ভাস্কর্যের ঠিকাদার সমুদয় টাকা তুলে নিয়ে গেছেন। ভাস্কর মৃণাল হকও পুরো টাকা পাননি। ফলে ভাস্কর্যটি অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে। ভাস্কর্যটির পাশেই জাতির পিতার সাত মার্চের জনসভার আদলে টেরাকোটার একটি শিল্পকর্ম রয়েছে। এসব স্থাপনা একেবারে উন্মুক্ত এবং অরক্ষিত। এখানে এখন অবাধে গবাদিপশু চরে বেড়ায়।
অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও মুক্তিযোদ্ধা সমর কৃষ্ণ চক্রবর্তী বলেন, ৬ ডিসেম্বর সকালবেলা বিমান বাহিনী রামগড় এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিমান হামলা শুরু করে। এতে পাক হায়েনাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। তারা চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের দিকে পালানোর প্রস্তুতি নিতে থাকে। তখনকার রামগড়ের আওয়ামী লীগ কর্মী মুনশি মিয়া খবর দেন যে, পাকিস্তানি সেনারা সরে গেছে। খবর পেয়ে আমরা আট ডিসেম্বর বিকেলে রামগড় পৌঁছি। শহরটিকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করি।
তিনি বলেন, রামগড়কে মুক্তাঞ্চল ঘোষণার সময় আমাদের কমান্ডিং নেতা হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা, রণবিক্রম ত্রিপুরা এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত সুলতান আহমদসহ (প্রয়াত) অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা মনছুর আহমেদ বলেন, মরহুম সুলতান আহমেদের নেতৃত্বে দুপুরের দিকে রামগড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। তখন থেকেই রামগড়মুক্ত দিবস পালন করা হচ্ছে।
মুক্তিযোদ্ধা কালাচাঁদ দেববর্মন বলেন, তখন আমাদের খুশি দেখে কে! তখন তো রোড এ রকম ছিল না। ছিল মেঠোপথ, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। ভারত থেকেও তখন অনেক লোক এসে গেছে। মা-বাবা-স্বজন সবার সাথে দেখা করি।
রামগড় উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল মামুন মিয়া বলেন, আট ডিসেম্বর রামগড়মুক্ত দিবস উপলক্ষে অন্যান্য বছরের মতো এবারও কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। সকালে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সর্বস্তরের মানুষসহ শোভাযাত্রা শেষে শহিদ বেদিতে পুষ্পস্তবক দেয়া হবে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে রামগড়ের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। আজ আট ডিসেম্বর রামগড়মুক্ত হয়। এ বিষয়গুলো ধরে রাখার জন্য কার্যকর ভূমিকা নেবো। বিশেষ করে যে স্মৃতিস্তম্ভগুলো অসমাপ্ত আছে, সেগুলো আরো সুন্দরভাবে সমাপ্তির জন্য সরকারের সহায়তায় পদক্ষেপ নেবো।
তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে জাদুঘরসহ অন্যান্য অবকাঠামোও গড়ে তোলা যেতে পারে।