সাহিত্যবিশারদ

কাজী মোতাহার হোসেন

সারা জীবন- ব্যাপী অক্লান্ত সাহিত্য-সেবা দ্বারা প্রাচীন মুসলিম পল্লী- সাহিত্য ও পুঁথি সাহিত্যের সংগ্রহ, পাঠোদ্ধার ও আলোচনা করে মুন্‌শী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সাহেব ১৯৫৩ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর এই পৃথিবীর খেলাঘর থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। সত্যি সত্যিই এই পৃথিবীকে তিনি খেলাঘর বলেই জানতেন; তাই বিলাস, আড়ম্বর বা সম্মানের লোভ তিনি কোনও দিন করেননি; কখনও নিজেকে বড় বলে জাহির করবার প্রবৃত্তি তাঁকে পেয়ে বসেনি। এমন গুণী অথচ অমায়িক লোক খুব কমই দেখা যায়।
বর্তমানে প্রৌঢ় সাহিত্যিকেরা প্রায়ই তাঁর পুত্রের বয়সী, আর তরুণ- সাহিত্যিকেরা তাঁর নাতি বা পরনাতি-স্থানীয়। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলে দেখেছি, কোনও দিন তিনি নিজের প্রাধান্য বজায় রাখবার জন্য অন্যের যোগ্যতাকে ছোট ক’রে দেখেননি। তাঁর এই অসাধারণ ঔদার্যগুণে তিনি সকলের অকুণ্ঠ ভক্তি- শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন- সাহিত্যিক হিসাবে তো বটেই, কিন্তু মানুষ হিসাবে হয়তো আরও বেশি।
জীবনে মাত্র দুইবার তাঁর সঙ্গে দেখা করবার সৌভাগ্য লাভ করেছিলাম। একবার প্রায় ২০ বছর আগে কলকাতায়, আর একবার বছর দুই আগে কুমিল্লায়। দুইবারেই তিনি সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। তাঁর সুচিন্তিত ভাষণ পড়ে দুইবারই চমৎকৃত হয়েছিলাম। চমৎকৃত হওয়ার প্রধান কারণ, তাঁর আধুনিক এবং সংস্কার -মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর বয়সের আরও অনেক সাহিত্যিককে দেখেছি, তাঁদের কেউ কেউ তরুণদের ভাবধারা বুঝে উঠতে না পেরে অসহিষ্ণু হয়ে তাদের বিকৃত করে থাকেন, আর নিজেদের সনাতন আদর্শকেই এক এবং অকৃত্রিম আদর্শ ব’লে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কিন্তু আশ্চর্য এই লোকটি- দেশের ভাবস্রোত এবং ঘটনা-প্রবাহের সঙ্গে চিরকাল নিবিড় সহানুভূতির সংস্রব রক্ষা করে গেছেন: আর এই কারণেই তিনি বুড়ো হয়েও বুঝিয়ে যাননি।
সাহিত্যসেবার ভিতর দিয়ে দেশের কল্যাণ সাধনই ছিল তাঁর ব্রত, এর সঙ্গে কোনো স্বার্থের সংযোগ ছিল না। বোধ হয় এই কারণেই তিনি চির নবীন উৎসুক জ্ঞান-পিপাসী থেকে আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের অন্তরলোকে স্থানলাভ করেছিলেন। তিনি নশ্বরদেহ তাগ করেছেন বটে, কিন্তু অনাগত বহুকাল তাঁর স্নেহ ও প্রীতিধন্য দেশবাসীর শুভ স্মৃতির মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন।